ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডেস্ক ::

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একেবারে পাশে ব্যাটারি তৈরির কারখানা থাকায় চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। পরিবেশদূষণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি এবং জনস্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলার বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে এই ঘটনা।

পুটিয়া ইউনিয়নের পুরান্দিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত পুরান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা ঘেঁষেই রয়েছে এশিয়া কার বিডি লিমিটেড নামের ব্যাটারি কারখানাটি। বিদ্যালয়ের চারপাশে রয়েছে বাজার ও ঘন জনবসতি। ফলে প্রতিদিনই শত শত মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা, এই কারখানার বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানাটিতে পুরোনো ও পরিত্যক্ত ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা সংগ্রহ করা হয়। এতে নির্গত কালো ধোঁয়া ও পোড়া গন্ধে দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সিসা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। দীর্ঘদিন সিসা ও শিল্পবর্জ্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে শিশুদের শ্বাসকষ্ট, চোখের সমস্যা, এমনকি মানসিক ও শারীরিক বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক আলিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিনই কারখানার কালো ধোঁয়া বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে। এতে শিশুদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। তিনি দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের দাবি জানান।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সজিব মিয়া জানান, প্রায়ই বিষাক্ত ধোঁয়ায় বিদ্যালয় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এতে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান ব্যাহত হয়। অনেক শিশু ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারে না। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট ও চোখের জ্বালাপোড়ার সমস্যা দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ধোঁয়ার কারণে তাদের চোখ জ্বালা করে এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এতে পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কারখানার ধোঁয়ায় বাজারের ব্যবসায়ীরাও বিপাকে পড়েছেন। মুদি দোকানদার আমির হোসেন বলেন, বিষাক্ত ধোঁয়ায় দোকানঘরের টিনের চালা মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে।

কারখানাটিতে তথ্য নিতে গেলে সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। পরে মুঠোফোনে কারখানার এক কর্মকর্তা রনি জানান, ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তবে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা পদক্ষেপের কথা জানাননি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা নাদিরা আফরোজ বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। স্থানীয়রা মানববন্ধনও করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

শিবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোসতানশির বিল্লাহ বলেন, ধোঁয়া কালো হোক বা সাদা, সব ধরনের শিল্পধোঁয়াই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসযন্ত্রের জটিল রোগসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিতে পারে।

শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নরসিংদী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. বদরুল হুদা জানান, কারখানাটির লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অবস্থানসংক্রান্ত বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনা বাংলাদেশে ব্যাটারি ও সিসা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত শিল্পে পরিবেশ আইন প্রয়োগের দুর্বলতা আবারও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছে, কীভাবে বিদ্যালয় ও আবাসিক এলাকার পাশে এমন ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ ও যুব অধিকারকর্মীরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে সিসাভিত্তিক ব্যাটারি কারখানা চালু থাকা পরিবেশ শাসনের গুরুতর ব্যর্থতার প্রমাণ। তাঁর ভাষায়, শিশুদের শিক্ষা ও বেঁচে থাকার মধ্যে কোনোভাবেই বেছে নিতে বাধ্য করা যায় না। তিনি অবিলম্বে অবৈধ বা নিয়ম না মানা কারখানা বন্ধ, স্বাধীন স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন, রক্ত পরীক্ষা এবং পরিবেশ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের দাবি জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here