জনি কান্ত শর্মা, সিলেট জেলা প্রতিনিধি ::
সিলেট—পাহাড়ের সবুজ, চা-বাগানের নীরব সকাল, আর সুরমার বুকে ভাসা নীল আকাশের শহর। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরা এই নগরী যেন প্রতিদিনই একটু একটু করে হারাচ্ছে তার নিজস্ব রূপ, ডুবে যাচ্ছে মানুষেরই ফেলে যাওয়া বর্জ্যের অন্ধকারে। ড্রেন, খাল, ছড়া আর নদীর বুকে জমতে থাকা আবর্জনা এখন সিলেটের সৌন্দর্যের আড়ালে জমে থাকা নীরব হাহাকার।
প্রতিদিন সিলেট নগরী থেকে ৮ থেকে ১০ টন বর্জ্য সরাসরি পড়ে যাচ্ছে ছড়া, ড্রেন ও সুরমা নদীতে। ময়লার দখলে ভরাট হয়ে যাচ্ছে ড্রেনগুলো, থমকে যাচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। বর্ষা আসলেই এই বর্জ্য জমে সৃষ্টি করছে জলাবদ্ধতার অন্তহীন যন্ত্রণা—অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে, ভোগান্তির জালে আটকে পড়ছে নগরবাসী।
নগর ভবনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখা জানায়, সিলেটে প্রতিদিন ৪৭৫ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে সংগ্রহ করা হয় মাত্র ২৫৫ টন। বাকি অংশের বড় ভাগ ফেলা হচ্ছে উন্মুক্ত স্থানে—নদীর পাড়ে, ড্রেনের গায়ে, বাজারের পাশে। কাজিরবাজার খেয়াঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সুরমার তীরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে গৃহস্থালি ও বাজারের নোংরা—নদীর নীলজল যেন প্রতিদিনই একটু একটু করে কালো হয়ে যাচ্ছে মানুষের অবহেলায়।
জলজ প্রাণীরা হারাচ্ছে আশ্রয়, নদীর বুক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে নাব্যতা। প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে বলছে—
“মানুষ, তুমি কি সত্যিই আমার সৌন্দর্য রক্ষা করতে চাও?”
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ফারজানা ফারজানা রাইহান বলেন, সিলেট সিটি কর্পোরেশনকে আরও সচেতনা বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। আর ড্রেন, ছড়া বা নদীতে তো কোনভাবেই ময়লা ফেলা যাবে না। এটা নিয়ে কাজ করতে হবে। মানুষকে সচেতনার দিকে উদবোধ করতে হবে। নরগীতে কেউ যেন যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনানা ফেলে এর জন্য স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে সচেতনতা মূলক ক্যাম্পেইন করতে পারে পারে। বার বার যখন এগুলোর গুরুত্ব বুঝাতে থাকবেন তখন পরিবর্তন আসবে। সিটি কর্পোরেশন চাইলে শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী, স্থানীয় সমিতির যুবক ও অন্যান্য সংগঠনের যারা কাজ করছেন তাদের লাগাতে পারে। তারা সচেতনতা নিয়ে স্বেচ্ছাসেবী মূলক কাজ করতে পারে। এর বাহিরে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ডাস্টবিন দিতে পারে, এবং কোন ডাস্টবিনে কোন বর্জ্য রাখা হবে সেটাও বলে দিতে হবে। এলাকার লোকজন যেন যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলে এর জন্য জরিমাণার বিধান করতে পারে, অপরদিকে সম্মাননাও দিতে পারে।
তারা চাইলে মসজিদের সচেতনতা মূলক কথাবার্তা বলতে পারে। এর বাহিরে যখন বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহ করে তখনই যে বর্জ্য আলাদা করে ফেলে সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে গৃহস্থলী বর্জ্য আলাদা করতে কোন অসুবিধা হবে না।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. ফারজানা ফারজানা রাইহান বলেছেন, সিলেট নগরীর ড্রেন, ছড়া ও নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা গুরুতর সমস্যা। তিনি বলেন, নগরীতে ড্রেন, ছড়া বা নদীতে কোনোভাবেই ময়লা ফেলা যাবে না। এটি প্রতিরোধে সিটি কর্পোরেশনকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
নাগরিকদের সচেতন করতে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা যেতে পারে উল্লেখ করে ড. রাইহান বলেন, মানুষের অভ্যাস ছোটোবেলা থেকেই গড়ে ওঠে। তাই শিক্ষার্থীদের ওপর বিশেষভাবে ফোকাস রাখা এবং বারবার সচেতনতা দেওয়াই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি।
তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশন চাইলে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থী, স্থানীয় যুব সমিতি ও অন্যান্য সংগঠনকে যুক্ত করতে পারে। তারা স্বেচ্ছাসেবীভাবে সচেতনতামূলক কাজ করতে পারবে। পাশাপাশি নগরের বিভিন্ন স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন এবং সেগুলোতে কোন ধরনের বর্জ্য ফেলা হবে তা স্পষ্টভাবে জানানো হলে মানুষ সঠিকভাবে বর্জ্য পরিচালনায় উৎসাহিত হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলার জন্য জরিমানা ব্যবস্থা এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মাননা প্রদান কার্যকর হবে উল্লেখ করে ড. রাইহান আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশন চাইলে মসজিদ্রে জনসচেতনতামূলক বার্তা দিতে পারে।
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন, আমরা নাগরিকদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছি। সামনে আরও সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে। নগরীতে প্রায় ৪৭টি ছোট-বড়ছড়া রয়েছে, আর বড় ড্রেন রয়েছে প্রায় ৩১টি। আমরা নিয়মিত সেগুলো পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করছি।
তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়, এতো সুন্দর পাহাড়, এতো সবুজ চা-বাগান, এতো শান্ত নদী মানুষের হাতেই কি তবে হারাবে সিলেটের মোহনীয় সৌন্দর্য?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here