
ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডেস্ক ::
‘রাজনীতিকরণ’র অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক জলাভূমি সংরক্ষণের অন্যতম প্রধান চুক্তি রামসার কনভেনশনের সদস্যপদ থেকে সরে এসেছে রাশিয়া। অন্যদিকে, একই চুক্তিতে সৌদি আরবকে নতুন সদস্য হিসেবে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে।
এই দুই বিরোধপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা শুক্রবার জিম্বাবুয়ের হ্যারারেতে অনুষ্ঠিত কপ১৫ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে ঘটে, যেখানে বিশ্ব নেতারা জলাভূমি সংরক্ষণের অগ্রাধিকার নিয়ে গুরুত্বারোপ করেন। জলাভূমিগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্ন জল সরবরাহ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও কার্বন সঞ্চয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে, ইউক্রেন রামসার সদস্য দেশগুলোর প্রতি রাশিয়ার আগ্রাসনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত জলাভূমির সুরক্ষার জন্য রেজুলেশন XIV.20 সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যও মস্কোর সামরিক আগ্রাসন এবং তার পরিবেশগত প্রভাবের তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছে।রামসার কনভেনশন অনুসারে, বিশ্বব্যাপী জলাভূমি ধ্বংসের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। ১৯৭০ সাল থেকে পৃথিবীর প্রায় ২২ শতাংশ জলাভূমি হারিয়ে গেছে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে বিবেচিত। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল সমাধান (Nature-based Solutions) ও জলবায়ু অর্থায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট এড়ানো যায়।
জিম্বাবুয়ের পরিবেশ, পানি ও জলবায়ু মন্ত্রী এভলিন ন্ডলোভু কপ১৫-এর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে পরিবেশ, জলবায়ু ও বন্যপ্রাণীর স্থায়ী সচিব টেডিয়াস চিফাম্বা বিকল্প সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
রামসার কনভেনশন সতর্ক করেছে যে বিশ্বব্যাপী জলাভূমির অব্যাহত ধ্বংসের ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের (৩৩ লক্ষ কোটি টাকা) অর্থনৈতিক সুবিধা নষ্ট হতে পারে। জলাভূমি বলতে বোঝানো হচ্ছে মাটির নিচের জলাধার, নদী, হ্রদ থেকে শুরু করে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন ও প্রবালপ্রাচীরের মতো সমুদ্রতটীয় পরিবেশ। ১৯৭০ সাল থেকে জলাভূমির প্রায় ২২ শতাংশ হারিয়ে গেছে, যা পরিবেশগত অবনতি হতে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে ক্ষয়প্রাপ্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত। পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দুটো ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা পেতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল সমাধান বিশেষ করে জলাভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন জোরদার করা এখন অপরিহার্য।
সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর বাংলাদেশের তিনটি জলাভূমি যা আন্তর্জাতিকভাবে রামসার তালিকাভুক্ত। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর মাছ আহরণ, কৃষি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে, টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থা ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। ২২ বছর আগে লিজ ব্যবস্থা বন্ধের পর নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর সাফল্য সীমিত। অগোছালো বোট হাউজ, আবর্জনার অনিয়ন্ত্রিত নিক্ষেপ ও জেনারেটর চালিত নৌকা হাওরের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একসময় যেখানে প্রায় দুই লাখ অতিথিপক্ষী বসবাস করত, বর্তমানে তাদের সংখ্যা ঐতিহাসিকভাবে কমে এসেছে। হাওর পাড়ের বাসিন্দারা জানান, দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবে হাওরটি এখন প্রায় “নিরাপত্তাহীন” অবস্থায় পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরাও।
ঢাকার নগর এলাকার জলাভূমি, বিশেষ করে গুলশান-বানানী লেক, বেআইনি উন্নয়ন, দূষণ ও দখলের কারণে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জলবায়ুপ্রভাবিত স্থানীয় বাসিন্দাদের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘রিওয়েট’ প্রকল্প করাইলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ করছে।
রিওয়েট প্রকল্পের এক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন গবেষণায় জানা গেছে, গুলশান-বানানী লেকের পুনরুদ্ধার থেকে আগামী ২০ বছরে প্রায় ৩০০ হাজার কোটি টাকা (২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যবান সুবিধা আসতে পারে। এই তথ্য জলাভূমি সংরক্ষণে জলবায়ু অর্থায়ন ও বিনিয়োগের অপরিহার্যতা স্পষ্ট করছে।
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, “পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, কৃষি ও পর্যটনসহ নানা ক্ষেত্রে জলাভূমির ভূমিকা অবিচ্ছেদ্য। জলাভূমিকে প্রকৃতির ‘কিডনি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন কিডনি ছাড়া শরীর চলতে পারে না, তেমনি জলাভূমি ছাড়া প্রকৃতিও সুস্থ থাকতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, এই জলাভূমিগুলো আমাদের শহরগুলোকে বন্যা থেকে রক্ষা করে, কোটি কোটি মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করে এবং জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘রামসার কপ১৫-এ অবশ্যই শক্তিশালী অর্থায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, না হলে সময় হাতে থাকবে না।’


