ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডেস্ক ::

জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়তে থাকা ক্ষয়ক্ষতির চাপ সামলাতে এবার তরুণদের সামনে এগিয়ে আনছে বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) ব্রাজিলের বেলেমে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০–এর বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে তরুণ প্রতিনিধিরা মাঠের অভিজ্ঞতা, নীতি–বাস্তবতা ও বৈশ্বিক দাবির সমন্বিত চিত্র তুলে ধরেন।

জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসি) অফিশিয়াল শিশু ও যুব কনস্টিটিউয়েন্সি ইয়োঙ্গোর লস এন্ড ওয়ার্কিং গ্রুপের আয়োজনে ‘স্থানীয় থেকে বৈশ্বিক: লস অ্যান্ড ড্যামেজ কাঠামোতে যুব অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক এ সেশনে প্রধান অতিথি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রে না রাখলে পুরো কাঠামো অর্থহীন হয়ে পড়বে। মূল তথ্যপত্র উপস্থাপনকালে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী জানান, বাংলাদেশ নিজস্ব জাতীয় লস অ্যান্ড ড্যামেজ কাঠামো প্রস্তুত করছে যা আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগোবে। এই কাঠামাতে তরুণদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা হবে।

প্যানেল আলোচনার সঞ্চালক ও ওয়ার্কিং গ্রুপের কন্টাক্ট পয়েন্ট জাসমিমা সাবাতিনা বলেন, লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড দ্রুত, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে এর অর্থায়ন কাগজেই আটকে যাবে।

বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে তরুণদের উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত। মাঠপর্যায়ের গল্প, প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা। সব মিলিয়ে বার্তা একটাই, এটি আলোচনার বিষয় নয়; টিকে থাকার লড়াই। তরুণ প্রতিনিধিরা তহবিলে সহজ প্রবেশাধিকার, রিয়েল-টাইম স্বচ্ছতা টুল, আগাম সতর্কতাভিত্তিক অর্থায়ন, ছোট অনুদান, সক্ষমতা বৃদ্ধি, তহবিল ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী যুব প্রতিনিধিত্ব এবং তথ্যভিত্তিক সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরির দাবি জানান।

প্যানেল আলোচনায় ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো তহবিলই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে পৌঁছাবে না। তাই মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যুববান্ধব কাঠামো দরকার।

নেপালের তরুণ প্রতিনিধি প্রয়াশ অধিকারী বলেন, “আলোচনার টেবিলের বাইরে, তৃণমূল পর্যায়ে সহনশীলতা তৈরিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে যুবসমাজ। জলবায়ু সুবিচার কেবল নীতি নয়, বাস্তব সংগ্রাম।”

জলবায়ু নীতি বিশ্লেষক হারজিৎ সিংহ তরুণদের ভূমিকাকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে যুব আন্দোলন এখন সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে। তাঁর মতে, এখনই সময় জনমত তৈরি, প্রমাণ নির্মাণ, প্রচার চালানো এবং সব অংশীজনদের একসঙ্গে সংগঠিত করার।

প্রথমবারের মতো লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড প্রকল্প আহ্বান–পর্ব শুরু হয়েছে। প্রাথমিক ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো আবেদন জমা দিতে পারবে। যদিও কপ৩০–এ প্রকাশিত অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক, তবে ফান্ডের আকার, প্রবেশাধিকার ও ন্যায্য বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বার্বাডোসে দীর্ঘ আলোচনার পর ঘোষিত ২৫০ মিলিয়ন ডলারকেও অনেকেই প্রকৃত ক্ষতির তুলনায় ‘সামান্য’ বলছেন।

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ছয় মাসের আবেদন সময়সীমায় দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি। সীমিত বাজেটে করার মতো শক্তিশালী আবেদন তৈরি করতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, সরকার ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থার সমন্বিত কাজ প্রয়োজন।

হারজিৎ সিংহ বলেন, “আমরা বেলেমে কথা বলছি, আর ঠিক এই সময়েই জামাইকা ও ফিলিপাইনে জলবায়ু বিপর্যয় আঘাত হানছে। তাদের অর্থ এখনই দরকার।”

বর্তমানে তহবিলে রয়েছে প্রায় ৩৯৭ মিলিয়ন ডলার। ২০২৩–২৪ সালে বিশ্ব নেতারা মোটামুটি ৭০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বেশিরভাগই এখনো বিতরণযোগ্য নয়। অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বার্ষিক ক্ষতি মোকাবিলার প্রয়োজন ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে বহু দেশের মতে, ফান্ডের বর্তমান আকার ‘প্রতীকী’।

আয়োজক দেশ ব্রাজিল জানিয়েছে, লস এন্ড ড্যামেজ ফান্ড ইতিহাসের দ্রুততম সময়ে কার্যকর হওয়া তহবিলগুলোর একটি। তাদের দাবি, এটি শুধু ক্ষতি–পূরণের অর্থ নয়; জলবায়ু সুবিচারের রাজনৈতিক স্বীকৃতি।

প্রস্তাব অনুমোদনের প্রথম ধাপ আগামী জুলাইয়ে সম্পন্ন হতে পারে। তখন প্রথম কয়েকটি প্রকল্প বাস্তব অর্থায়ন পাবে। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, ফান্ডের জটিল প্রশাসনিক কাঠামো ও আবেদন–প্রক্রিয়া ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “বাংলাদেশ আজ কথা বলছে সর্বনিম্নোন্নত দেশগুলোর পক্ষ থেকে—যাদের জীবন, ঘরবাড়ি আর ভবিষ্যৎ জলবায়ু সংকটে বদলে যাচ্ছে প্রতিদিন।”

উপদেষ্টা আরো বলেন, “আমাদের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন কোনো দরকষাকষির বিষয় নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন, ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, মানব মর্যাদার প্রশ্ন। আমরা এখানে সমস্যার কথা আবার বলতে আসিনি, এসেছি এমন সমাধান খুঁজতে, যা আমাদের ভোগান্তির গভীরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here