ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডেস্ক ::

বিশ্ব যখন ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩০-এর দিকে এগোচ্ছে, বাংলাদেশ নতুন করে জোর দিচ্ছে ন্যায্য অর্থায়ন, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জলবায়ু সুবিচারের ওপর। জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দীর্ঘদিনের দাবিগুলো এবার যেন বাস্তবে রূপ নেয়, এটাই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য।

কপ৩০-এ বাংলাদেশ জানাতে চায়, যারা সবচেয়ে কম দূষণ ঘটায়, তারাই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহায়। এই বৈষম্য বন্ধ করতে হবে। জলবায়ু কার্যক্রম এখনই বাস্তব সহায়তায় রূপ নিতে হবে। বাংলাদেশের বার্তা স্পষ্ট, জলবায়ু সংকট কেবল পরিবেশের নয়, এটি সুবিচার ও টিকে থাকার প্রশ্ন। উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ” বাংলাদেশ অনেক কিছু শিখেছে, তবে ক্লাইমেট জাস্টিস, ফান্ডিং, প্রজেকশন এবং শ্রমিকদের স্বার্থ—এই ক্ষেত্রগুলোতে আরও সক্রিয় হতে হবে। প্রতিবাদ ও সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়ে গেছে। তাই এখন সমন্বিত উদ্যোগই একমাত্র পথ।”

বাংলাদেশ কপ৩০-এ পাঁচটি মূল অগ্রাধিকার বিষয় তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রা (NCQG) অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund) ২০২৬ সালের মধ্যে চালু করা, অভিযোজন তহবিল দ্বিগুণ করা ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা কার্যকর করা, ন্যায্য রূপান্তর (Just Transition) এবং জেন্ডার সমতা নীতিকে সকল প্রাসঙ্গিক নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা, এবং গ্লোবাল স্টকটেকের নীরিক্ষার মাধ্যমে এসব পদক্ষেপের বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

রোববার পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত ‘কপ৩০-এর জন্য খসড়া পজিশন পেপার’ শীর্ষক কর্মশালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জলবায়ু সুবিচার অর্জনে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা জোরদার করতে হবে। তিনি আঞ্চলিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে নিয়ে একটি যৌথ প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব দেন।

উপদেষ্টা রিজওয়ানা উল্লেখ করেন, বিগত বছরগুলোতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন সীমিত ছিল। তিনি বলেন, “পরিকল্পিত যোগাযোগ, তথ্য বিনিময় ও যৌথ উদ্যোগ নিলে জলবায়ু কূটনীতি আরও কার্যকর হবে।”

কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. কামরুজ্জামান। উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ, জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত, যুগ্ম সচিব ধরিত্রী কুমার সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন) মির্জা শওকত আলী।

অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত আলোচনায় দেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, যুব সংগঠন সমূহের প্রতিনিধি ও অ্যাক্টিভিস্টরা অংশ নেন। তারা আসন্ন কপ-৩০ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষে আরও জোরালো ও কৌশলগত অবস্থান উপস্থাপনের আহ্বান জানান। কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বৈশ্বিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট ও ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। জলবায়ু পদক্ষেপ এখন আর বিকল্প নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। যারা কম দায়ী, তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগছে, বিশ্বকে এখনই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে।

জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ বলছে, আগের ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দ্রুত পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি ২০৩৫ সালের মধ্যে নতুন লক্ষ্য বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করা উচিত। এই অর্থের বড় অংশ অনুদানভিত্তিক, পূর্বানুমানযোগ্য ও অতিরিক্ত হওয়া প্রয়োজন।

ন্যায্য রূপান্তর বা জাস্ট ট্রানজিশন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বলছে, উন্নত দেশগুলোকে আগে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমাতে হবে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবুজ কর্মসংস্থান, শ্রমিকের সুরক্ষা ও সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিতে সহায়তা দিতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য অভিযোজন শুধু প্রয়োজন নয়, এটি টিকে থাকার প্রশ্ন। তাই ২০২৫ সালের মধ্যে অভিযোজন তহবিল দ্বিগুণ করার দাবি জানানো হয়েছে। নারীবান্ধব, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত ও তরুণ-আদিবাসীসম্পৃক্ত অভিযোজন উদ্যোগে গুরুত্ব দিতে চায় বাংলাদেশ।

গ্লোবাল গোল অন অ্যাডাপটেশনে (GGA) পরিমাপযোগ্য সূচক যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা, যাতে বৈশ্বিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যায়। অভিযোজনকে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল, ন্যায্য রূপান্তর ও গ্লোবাল স্টকটেকের সঙ্গে সমন্বিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে, যাতে তারা জলবায়ু সহনশীল চাষাবাদে যেতে পারে এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

ক্ষয়ক্ষতি তহবিল (Loss and Damage Fund) ২০২৬ সালের মধ্যে পূর্ণ কার্যকর করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ, যাতে সরাসরি ও সহজভাবে জলবায়ু-প্রভাবিত দেশগুলো অর্থ সহায়তা পেতে পারে।

গ্লোবাল স্টকটেক প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বলেছে, এতে অর্থ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সরাসরি যুক্ত থাকতে হবে। স্টকটেকের ফলাফল যেন পরবর্তী জাতীয় নির্ধারিত অবদান (NDCs)-এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

জেন্ডার বিষয়ে বাংলাদেশ প্রস্তাব করেছে, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গ্রীন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) ও অভিযোজন তহবিলের মধ্যে পৃথক নারী-বান্ধব অর্থায়ন উইন্ডো তৈরি করা হোক।

সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, “বাংলাদেশের প্রস্তুতি আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা ও টেকসই ভবিষ্যতের প্রতিফলন।” তিনি জানান, কপ৩০-এ বাংলাদেশ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পক্ষে ন্যায্য অর্থায়ন ও জলবায়ু সুবিচারের দাবি অব্যাহত রাখবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here