নিজস্ব সংবাদদাতা, ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডেস্ক ::
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রত্যন্ত এক গ্রাম, ঝালকাঠির তিমিরকাঠিতে জন্মগ্রহণ করেন আরিফুর রহমান শুভ। ২০০০ সালের ৭ জুলাই এক মাটির ঘরে জন্ম নেওয়া এই তরুণ আজ আন্তর্জাতিক যুব আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে শুভ আজ প্রমাণ করেছেন—যুব শক্তিই পারে সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে।
শৈশব থেকেই লড়াইয়ের শুরু:
শুভর সমাজসেবার যাত্রা শুরু হয়েছিল শৈশবেই। স্কুলে পড়াকালীন বন্ধুদের সঙ্গে খাবারের টাকা বাঁচিয়ে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করতেন। কিন্তু ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডর তার জীবন বদলে দেয়। নিজের চোখের সামনে পরিবারসহ হাজারো মানুষকে সর্বস্ব হারাতে দেখে বুঝতে পারেন, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নয়—এটি একটি মানবিক সংকট।
সিডর আমার চোখ খুলে দেয়, বলেন শুভ। জলবায়ু পরিবর্তন মানে শুধু পরিবেশ ধ্বংস নয়, এটি মানে মানুষের ঘরবাড়ি হারানো, জীবিকা হারানো, মর্যাদা হারানো।
এরপর থেকেই তিনি জলবায়ু সচেতনতা ও সামাজিক উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। যুব নেতৃত্ব বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ইয়ুথনেট গ্লোবাল, যা বর্তমানে বাংলাদেশের ৫০টি জেলা ও ১১টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
যুব উন্নয়ন ও জলবায়ু ন্যায়ের জন্য লড়াই:
শুভ বিশ্বাস করেন, যুব সমাজকে দক্ষতা ও সুযোগ দেওয়া হলে তারা নিজের জীবন বদলাতে পারবে, সমাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে। এ কারণেই ইয়ুথনেট গ্লোবাল হাজার হাজার তরুণকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সবুজ দক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেকসই কৃষি ও পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের বিষয়ে।
তিনি বলেন, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কথা বললেই হবে না, আমাদের এমন সমাধান আনতে হবে যা কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং মানুষকে স্বাবলম্বী করবে।
এমনকি তিনি লিঙ্গ সমতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। সিলেটের বন্যা, আম্পান ঘূর্ণিঝড় বা কোভিড-১৯ মহামারি—প্রতিটি সংকটেই শুভ এবং তার সংগঠন প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থেকেছে।
বঞ্চিতদের জন্য আশার আলো:
ইয়ুথনেট গ্লোবালের অন্যতম সফল উদ্যোগ হলো দক্ষিণাঞ্চলের মানতা সম্প্রদায়ের জন্য উন্নয়নমূলক প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত এই নৌ-যাযাবর জনগোষ্ঠীকে বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার সুযোগ দিয়েছে শুভর সংগঠন।
জলেভাসা ভূমিহীন মানতা জনগোষ্ঠীকে বছরের পর বছর অবহেলা করা হয়েছে, বলেন শুভ। আমরা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে, তাদের আত্মনির্ভরশীল করতে চাই।
একইভাবে, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জলবায়ু শরণার্থীদের জন্য চর ইয়ুথনেট নামে পুনর্বাসন প্রকল্প গড়ে তুলেছে ইয়ুথনেট গ্লোবাল, যা স্থানীয়দের জীবনমান উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধি:
শুভর কাজ কেবল দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের ইয়াং অ্যাক্টিভিস্টস সামিটে ইয়ুথনেট গ্লোবাল বিশ্বসেরা পাঁচটি যুব সংগঠনের মধ্যে স্থান পায়। জলবায়ু ন্যায্যতা ও টেকসই কর্মসংস্থানের পক্ষে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সরব কণ্ঠ।
গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইকে তিনি বলেন, আমরা দয়া চাই না, আমরা জলবায়ু ন্যায়বিচার চাই। যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, তারা জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী নয়। বিশ্ব নেতাদের এখনই বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতিরোধের পথে অটল:
শুভর লড়াই সহজ ছিল না। ২০২৪ সালে গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের সময় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ পুলিশের গুলিতে নিহত হন। কিন্তু শুভ পিছু হটেননি। বরং আন্দোলন আরও বেগবান করেছেন।
শ্রাবণকে হারানো আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত ছিল, বলেন শুভ। কিন্তু আমরা চুপ করে থাকতে পারতাম না। আমাদের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছিল।
সরকারি হুমকি, গ্রেফতারি পরোয়ানা, হয়রানি—কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তিনি বলেন, যুব সমাজ শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা বর্তমান। পরিবর্তন আনতে হলে এখনই মাঠে নামতে হবে।
শুভর পাশে অন্য যুব নেতৃত্ব:
শুভর এই সংগ্রামের প্রশংসা করেছেন জলবায়ু ও মানবাধিকার কর্মীরা। ইয়ুথনেট গ্লোবাল এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান বলেন, আরিফুর রহমান শুভ বাংলাদেশের যুব সমাজের জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। তিনি শুধু সমস্যার কথা বলেন না, তিনি সমাধানের পথ দেখান। জলবায়ু সংকট থেকে শুরু করে দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই তিনি কাজ করছেন, যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
একজন তরুণের শক্তি, হাজারো মানুষের স্বপ্ন:
আরিফুর রহমান শুভর গল্প প্রমাণ করে, একজন মানুষের অঙ্গীকার হাজারো মানুষের জীবনে আলো এনে দিতে পারে। এক ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চ পর্যন্ত তার যাত্রা প্রমাণ করেছে, বদল আসবে রাস্তায়, মানুষের মাঝে, এবং যেখানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে।
আজ ইয়ুথনেট গ্লোবাল আরও বিস্তৃত হচ্ছে, নতুন নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে লাখো তরুণের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে। শুভ’র স্বপ্ন, একটি এমন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি তরুণ সুযোগ পাবে সমাজের জন্য কিছু করার।
বাংলাদেশ আজ অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। কিন্তু এক সত্য স্পষ্ট—যুব শক্তির হাত ধরেই গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ, যেখানে থাকবে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, সুবিচার ও আশার মশাল।



