৭৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শিশুবান্ধব নয়

স্টাফ রিপোর্টার :: দেশের প্রচলতি আইন অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে ৪০ জনের বেশি নারী কর্মী থাকলেই সেখানে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা থাকতে হবে। কিন্তু দেশে মাত্র ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। ১৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র করার পরিকল্পনা থাকলেও ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো পরিকল্পনা নেই। অর্থাৎ ৭৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো আইনগতভাবে শিশুবান্ধব নয়। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ট্যাকলিং চাইল্ডকেয়ার: দ্য বিজসেন বেনিফিটস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস অব এমপ্লয়ার- সাপোর্টেড চাইল্ড কেয়ার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক আইএফসির গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকার কারণে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে এবং নারী কর্মীদের সন্তানদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সুবিধা প্রদানের বিষয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে এ গবেষণা চালিয়েছে আইএফসি। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সুবিধা প্রদানের জন্য ২০১৭ সালে আইএফসি পাকিস্তান, শ্রীলংকা ও ভারতে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের ওপর আলাদা গবেষণা চালিয়েছে।

দেশের প্রায় ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকায় নারীদের উৎপাদনশীলতায় চরম ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।কেননা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র থাকলে নারীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে ৭৪ শতাংশ। একই কারণে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়ে ৫১ শতাংশ, ক্যারিয়ার উন্নত (কর্মক্ষেত্রে সাফল্য) হয় ৫৬ শতাংশ নারীর। এছাড়া ৭৫ শতাংশ নারীর সংস্কৃতি উন্নত হওয়া ছাড়া ৬৯ শতাংশ নারীর নৈতিকতা উন্নত হয়। দেশের ৭৭ শতাংশ কোম্পানিতে দিবাযত্ন কেন্দ্র না থাকায় তাদের কর্মীদের কর্মস্থলে সন্তান রাখার প্রস্তাব দেয় না। এতে দেশের শ্রমশক্তিতে পুরুষের সমান অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

আবার প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের ছয় মাস থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুসন্তান রয়েছে।অর্থাৎ এসব নারী কর্মীর ডে কেয়ার কেন্দ্রে সন্তান রাখার প্রয়োজন রয়েছে। আবার যেসব নারী কর্মী ডে কেয়ার সেন্টারে শিশুসন্তান রাখছেন তাদের ৫১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আর নারী কর্মীদের শিশুসন্তান দিবাযত্ন কেন্দ্রে রাখতে গড়ে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের আইএফসি কান্ট্রি ম্যানেজার ওয়েন্ডি ওয়ার্নার বলেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চোখে পড়ার মতো। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমতা এখনো অনেক দূরে রয়েছে।প্রায় ৮০ শতাংশ পুরুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হলেও নারীর ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৩৬ শতাংশ। ফলে নারীদের বড় একটি অংশ শ্রমশক্তির বাইরে থাকছে। সেখানে কর্মক্ষেত্রের নানা বাধা কাজ করছে। তাই কর্মীদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে মানসম্পন্ন নারী কর্মীদের ধরে রাখতে পারে। প্রতিষ্ঠানের স্পন্সরে তৈরি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হলে কর্মী ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই লাভবান হতে পারে। কর্তৃপক্ষের সহায়তায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র দেশের সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন খাতে শক্তিশালী ব্যবসার ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশে বেকার নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় দ্বিগুণ।

আইএফসি দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ৩০৬টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়ে এ গবেষণা করেছে।এছাড়া নয়টি ফোকাস গ্রুপ পিসকাশন ও ৪০টি কনসালটেশন সেশনের মাধ্যমে এ গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণা চালানো হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অলাভজনক, উৎপাদনমুখী, আর্থিক সেবাদানকারী, তথ্য ও প্রযুক্তি, মিডিয়া, খাদ্য ও ভোক্তাপণ্য তৈরি প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ ও আবাসন, হাসপাতাল, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, হেলথকেয়ার, গবেষণা, রাসায়নিক, পরিবহন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান।

অনুষ্ঠানের প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় বাধা সাশ্রয়ী অর্থে ভালো মানের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র না পাওয়া। একই সঙ্গে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খরচের একটি বড় অংশ মায়ের বহন করতে হয়।কর্মীদের সন্তানদের শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র করা হলে কর্মী ও প্রতিষ্ঠান সবার জন্য সমান জয় আসে। এতে শিশুর শারীরিক ও জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে। একই সঙ্গে নারী কর্মীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পেলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বাড়বে। যাতে দেশের আর্থসামাজিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

১২ নভেম্বরের স্বজন হারানোর কান্না আজও থামেনি

শিপু ফরাজী,চরফ্যাশন প্রতিনিধি :: ভয়াল ১২ নভেম্বর। ১৯৭০ সনের এই দিনে পৃথিবীর ...