ডেস্ক রিপোর্ট:: ছায়রন বেগম (৭৫)। তিন দশক আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করে ছয় সন্তানকে বড় করেছেন। সন্তানরা এখন সাবলম্বী। থাকেন পাকা ও আধা পাকা বাড়িতে। তবে সেই সন্তানদের ঘরে ঠাঁই হয়নি বয়সের ভারে ন্যুব্জ ছায়রন বেগমের। তার ঠিকানা হয়েছে বাড়ির পাশে বাঁশ-বাগানের পাশে গবাদিপশু ও মানুষের মলমূত্রের মধ্যে একটি ঝুপড়িতে।

পাঁচ বছর ধরে এখানে অমানবিক জীবনযাপন করছেন তিনি। খবর পেয়ে ছায়রন বেগমকে উদ্ধার করে সন্তানদের ঘরে তুলে দিলেন যশোরের চৌগাছার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাফী বিন কবির। এ সময় তাকে খাদ্য ও নগদ অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে ‍বৃহস্পতিবার যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের স্বর্পরাজপুর গ্রামে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কাফী বিন কবির ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ দুটি কম্বল, চাল, ডাল আলুসহ খাবার নিয়ে হাজির হন ছায়রন বেগমের বাড়িতে। সেখানে বৃদ্ধাকে চেয়ারে বসিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাঠের পিঁড়িতে বসেন। এরপর তার কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা শোনেন। এরপর বৃদ্ধার বড় ছেলের পাকা ঘরের বারান্দায় তুলে দেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসার খবর পেয়েই বাড়িতে তালা দিয়ে সরে যান পুত্রবধূরা। আগে থেকেই মাঠে কাজ করায় বাড়িতে ছিলেন না বৃদ্ধার ছেলেরা। এ সময় কাফী বিন কবির ছেলেদের বিচার করার কথা বলতেই কেঁদে ফেলেন বৃদ্ধা। ইউএনওর হাত জড়িয়ে ধরে বলেন ওদের ধরতি হবে না। ওরা জনমাইনে খেটে খাচ্ছে। ওদের কিছু বলবেন না। পরে বৃদ্ধার তিন ছেলেকে দুই দিনের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে দেখা করতে বলেন।

বৃদ্ধা ছায়রন বলেন, সকালে গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্বর্পরাজপুর দাখিল মাদরাসার সুপার আম্মাদুল তাকে খাবার দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই খাবার ছাড়া দুপুর পর্যন্ত আর কিছু খাননি। তিনি ইউএনওর কাছে অভিযোগ করেন ছেলে ও পুত্রবধূরা তাকে বাড়িতেই যেতে দেন না। মাঝেমাঝে খাবার দিয়ে যান। বিষয়টি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জানলেও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।

প্রতিবেশী আয়েশা খাতুন জনান, ঝুপড়িটি বৃদ্ধার নিজের কাজ করে জমানো টাকার। সেখান থেকেও টাকা নিয়ে নিয়েছেন ছেলেরা। দীর্ঘদিন ধরে বৃদ্ধা রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে এই বাঁশ বাগানেই থাকেন। ছেলে পুত্রবধূরা চোখের দেখাও দেখতে আসেন না। পাশের জগদীশপুর গ্রামের এক নারী এবং গ্রামের কিছু মানুষ মাঝে-মধ্যে তার কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করে দেন।

গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আম্মাদুল ইসলাম বলেন, মাকে খাবার দেওয়া বা ঘরে রাখার মতো সক্ষমতা ছেলেদের আছে। তার ছেলে ও নাতি যারা আছে তারা প্রত্যেকে এক দিন করে খেতে দিলেও এক সপ্তাহ হয়ে যায়। তবে ওদের বারবার বললেও তারা কারও কথা শোনেন না।

চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাফী বিন কবির বলেন, খুবই অমানবিক ঘটনা। খবর শুনে ঘটনাস্থলে গিয়েছি। এরপর বাঁশঝাড়ের পাশে ময়লা-আবর্জনার মধ্যে ঝুঁপড়ি ঘর থেকে ওই মাকে উদ্ধার করে গোসল করিয়েছি। এরপর তার বড় সন্তানের ঘরে তুলে দিয়েছি। আমরা তাকে খাবার, হাত খরচের টাকা ও দুটি কম্বল দিয়েছি। তার ছেলেদের বাড়িতে পায়নি। আমার অফিসে আসতে বলা হয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here