অসহযোগ প্রস্তুতিপর্ব, প্রতিরোধ, গেরিলা আক্রমণ ও শেষে সম্মুখ সমরে বিজয় অর্জন, ১৯৭১ সালের এই ৪টি পর্যায়ের মুক্তিযুদ্ধে ঝিনাইদহের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ঝিনাইদহের পতন ঘটাতে স্বশস্ত্র পাকবাহিনীকে যে পরিমাণ ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিল অন্যন্য স্থানে তত ক্ষতি স্বীকার করতে হয়নি বলে ইতিহাস স্বাক্ষ দেয়। এখানে সম্মুখ সমর সহ বেশ কয়েকটি গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ১৯৭১ সালের আজকের দিন (৬ ডিসেম্বর) ঝিনাইদহ হয় মুক্ত।

পাকবাহিনীর কাছে ঝিনাইদহের পতন ঘটতে যেমন বিলম্ব হয়েছিল তেমন ঝিনাইদহ পাকহানাদার মুক্ত হয়েছিল অতিস্বত্তর। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের মাঝা্‌মাঝি সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ঝিনাইদহ সফরের পর পরই এখানে শুরু হয় পরিকল্পনা গ্রহণ ও প্রস্তুতি। মধ্য ফেব্রুয়ারীর এই পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পথ বেয়েই ঝিনাইদহে প্রথম আসে অসহযোগ আন্দোলন। পরবর্তী সময়ে যা রূপ নেয় বাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম। ১৬ ফেব্রুয়ারী ১৯৭১ সালে ঝিনাইদহ পাকহানাদার কবলিত হয় এবং ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকহানাদারের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত করা হয় ঝিনাইদহকে। পাকবাহিনীর সশস্ত্র তিন পাটুন সৈন্য কনভয় যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়েছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ ব্যুহ ভেদ করতে। কিন্তু তাদের অধিকাংশই আর যশোর ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যেতে পারেনি। তাই যশোর ক্যান্টনমেন্টে জিওসি প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালিয়ে ছিল ঝিনাইদহের সর্বাধিক। ফলে মহকুমা শহরের দোকানপাট ভস্মিভুত হয়েছিল, ধুলিসাৎ হয়েছিল বাড়িঘর। প্রধান সড়কের আশে পাশে গ্রামগঞ্জে আগুন জ্বালিয়েছিল দাউ দাউ করে। সংগঠিত হয়েছিল একাধিক যুদ্ধ ও ঘটনা।

স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন সহ ঝিনাইদহের মুক্তিকামী ছাত্র জনতা অসহযোগ আন্দোলন ও প্রতিরোধ সংগ্রামে সর্বস্তরের জনগণকে সংঘবদ্ধ ও সম্পৃক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১১ই মার্চ থেকে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে মহকুমা সদর সহ ৬টি থানায় চলতে থাকে সার্বিক প্রস্তুতি। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকবাহিনীর আক্রমণের খবরে ঝিনাইদহের নেতৃবৃন্দ মহাকুমা পুলিশ সুপার মাহাবুব উদ্দিনের সাথে বৈঠকে বসেন এবং থানার অস্ত্রগার খুলে দেওয়া হয়। পুলিশ-আনসার সহ জনতার মাঝে ৪ শতাধিক রাইফেলস ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে ট্রেনিং করানো হয়। আহবান জানানো হয় সংগ্রামের।

এদিকে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে সামরিক কনভয়ের অগ্রযাত্রা ঝিনাইদহের সন্নিকবর্তী হলে এসডিপিও মাহাবুব উদ্দিন তার পুলিশ দল ও সহযোগীদের নিয়ে গোটা ঝিনাইদহের বিদ্যুৎ বন্ধ করে ব্লাক আউট করে দেয় এবং তারা কৌশলগত আত্বগোপন করেন। পাকসেনারা কারো হদিস না পেয়ে কুষ্টিয়ার দিকে  চলে যায়। প্রতিরোধ সংগ্রামে গর্তখুড়ে ফাঁদ তৈরী, মহাসড়কে গাছের গুড়ি, তেলের ড্রাম প্রভৃতি ফেলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়। ২৮ মার্চ বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ও ব্যারিষ্টার আহমেদুল ইসলাম ছদ্দবেশ নিয়ে ঝিনাইদহে রাত্রী যাপন করেন। পরদিন এসডিপিও মাহাবুব উদ্দিনের সহয়তায়  মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে দেশ ত্যাগ করেন।

১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ভারী কামান ও মেশিনগানে সজ্জিত হয়ে এক সশস্ত্র কনভয় ঝিনাইদহের বারো বাজার ও কালীগঞ্জ দখল করে মহকুমা শহরের দিকে এগিয়ে আসে। এখানে মুক্তিকামী জনতা  পাকবাহিনীকে বাঁধা দেয়। বিষয়খালীর কাছে বেগবর্তী নদীর দক্ষিণ তীরে দুপুর ১টার দিকে উভয়পক্ষে সম্মুখযুদ্ধ হয়। এই সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন যশোর সেনানিবাস ফেরত ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ানরা, আনসার বাহিনীর সদস্য এবং মুক্তিপাগল হাজার হাজার ছাত্র জনতা। এই যুদ্ধে নেতৃত্বে দেয় এসডিপিও মাহাবুব উদ্দিন। অসীম সাহসের কাছে হানাদার বাহিনীর কামানের গোলা ব্যর্থ হয়ে যায়। তারা বাধ্য হয়ে ফিরে যায় ক্যান্টনমেন্টে। ঝিনাইদহে থাকে মুক্ত এলাকা। বিষয়খালি যুদ্ধে নিহত হন দুঃখু মাহামুদ, সদর উদ্দিন, আব্দুল কুদ্দুস, খলিলুর রহমান, গোলাম মোস্তফা, নজির উদ্দিন, এনামুল ও কাজী বদিউল ইসলাম। ঝিনাইদহের অমিত তেজি দামাল তরুন দল বাংলাদেশের ইতিহাসে যুদ্ধ বিজয়ের গৌরবে প্রথম মাইল ফলক স্থাপন করে বিষয়খালি যুদ্ধে। এ যুদ্ধের কাহিনী প্রথম বিদেশী রেডিও বিবিসি, ফরাসি বার্তা সংস্থা, অস্ট্রেলিয়া রেডিও এবিসিসহ বিশ্বব্যাপী প্রচার মাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সাথে প্রচারিত হয়।

এই যুদ্ধের পর ৫ এপ্রিল কুষ্টিয়া থেকে ঝিনাইদহের দিকে প্রায় ৩০জন পাকসেনা ৩টি জীপে অগ্রগামী হচ্ছে এ খবর আসে। তখন মহাকুমা সদরের শৈলকূপা থানার গাড়াগঞ্জ কুমার নদের ব্রীজের দুইপাড়ে গর্তখুঁড়ে পাকা রাস্তার উপর চাটাই বিছিয়ে আলকাতরা লেপন করে পজিশন দেয় শতশত মুক্তিপাগল জনতা। দ্রুত গতিতে জীপগুলি আসার পথে খাদে পড়ে যায়। হতবিহ্বল সেনারা পালাতে চেষ্টা করেলে জনতা জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে তাদের বেশিরভাগকে ধরে ফেলে এবং হত্যা করে। এখানে ধরা পড়ে লে.আতাউল্যা শাহ। গুরুত্বপূর্ন তথ্য পাওয়ার আশায় তাকে হত্যা না করে ৬ এপ্রিল চুয়াডাঙ্গার দায়িত্ব প্রাপ্ত ইপিআর মেজর ওসমানের কাছে পাঠানো হয়। যুদ্ধের এ পর্যায়ে সমন্বয় সাধনের জন্য ঢাকা থেকে আসেন আওয়ামীলীগ নেতা এমএনএ কামরুজ্জামান। বিষয়খালি যুদ্ধের পর মুলত পাকবাহিনী ঝিনাইদহের উপর চালায় সাড়াশি আক্রমন।

১৩ এপ্রিল পযর্ন্ত ঝিনাইদহ থাকে মুক্ত এলাকা। তবে অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ১৬ এপ্রিল সাড়াশি আক্রমনে ঝিনাইদহের পতন ঘটে। পাকবাহিনী ঝিনাইদহ দখল নেওয়ার পর পাক শাসকদের তৈরী শান্তি কমিটি, আলবদর, ও আলসামসে যোগ দেয় সুবিধাবাদীরা। এ সময় ৪ আগষ্ট আলফাপুরের যুদ্ধ, ১৪ অক্টোবর আবাইপুর যুদ্ধ, ২৭ নভেম্বর কামান্নার ট্রাজেডিসহ বেশ কয়েকটি গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত হয়। ঝিনাইদহের কামান্নায় ২৭ নভেম্বর পাকহানারা রাজাকারদের সহযোগিতায় অতর্কিত আক্রমনে মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা নজরুল ইসলাম সহ ২৭জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করে। অপরদিকে ভুল ইনফরমেশনে ১৪ অক্টোবর আবাইপুরের যুদ্ধে ৪১জন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এদিকে আলফাপুরের  যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর ২ ক্যাপ্টেন, ৩ সিপাহি সহ ৪ রাজাকার নিহত হয়।

১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে একদিকে গেরিলা যুদ্ধ চরম আকার ধারন করে অপর দিকে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী যৌথ ভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে ভিতরে ঢুকে পড়ে এবং মুক্ত এলাকা সৃষ্টি করে। ৬ ডিসেম্বর ঝিনাইদহ মহাকুমা সদরসহ ৫টি থানা হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্তি লাভ করে।

দেশ স্বাধীন হবার আগেই ঝিনাইদহ হলো স্বাধীন। যে ঝিনাইদহ প্রথম সম্মূখ সমরে বিষয়খালী যুদ্ধে জয় লাভ করে সেই ঝিনাইদহ সমগ্র দেশ স্বাধীনতা লাভের আগেই স্বাধীনতা লাভ করে।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/শাহারিয়ার রহমান রকি/ঝিনাইদহ

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here