৪ ডিসেম্বর কমলগঞ্জ মুক্ত দিবস। ১৯৭১সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের এই দিনে উষালগ্নে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর সাড়াঁশি অভিযানে পাকিসত্মানী হানাদার বাহিনী কমলগঞ্জের দখলদারিত্ব ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর কমলগঞ্জের মুক্তিপাগল বাঙ্গালিরা উড়ান দেশ স্বাধীনতার পতাকা। কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিনটি পালন উপলক্ষে নানা কর্মসূচী নেওয়া হয়। কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর কমলগঞ্জে শুরু হয় সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি। মুক্তিযোদ্ধের প্রতি অনুগত ৬০ জনের একটি দল তৈরী করে কমলগঞ্জের শমশেরনগর বিমান ঘাটিতে ট্রেনিং শুরু হয়। ১০ই মার্চ ক্যাপ্টেন গোলাম রসুলের নেতৃত্বে এক দল পাক সেনা মৌলভীবাজারে অবস্থান নেয়। ২৩শে মার্চ পাকিসত্মান দিবসে তৎকালিন ছাত্রনেতা নারায়ন ও অব্দুর রহিম পাকিসত্মানী পতাকা পুড়ানোর দায়ে গ্রেফতারের পর জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কমলগঞ্জ উপজেলা ছিল বামপন্থীদের সুদৃঢ় ঘাঁটি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা লগ্নে নকশাল পন্থীদের নির্মূল করার অজুহাতে বাঙ্গালী সেনা কর্মকর্তা মেজর খালেদ মোশাররফকে কমলগঞ্জে পাঠানো হয়। ঢাকায় ২৫শে মার্চ গণহত্যা শুরু হলে মেজর খালেদ মোশাররফ পাক বাহিনীর সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে জনতার কাতারে সামিল হন। ঢাকায় গণহত্যার প্রতিবাদে ২৬শে মার্চ কমলগঞ্জে সর্ব দলীয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বের হয়। পাক সেনারা সেই মিছিলের উপর গুলি চালালে সিরাজুল ইসলাম নামে একজন বৃদ্ধ শহীদ হন। এ হত্যাকান্ডে উপজেলাবাসীর মনে জ্বলে উঠে প্রতিশোধের আগুন। স্থানীয় বাঙ্গালী ইপিআর ও পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরাও একাত্মতা ঘোষনা করে সংগ্রাম পরিষদের সাথে। ২৮শে মার্চ শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির অস্ত্র লুট করে মালগাড়ির বগি দিয়ে শমশেরনগর- ভানুগাছ ও শমশেরনগর-মৌলভীবাজার সড়কে বেরিকেড দিলে ২৯শে মার্চ পাক বাহিনী আবারও কমলগঞ্জে চলে আসে। সন্ধ্যায় পাক সেনারা ভানুগাছ থেকে শমশেরনগরে এলে মুক্তিসেনাদের অতর্কিত আক্রমনে ক্যাপ্টেম গোলাম রসুল সহ ৯জন পাক সেনা নিহত হয়। স্বাধীনতার উষা লগ্নের এই প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধে প্রচুর অস্ত্র গোলাবারুদসহ পাক সেনাদের ২টি গাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। মুক্তিযুদ্ধে কমলগঞ্জের পাত্রখোলা, ধলাই ও ভানুগাছ বাজার ছিল যুদ্ধাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ স্থান গুলোতে ন্যাপ নেতা মফিজ আলী, ক্যাপ্টেন মোজাফফর আহমদ, আওয়ামীলীগ নেতা এম,এ, গফুর, ময়না মিয়া, ক্যাপ্টেন সাজ্জাদুর রহমান প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাহসী নেতৃত্বে কমলগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধারা অসীম সাহসীকতার সাথে লড়েন। কমলগঞ্জের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন বঙ্গবীর এম,এ,জি ওসমানী, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান, মেজর খালেদ মোশাররফ,বিগ্রেডিয়ার আমিন আহম্মদ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মত দেশ বরেণ্য ব্যক্তিরা। কমলগঞ্জের বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধ করে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান,ল্যান্সনায়েক জিলুর রহমান, সিপাহী মিজানুর রহমান, সিপাহী আব্দুর রশিদ, সিপাহী শাহাজাহান মিয়াসহ নাম না জানা অনেকেই। ৪ঠা ডিসেম্বরে ভানুগাছ এলাকায় প্রচন্ড যুদ্ধের পর কমলগঞ্জ সদর থেকে পাক হানাদাররা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কমলগঞ্জের মাটিতে উড়ে স্বাধীনতার পতাকা। ৪ ডিসেম্বর তারিখে কমলগঞ্জের ধলাই ব্রীজে সম্মুখ যুদ্ধে ও কমলগঞ্জ থানার সামনে জাতীয় পতাকা উড়ানোর সময় একজন অষ্টম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সদস্যসহ ৪জন পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। এরা হলেন কুমিলা মুরাদনগরের কালাপাইনা গ্রামের সিপাহী মোঃ মিজানুর রহমান,দেবীদ্বারের বড় শালঘর গ্রামের সিপাহী আব্দুর রসিদ, চট্রগ্রামের নিরশ্বরাইয়ের মগাদিয়া গ্রামের সিপাহী মোঃ শাহাজান মিয়া ও পাবনা শাহাদাৎপুরের দারগাপাড়া গ্রামের ল্যান্স নায়েক জিলুর রহমান। দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই ৪ বীরকে পরদিন সকালে কমলগঞ্জের কামদপুর দীঘির উত্তর পাড়ে দাফন করা হয়। সেই থেকে অদ্যাবদি ৪ঠা ডিসেম্বর কমলগঞ্জ মুক্ত দিবস হিসাবে পালন হয়ে আসছে।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/সোহেল রানা/কমলগঞ্জ

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here