নিজস্ব প্রতিবেদক:: করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ৩৮টি জেলার মানুষদের সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে ব্র্যাক। কমিউনিটিকে সংযুক্তিকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে অংশীদার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে নিয়ে কাজে নামছে তারা।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশানগুলোর সম্মিলিত মঞ্চ সিএসও অ্যালায়েন্সের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। এতে নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত হয় যে ‘করোনা প্রতিরোধে সামাজিক দূর্গ’ নামে সারা বাংলাদেশে এনজিওরা একসঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে।

আজকের জরুরি সভায় সভাপ্রধান ছিলেন সিএসও অ্যালায়েন্সের সমন্বয়ক ও তত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী। আরও উপস্থিত ছিলেন প্রিপ ট্রাস্টের অ্যারোমা দত্ত এমপি, আহছানিয়া মিশনের নির্বাহী পরিচালক এহসানুল হক, হাসিন জাহান, সুলতানা কামাল, মালেকা বানু, আরডিআরএস চেয়ারপারসন এসএন কৈরি, ওয়াটার এইডের রিজিওনাল ডিরেক্টর খায়রুল ইসলাম।

এর মাধ্যমে ওই জেলাগুলোর ৫ কোটি ৮০ লাখ বাসিন্দাদের কাছে করোনা প্রতিরোধ, মাস্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কাজ করা এবং ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি সচেতনতামূলক বার্তা ও মিসইনফরমেশন বন্ডহোল্ডারস উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের বেশি থাকা এই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলো হলঃ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, সিলেট, মৌলভীবাজার, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদি, খুলনা, নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, শরীয়তপুর, লক্ষ্মীপুর, কুমিল্লা, বরিশাল, রাজশাহী, বগুড়া, নড়াইল, নীলফামারী, গাজীপুর, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, যশোর, মাদারিপুর, নওগাঁ, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, নাটোর, টাঙ্গাইল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, মানিকগঞ্জ, গাইবান্ধা, দিনাজপুর এবং ময়মনসিংহ।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এবং মৃত্যুহার বেড়ে চলায় কেন্দ্রীয়ভাবে মোকাবেলার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই এই সংক্রমণ নিয়ে রীতিমতো চাপে রয়েছে হাসপাতালগুলি এবং একইসাথে রয়েছে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ) প্রয়োজনের তুলনায় শয্যার সংকট।

করোনায় ঝুঁকিপূর্ণ ৩৮ জেলায় কাজ করবে ব্র্যাক

একদিকে রোগীদের চাপ সামাল দিতে লড়াই করছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা, অন্যদিকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় অনেকেই অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে সংক্রমিত কেসগুলোকে কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বিশেষভাবে আচরণগত পরিবর্তন, মাস্ক পরিধান এবং কমিউনিটিকে এই প্রক্রিয়ায় জড়িত করার কোনো বিকল্প নেই।

এ বিষয়ে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, ’করোনা প্রতিরোধের যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী। কমিউনিটি অংশীদারত্ব ছাড়া এটা জয় করা সম্ভব নয়। সম্পদের অপ্রতুলতা থাকলেও আমরা আমাদের যা কিছু আছে, তা নিয়েই এই সামাজিক দূর্গ গড়ে তোলার যুদ্ধে নেমে পড়েছি। অল্প ব্যয়ের এই কাজে সঠিকভাবে অর্থায়ন হলে আমরা আরও দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাব আর সরকারের করোনা প্রতিরোধের কাজ আরও গতিময় হবে।‘

যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন,কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও)-এর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ব্র্যাক গত ৫ মাস করোনাভাইরাস মোকাবেলায় বাংলাদেশের ৬টি জেলায় ডিজিএইচএস এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে একটি পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এই পাইলট প্রকল্পের সাফল্যের উপর ভিত্তি করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) শনাক্তকৃত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় সংক্রমণ কমাতে এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে অংশীদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করবে ব্র্যাক। উদ্যোগটি পরিচালিত হবে ৩টি মূল স্তম্ভের মাধ্যমে- প্রতিরোধ, করোনাভাইরাস কেস ব্যবস্থাপনায় রেসপন্স এবং করোনা টিকার প্রচার।

প্রতিরোধ: আচরণগত পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে ঘরে ঘরে সচেতনতামূলক বার্তার মাধ্যমে মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়ার চর্চা, এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা নিশ্চিত করবে এই যৌথ উদ্যোগ। এখানে কাজ করবে বিভিন্ন সামাজিক সহায়তা দল। এছাড়াও করোনার হটস্পটগুলো যেমন- মসজিদ, পরিবহন কেন্দ্র, বাজার এবং দোকানে প্রতিরোধমূলক আচরণ নিশ্চিতকরণে স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, স্বেচ্ছাসেবক এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি তৈরি আর স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সঠিক বার্তা প্রদান করে মানুষকে সচেতন করা হবে। সময়ে সময়ে এই উদ্যোগের ফলাফল মূল্যায়ন করা হবে। ব্র্যাকের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মাস্ক এর কম ব্যবহার সরাসরিভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত।

কেস ব্যবস্থাপনায় রেসপন্স: এ পর্যায়ে ফ্রন্টলাইন কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের নেতৃত্বে ঘরে ঘরে লক্ষণযুক্ত ব্যক্তিদের উপর নজরদারি বাড়ানো হবে। এ কাজে ব্র্যাকের প্রমাণিত সামাজিক সহায়তা দল মডেলটিকে এই উদ্যোগের অধীনে আরো প্রসারিত করা হবে। এই কমিউনিটি সহায়তা টিমগুলো বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারগুলোর সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে পরিবারে লক্ষণযুক্ত ব্যক্তি শনাক্তকরণের চেষ্টা করবেন যাতে করে তাদের স্ক্রিনিং করানো যায়। ক্লিনিক্যাল মিল পাওয়া গেলেই লক্ষণ হিসেবে ধরে, তাদেরকে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে টেলিমেডিসিন সহায়তা দেওয়া হবে। এছাড়াও, পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে হালকা বা মাঝারি লক্ষণযুক্ত ব্যাক্তিদের ঘরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, সম্ভাব্য রেফারাল পয়েন্ট এবং টেস্টিং কেন্দ্রের ঠিকানা, কোয়ারেন্টাইন প্রটোকল এবং সর্বোত্তম চর্চাগুলো নিয়ে তথ্য প্রদান করা হবে। কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতে নিয়মিত ফলো আপও করা হবে।

টিকার প্রচার: করোনাভাইরাস টিকা নিবন্ধন এবং মোবিলাইজেশন নিয়ে স্থানীয় সরকারের অধীনস্থ স্বাস্থ্য অফিসগুলোকে ব্র্যাক এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠানসমূহ সহায়তা করবে। গুজবের কারণে টীকা গ্রহণ নিয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে সংশয় রোধে কাজ করবেন ব্র্যাকের ৫০ হাজার কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা কর্মী এবং স্বেচ্ছাসেবক। এছাড়াও উক্ত জেলাগুলোতে টিকাদান কার্যক্রমের প্রচারের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে মাইকিং এবং জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও, পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন বার্তা প্রচার করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here