ব্রেকিং নিউজ

২০ কোটি লোকের ভিড়ে মানুষের আকাল!

জুুঁই জেসমিন

জুুঁই জেসমিন ::  যার মাঝে আছে মনুষ্যত্ব নেই কোনো হিংসে বিদ্বেষ, কুটিলতা সেই তো মানুষ। বিশ্বাস, দায়িত্ব প্রেম এই শব্দগুলো এখন বেচাকেনার হাটে। কে ঠকায় কাকে, দূরের না কাছের, কাছের সেজে যে যার মতো মানুষকে ঠকানো এখন টিক টক ধর্ম বেশির ভাগ অনেক, অনেকের।

আপনি কি মানুষ? আপনার মাঝে আছে কতটুকু মানবিকতা ?  আবেগের দৌড়ে, স্বার্থের হাটে বিবেককে হারিয়েছেন, নাকি বিবেকের সাথে বন্ধুত্ব করে নিজেকে সৃষ্টি নেশায় রাঙিয়ে চলছেন। কোনো কিছু আবিষ্কার করে চলছেন কি নিজ মেধা বিকাশে?  সমাজের মাঝে অনিয়ম তাল তবলা বেজে বেশ নামি দামী হতে চলেননি তো আবার? গাড়ি,বাড়ি, টাকা টাকা করে মাথার চুল পাকিয়ে, অজান্তে বার্ধক্যের জালে বন্দি হোননি তো আবার? নিজের চেহেরা আয়নার সামনে দেখা হয় কি একটিবারও? যদি দেখা হয়ে থাকে তবে কী মনে হয়, মানুষ না অন্যকিছু?

নারী পুরুষ প্রত্যেককে বলছি-যদি নিজেকে মানুষ ভাবেন, তবে বৃদ্ধ পিতামাতা শেষ বয়সে খেটে খান কেন? কেন এতো অবহেলা তাদের প্রতি? কেন অভাবের তাড়নায় এক বুক অভিমানে অশ্রু ঝরে? কেন নিজ সন্তানেরা যে যার মতো চলছে, যা খুশি তা করছে? আপনার মূলত সম্পদ আপনার সন্তান নাকি বিপুল অর্থের নেশায় ছুটছেন সেই লোভ? কোনটি?

কেন থুরথুরে মানুষটি পেটে গামছা বেঁধে রিকশা চালায়। আপনি উচ্চ শিক্ষিত ও ভাল চাকরী পেয়ে ভাল অবস্থানে আছেন তা সত্তেও আপনার বাবা মা বধ্যঘরে একটুকরো শান্তির জন্য ছটপট করছে কেন? কেন এতো অবহেলা? কতটুকু খবর রাখেন, কতটুকুই বা দায়িত্ব পালন করেন? আর নারীরা-কেন নারী হয়ে আর এক নারীর সুখ কেড়ে উল্লাসে মাতেন। কেন ঘর ভাঙেন? কেন ফুটফুটে শিশুটি হয় পথকলিত, যদি মানুষেই ভাবেন, তবে পনেরো থেকে বিশলাখ ঘুষ না পেলে কারো চাকরী দিতে নারাজ হোন কেন প্রথম শ্রেণীর কর্তাবাবুগণ।

কেন আজ সাধারণ ঘরের মেধাসম্পন্ন সন্তান মোটা অংকের অভাবে ভাল একটা চাকরী পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেনা। মানুষের মাঝে মনুষ্যত্ব থাকে, বিবেক থাকে, থাকে মানবতা- থাকে নীতিবোধ-আপনাদের মাঝে এসব আছে কি?

পরিবারের প্রতি উদাসীন, চিৎকার চেঁচামেচি কেন? পরিবার, সংসার তো এক শান্তি প্রশান্তির জগত, তবে অশান্তি কেন? ভাবুন চোখ বন্ধ করে, আপনি কি মানুষ?  জগত মানচিত্রে নিজেকেই আবিষ্কার করতে যে পারেনি, সে আর পাঁচজনকে ভাববে কি করে?

এক খোবলা মগজ থাকা সত্ত্বেও-নিকৃষ্ট খামে শত শত বিবেক মোড়ানো-স্বার্থের মিউজিকে চলে গণতান্ত্রিক আবিষ্কার। গণটা এখন হাওয়ার ভলিয়ম মাত্র।হেচকি কাটে ব্যক্তিত্ব, মুখোশের প্রলেপে। দেশ ও পরিবারে তন্ত্র চলে ফোঁসফোঁস বিষধর সাপের মতো, শিক্ষা, চিকিৎসা সব সব স্তরে তুমুল ব্যবসা। অর্থের ব্যাপক ধন্নাতে, সামলেশ বাবুরাও এখন বড় অফিসার, ডাক্তার আর মাস্টারও বটে। খাকি খামের ভেতর এখন সমস্ত দুর্নীতির বসবাস ক্ষমতার মোহরায়। চাকচিক্য ক্লিনিকে রোগীকে নেহেরির মত চিবিয়ে চিবিয়ে খায় ধনীর দুলাল ডাক্তার বাবুরা, গরিবের বাস্তুভিটা নি:স্ব-না হওয়া অবধি ছাড়েনা। গরিবের ছেলেমেয়ে মেধা যোগ্যতা থাকা সত্তেও ডাক্তার হওয়ার সীমানা খুঁজে পাচ্ছেনা ! সিট নেই, প্রশ্নপত্র কেনার টাকা নেই, মামা নেই! যোগ্যতা বা মেধার দাম নেই।

কারো মুখে হাসি ফোটা যদি আপনার ধর্ম হয় তবেই আপনি মানব ধর্মের একজন

দেশে হচ্ছে কী, ঘটছে কী?  ভিক্ষুকরা হচ্ছে স্মার্ট। ভিক্ষুকের বড় আকাল, ভিক্ষুক নেই দেশে। ভাবছেন দারিদ্র্য মোচন হয়েছে নিশ্চয়? দারিদ্রমুক্ত দেশে ভিক্ষুক না থাকলেও সাহায্যকারীর উৎপাত শহর গঞ্জে স্টেশনে বেশ তুমুল। যা হোক ভাবনার মূল শিরোনাম মানুষ নিয়ে  কথা, গত বছরের ঈদের আগের দিনের এক ছোট্ট ঘটনা বলি, বিকেলে কেনাকাটার জন্য বাজারে গেলে, অটো থেকে নামতেই দেখি এক বয়স্কা মহিলা কান্নায় চিৎকার করে মাটিতে বার বার আছড়ে পড়তে থাকে, সমস্ত ফিতরার টাকা বাজারের ব্যাগে চালের মধ্যে নাকি রেখেছিলো, এক সপ্তাহ ধরে ফিতরার টাকা হাটবাজার বাড়িবাড়ি ঘুরে তুলেছে, পরিচিত এক দোকানে বাজারের ব্যাগ রেখে সেমাই কিনতে গেলে ব্যাগ চুরি হয়ে যায়। মহিলার কান্নাকাটি আর কষ্টদেখে আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই দৃশ্য এই ঘটনা, গল্প লেখবো নাকি নাটক? একটিবারও ভাবিনি মহিলাকে সাহায়্য করা বা সান্ত্বনা দেওয়া উচিৎ, ঈদের হাট মানে মহা ভিড়, এতো লোক পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে অসহায় নারীটির টাকা হারানোর করুণ দৃশ্যই দেখলাম।

আমরা কেউ সাহায্য করলাম না। এই আমরা মানুষ এই আমাদের মানবতা! যত লোকজন ভিড় জমিয়েছিল মাত্র দু টাকা করে সাহায্য করলেও কমপক্ষে দু হাজারের বেশি টাকা তার হতো। লোকজন ছিলাম বটে কিন্তু কোনো মানুষ ছিলাম না! মানুষ থাকলে নিশ্চয় সাহায্যের শত শত হাত বাড়িয়ে দেওয়া হতো। ফিতরার জমানো টাকা দিয়ে ভাঙাঘর খানি মেরামত করতে চেয়েছিলো বেঁচারা, স্বামী বেঁচে নেই! ঘটনাটা গল্প হয়েছে, কিন্তু নিজেকে মানুষ বলে মনে হইনি সেই থেকে আজও!

মানুষ কাকে বলে এ সংজ্ঞা এ যুগের ব্যাকরণে খুঁজে পাওয়া মুশকিল-মানুষ শব্দটির অর্থ না বুঝে মানুষ বলা কি ঠিক, মানুষ না হয়ে? শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতে যার বত্রিশটা দাঁত নড়ে, কিংবা বড় অন্যায়কারী সে নিজে সে নাকি আইন বিভাগ, শিক্ষা বিভাগের বড় কর্তাবাবু, সাহেব বাবু কিংবা মেম সাহেব। আবার এমন অনেক আছে  নিজের মগজ নিজেই খাবলে খায় উন্মাদ উদ্ভট সমাজের রূপ দেখে বেশ সংখ্যক মানুষ। যোগ্যতার সনদও এখন বিক্রি হয় নীলক্ষেতের মতো জনসমুদ্রের প্রান্তরে। যুদ্ধ না করেও যদি বীর যোদ্ধার সনদ নিয়ে নিজেকে দেশ প্রেমিক দেখানো যায়, বাকিসব করতে আর কী লাগে? কিচ্ছুনা!

মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝেই রাজাকার, তাদের চমকপ্রদ আচরণেই বলে দিচ্ছে তারা দেশ রক্ষক নাকি ভক্ষক। মানুষ হিসেবে গর্ব করে দিব্বি চলছেন বেশ সংখ্যক লোক, পাড়ার প্রত্যেক ব্যক্তি চিনলেই তো আপনাকে মানুষ বলা যাবেনা- আপনার বাবা মায়ের কাছে আপনি চেনা মুখ তো ? তাদের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনে আপনি সেই ছোট্টো সোনামনির মতো আছেন তো হৃদয়ে, যেমনটি ছিলেন ছেলে বেলায়? যদি তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে থাকেন তবে আপনিই বলতে পারবেন আপনি কী ?  আপনার মানবতা, সৃষ্টি, আবিষ্কার ভাবনা যদি বিকশিত না করেন কাজে কর্মে শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে, তাহলে তো আপনি পশু ছাড়া কিছুই নন। দিক্বিদিক সারা বাংলা, আপনার স্বজন পরিবার, দেশ, বিশ্ব যেদিন আপনার সৃষ্টি সুরের ঢেউ তুলবে সেদিন আপনি মানুষ, হ্যাঁ মানব থেকে মহা মানব।

ব্যক্তিস্বার্থের দৌড়ে আপনি মানুষ হতে পারেন না। যে গণতান্ত্রিক সুখের কথা না ভেবে নিজ সুখে মড়িয়া হয়ে উঠে সে কখনোই প্রকৃত সুখের স্বাদ বুঝতে পারবেনা।আপনার ত্রি অধ্যায়ের প্রচ্ছদ জ্বলজ্বলে করতে যতটুকু আবির প্রয়োজন তা আপনাকেই সঞ্চার করতে হবে, আপনাকেই রাঙাতে হবে আপনার আপনাকে। আপনি কি ভুল করেও একটিবারও ভাবেন যে হাত দিয়ে মোটা অংকের ঘুষ নিচ্ছেন খাকি খামে, সেই টাকা কত ত্যাগের বা ঋণ হাওলাতের? ঘরের ভিটেবাড়ি গরু ছাগল সব সব বিক্রি করে শুধু মাত্র একটি চাকরি পাওয়ার আশায় আপনাদের ধুয়েমুছে দেওয়া হচ্ছে?  খুব কি প্রয়োজন আপনাদের অর্থের?

আপনার মানবতা, সৃষ্টি, আবিষ্কার ভাবনা যদি বিকশিত না করেন কাজে কর্মে শ্রেষ্ঠ মানব হিসেবে, তাহলে তো আপনি পশু ছাড়া কিছুই নন।

আমি জানিনা দূর্নীতিবাজ যারা তারা কতটা ভয়ংকর কাঙ্গাল!  আজ যদি তাদের অর্থ সম্পদ নিঃস না করে, শুধু মাত্র তাদের যোগ্যতা গুণে চাকুরীর এপার্টমেন্ট লেটার হাতে তুলে দেন কত শত মানুষের পরিবারে হাসি ফুটবে, হাসি ফুটবে সাধারণ ঘরের কতশত শিক্ষার্থীর। স্বপ্ন দেখবে বড় কিছু হওয়ার। আজ এই ঘুষ দূর্নীতি হাজার সহস্র শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে আগুণে পুড়ে পুতে রাখছে তাদের যোগ্যতা,  জানেন কি?

কারো মুখে হাসি ফোটা যদি আপনার ধর্ম হয় তবেই আপনি মানব ধর্মের একজন। আগের যুগের মনীষীগণ যা যা প্রবাদ লিখে গেছেন?  তা এ যুগের আবহাওয়ায় পুরো যেন উলটো-

যেমন; “ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়’। আর এ যুগে টাকা থাকলে সবই হয়। ভোগে সুখ নয় ত্যাগেই সুখ”। কিন্তু এ যুগে ত্যাগে সুখ নয়, যেন ভোগই  সুখ।

যেখানে ৬৪ জেলার ৬৪ টি মানুষ আপনাকে ভাল মানুষ হিসেবে চিনলনা! সেখানে কিসের এতো অহংবোধ? কেন নিজেকে মানুষ হিসেবে দাবী চিৎকার? যাহোক, সব ভাবনার শিরোনাম করে যান প্রত্যেকে, পৃথিবীর পৃষ্ঠতরে। নিজের মাঝে দম্ভের কোনো চিহ্ন যেন না থাকে।মেধার আবাদে আবাদি হোন, বিবেকের হাটে মানবতার চাষে -গর্বিত হোক দেশ, জাতি, বিশ্ব মানচিত্র। কারণ শ্রেষ্ঠ জীবের ধর্ম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা-হাত পাতা বা দুর্নীতি করে পকেট ভরা না।

 

 

 

লেখক: মানবাধিকার কর্মী। ইমেইল: [email protected]

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

ভারেতের জন্য দু:খ হয়, আপসোস হয় আমাদের তরুণদের কথা ভেবেও!

আরিফ চৌধুরী শুভ :: গায়ের চামড়া কেটে যদি জুতো বানিয়ে দাও ভারতকে, ...