২০১৩ সাল বিখ্যাতদের চলে যাওয়া

ঢাকা: কথায় আছে আনলাকি থার্টিন। এই কথাটিকে পূর্ণতা দিতেই যেন ২০১৩ সালে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অনেক গুনী মানুষ। মৃতদের এই তালিকায় আছেন সঙ্গীতশিল্পী, অবিস্কারক, রাজনীতিবিদ, অভিনেতাসহ সমাজের নানান পেশার বিখ্যাত সব মানুষ। তবে এই তালিকায় ব্যাতিক্রমী হিসেবে  কুখ্যাতদের মধ্যে বিখ্যাত হিসেবে জায়গা পেয়েছেন ব্রিটিশ ডাকাত রনি বিগসের নাম। যার নামে একটা সময় লন্ডনের বেয়ারা বাচ্চারাও শান্ত হয়ে যেতো। এমনি সব বিখ্যাত মৃত মানুষদের তালিকা নিয়ে বাংলামেইলের পাঠকদের নিয়ে তৈরি করা হলো ২০১৩ সালে বিখ্যাত মৃত ব্যাক্তিদের সালতামামি।

মান্না দে: ২৪ অক্টোবর ভোররাতে বেঙ্গালুরুর হাসপাতালে মৃত্যু হয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে। মৃত্যুকালে এই গুনী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। বুকে সংক্রমন ও কিডনির সমস্যার জন্য এ বছরেরই জুন মাসে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এরপর থেকে হাসপাতালেই ছিলেন তিনি। সাত দশকের সঙ্গীতজীবনে মান্না দে বাংলা ছাড়াও বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার গান গেয়েছেন। এর মধ্যে যেমন রয়েছে অসংখ্য সিনেমার গান, তেমনই রয়েছে ধ্রুপদী সঙ্গীত, আধুনিক গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর নজরুলগীতি। বাবা পূর্ণচন্দ্র দে আর মা মহামায়া দের সন্তান মান্না দের জন্ম ১৯১৯ সালের পয়লা মে। তাঁর আসল নাম প্রবোধ চন্দ্র দে। পড়াশোনা কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজ আর বিদ্যাসাগর কলেজে।

হুগো শ্যাভেজ: ভেনেজুয়েলার জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ গত ৫ মার্চ দেশটির রাজধানী কারাকাস শহরের সামরিক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি দু’বছর যাবৎ ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। গত এপ্রিল মাসে ভেনেজুয়েলার ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র কিউবায় চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরেন শ্যাভেজ। ৫৮ বছর বয়সী হুগো শ্যাভেজ ১৪ বছর ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব দেন। এই সাম্যবাদী নেতা ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা নীতির একজন কড়া সমালোচক। কিউবা থেকে ক্যান্সারের চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর আর জনসম্মুখে দেখা যায়নি হুগো শ্যাভেজকে।

নেলসন রোলিহ্লাহ্লা ম্যান্ডেলা: সারা বিশ্বকে কাঁদিয়ে ৯৫ বছর বয়সে চলে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট অবিসংবাদি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ৫ ডিসেম্বর জোহানেসবার্গের নিজ বাসভবনে এই বর্ণবাদবিরোধী নেতা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আফ্রিকার গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সারাবিশ্ব তাকে নেলসন ম্যান্ডেলা নামেই চেনে। কিন্তু নেলসন ছাড়াও আর পাঁচটি নাম আছে তার। পরিবার, গোত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর নিজের দেশবাসীর কাছে পেয়েছেন এসব নাম। রোলিহালাহা, নেলসন, মাদিবা, টাটা, খুলু, ডালিভুঙ্গা নামে তাকে বিভিন্ন সময় ডাকা হয়।

ডেভিড ফ্রস্ট: খ্যাতিমান টিভি সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট মারা যান চলতি বছরের ৩১ আগস্ট তারিখে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের সাক্ষাৎকারের সুবাদে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩৯ সালের ৭ই এপ্রিল জন্ম নেয়া ডেভিড ফ্রস্টের পুরো নাম স্যার ডেভিড প্যারাডাইন ফ্রস্ট। সাংবাদিক ছাড়াও তিনি ছিলেন একাধারে একজন লেখক, কৌতুক অভিনেতা এবং টিভি উপস্থাপক। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক পাস করার পর ১৯৬২ সালে ‘দি উইক দ্যাট ওয়াজ’ নামক ব্যঙ্গাত্মক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি খ্যাতি লাভ করেন। ক্যারিয়ারের পরের দিকে তিনি বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকার নেয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন।

মিখাইল কালাশনিকভ: বর্তমান বিশ্বের জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র একে ৪৭ বা কালাশনিকভের উদ্ভাবক মিখাইল কালাশনিকভ আর বেঁচে নেই। রাশিয়ার ইউরাল পর্বতমালার কাছে নিজ শহর ইজভেস্কের একটি হাসপাতালে সোমবার  ৯৪ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সহজে তৈরি করা এবং সাধাসিধে ব্যবহার বিধির কারণে উদ্ভাবণের পর থেকেই কালাশনিকভ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এর জনক মিখাইল এ থেকে যৎসামান্য অর্থই আয় করতে পেরেছিলেন। এজন্যই একবার তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, এর চাইতে একখানা ঘাস কাটার যন্ত্র বানানোই ভালো ছিলো। তবে এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার।

রনি বিগস: ৮৪ বছর বয়সে লণ্ডনের রাজকীয় ট্রেনে ডাকাতি করা নামকরা ট্রেন ডাকাত রনি বিগস মারা গিয়েছেন। ১৯৬৩ সালে বিগস ও তার পনেরো জন সঙ্গী লন্ডন রয়্যাল ট্রেনে ডাকাতি করেন। ডাকাতিকালে তারা তৎকালীন ডলারের হিসেবে ২৬ লাখ ডলার ডাকাতি করেন। যা বর্তমানে অর্থমূল্যের হিসেবে প্রায় চার কোটি ডলার। রনি বিগসকে সর্বশেষ মার্চ মাসে তারই বন্ধু ব্রুস রেনল্ডসের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে দেখা যায়। ব্রুস ছিলেন ওই ট্রেন ডাকাতির মূল পরিকল্পনাকারী।

পল ওয়াকার: ‘ফাস্ট অ্যান্ড ফিউরিয়াস’ খ্যাত হলিউডের অভিনেতা পল ওয়াকার ৩০ নভেম্বর শনিবার বিকেলে লস অ্যাঞ্জেলসে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। নিজের পোর্শে গাড়িতে চেপে একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন পল। হঠাৎ গাড়ির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে লাইট পোস্ট ও গাছের সঙ্গে গাড়িটি ধাক্কা খায়। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটিতে আগুন ধরে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পল ওয়াকার।

মার্গারেট থ্যাচার: লৌহমানবী খ্যাত সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার আর নেই। ৮ এপ্রিল সোমবার সকালে ৮৭ বছর বয়সী এই লৌহমানবী মস্তিস্কে রক্তক্ষরণে মারা যান। যুক্তরাজ্যের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী থ্যাচার এই দায়িত্বে ছিলেন এক যুগ, যা অতিক্রম এখনো কেউ করেননি। রক্ষণশীল দলের থ্যাচার ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন কঠোর, আপোসহীন এবং স্পষ্টভাষী, আর এ কারণেই তাকে বলা হত ‘লৌহমানবী’। ২০০২ সালে স্ট্রোকের পর থেকে থ্যাচার সব কাজ থেকে অবসরে যান। এরপর তার আরো কয়েকবার স্ট্রোক হয়েছিল। সব শেষ স্ট্রোকে মারা গেলেন তিনি।

পিটার ও’তোলে: ‘লরেন্স অব আর্যাবিয়া’ নামে খ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা পেটার ও’তোলে ৮১ বছর বয়সে ১৪ ডিসেম্বর মারা যান। বেকেট, দ্য লায়ন ইন উইন্টার, দ্য রুলিং ক্লাসসহ অনেকগুলো দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত। চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি চারবার গোল্ডেন গ্লোব, অ্যামি এবং সর্বশেষ ২০০৩ সালে অনারারি অ্যাকাদেমি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।

ডরিস লেসিং: ব্রিটিশ নোবেল বিজয়ী লেখিকা ডরিস লেসিং ৯৪ বছরে মৃত্যুবরণ করেন। সাহিত্যিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বয়সে নোবেল পান ডোরিস। তিনি ৮৮ বছর বয়সে নোবেল পান। তাঁর প্রথম উপন্যাস ছিল ‘দ্য গ্রাস ইজ সিংগিং’। গুনী এই লেখকার জন্ম ইরানে। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার দক্ষিণ রোডেশিয়ায় (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) চলে যায়। ১৯৪৯ সালে তারা ইংল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন। তাঁর সেরা লেখার মধ্যে রয়েছে, ‘দ্য গোল্ডেন নোটবুক’, ‘মেমোয়ার্স অব এ সারভাইবর’ এবং ‘দ্য সামার বিফোর দ্য ডার্ক’।

কেন নরটন: গত সেপ্টেম্বর মাসের ১৮ তারিখ সাবেক হেভিওয়েট বক্সিং চ্যাম্পিয়ন কেন নরটন মারা যান। অ্যারিজোনার বুলহেড সিটির একটি হাসপাতালে মুত্যুর সময় নরটনের বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরেই হৃদরোগে ভুগছিলেন। ঐতিহাসিক এক লড়াইয়ে বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলীর চোয়াল ভেঙে দেয়ার জন্য তিনি সারাবিশ্বে পরিচিত মুষ্টিযোদ্ধা ছিলেন। অসুস্থতার কারণে প্রায় এক বছর ধরে তার চিকিৎসা চলছিল। মার্কিন মেরিন কোরে থাকার সময় বক্সিং রিংয়ে নামেন নরটন। ১৯৬৭ সালে পেশাদার মুষ্টিযুদ্ধে পা রাখেন তিনি। মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে তিনটি স্মরণীয় লড়াই হয়েছিল নরটনের। ১৯৭৩ সালে ১২ রাউন্ডের লড়াইয়ে আলীকে হারিয়ে নর্থ আমেরিকান বক্সিং ফেডারেশন হেভিওয়েট শিরোপা জিতেছিলেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বিদায় বছরে ঝিনাইদহে সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৫ জনের মৃত্যু

ঝিনাইদহ : ঝিনাইদহ জেলা মৃত্যুর মিছিলে সড়ক দুর্ঘটনা শীর্ষ স্থান দখল করেছে। ...