দেলোয়ার জাহিদ ::

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের  ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সোহেল ও তাঁর সহযোগী হরিপদকে গত ২১শে নভেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে তার  পাথরিয়াপাড়াস্থ  কার্যালয়ে ঢুকে গুলি  করে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ হামলায়  গুলিবিদ্ধ আরও চারজন  কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।  ঘটনার আকর্ষিকতায় স্তম্ভিত কুমিল্লাবাসি, স্তম্ভিত দেশবাসী । কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত এলাকার এ জনপ্রিয় নেতার হত্যাকাণ্ডে  গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে এর দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

মরহুম মো. সোহেল (৫২) কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য এবং  ১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছাড়াও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ছিলেন। দেশের সকল সংবাদ মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।  দুর্বৃত্তের এ দল এলোপাতাড়িভাবে গুলি ছুড়তে ছুড়তে কাউন্সিলর অফিসে প্রবেশ করে এবং মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে  ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা মটরসাইকেল ও সিএনজিযোগে দ্রুত পালিয়ে যায়।
রাতে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক মোঃ মহিউদ্দিন তাদের মৃত্যুর বিষয়টি গণমাধ্যম কে নিশ্চিত করেছেন । লক্ষণীয় বিষয় হলো এ হত্যাকাণ্ডের খবরে উত্তেজিত জনতা স্থানীয় সুজানগরে  আওয়ামী লীগ নেতা আমীর হোসেনের অফিস ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়াও জনৈক শাহ আলমের বাড়িসহ আরও বেশ ক’টি বাড়ি ভাংচুর এবং একটি দোকানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিকে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ঘাতকদের শনাক্ত করতে ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ ঘটনার তদন্তে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, ডিবি, পিবিআই, এবং  সিআইডি সহ বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাস্থল পরিদর্শন ক্রমে  আলামত ও তথ্য সংগ্রহ করেছে ।

বোদ্ধামহল বাংলাদেশে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি ও বিপর্যয়ের আশংকা করছেন এবং যার  শুরু হয়েছে কুমিল্লা থেকে  গত  ২২ অক্টোবর ২০২১ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস কুমিল্লার একটি পূজা কেন্দ্রের ঘটনার জেরে বাংলাদেশে “বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়” ৭ জন হিন্দু সহ সারা দেশে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হওয়ার উদ্বেগজনক  খবর দিয়েছে। গত ১৩ থেকে ১৯ শে অক্টোবর, ২০২১ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতায়  মৌলবাদী মদদ পুষ্ট মুসলিমরা  এক শত  ২০টির ও বেশি মন্দির ভাংচুর করেছে ।

ঐতিহাসিক ভাবে ১৯৪৭ সাল থেকে ধর্মীয় নিপীড়ন ও জাতিগত সহিংসতার ঘটনা ক্রম পর্যালোচনা করলে  দেখা যাবে ১৯৫০ সালে বরিশাল দাঙ্গা, ১৯৬২ সালে  রাজশাহীর গণহত্যা,  ১৯৬৪ এ  সীতাকুন্ড গণহত্যা, এন্ডারসন ব্রিজ হত্যাকান্ড, মুলাদী গণহত্যা ছাড়াও ৭১ পরবর্তী ঘটনা  সমূহের মধ্যে – বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে নিদারাবাদ হত্যাকান্ড, ১৯৯০ বাংলাদেশে হিন্দু বিরোধী সহিংসতা, ১৯৯২ সালে  বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থীদের হামলা, ২০১২ সালে চট্টগ্রামের  ফতেপুর ও হাটহাজারীর সহিংসতার  পর ২০২১শে  কুমিল্লার ভয়াবহ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিলো।  বাংলাদেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলার মধ্যে ২২টি তে আধাসামরিক বাহিনী বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বাহিনী মোতায়েন সহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহনের  ফলাফল আমাদের কাছে দৃশ্যমান।

গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমীর অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ” যে ঘটনা ঘটেছে সে ঘটনায় আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, আমরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছিলাম। এ ব্যাপারে যথযথ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যেখানে যেখানে এধরনের ঘটনা ঘটাবে সেখানেই তাদেরকে খুঁজে বের করা হবে। আমরা অতীতেও করেছি এবং আমরা সেটা করতেও পারব। যথাযথ শাস্তি তাদের দিতে হবে। এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে, ভবিষ্যতে এমন করতে কেউ সাহস না পায়” . উপসংহারে যে কথাটি তিনি আরো দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন  তা হলো “আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। আওয়ামী লীগ সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য” .

কুমিল্লায় এ হেন্ সাম্প্রদায়িক সহিংসতার  উস্কানি দেয়ার ঘটনায় আমরা লজ্জিত ও বিব্রত।  আমার শৈশব, কৈশোর  ও যৌবন কেটেছে কুমিল্লায়, কেটেছে সাংবাদিকতার  জঞ্ঝা বিক্ষোব্ধ জীবন। ১৯৯২ সালের ১১ই অক্টোবর  প্রকাশ্য দিবালোকে আমার পিতা এম.এ  খালেক এবং তার সহকর্মী নগেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ কে স্থানীয় ছাতিপট্টি রোডে দুই জন সন্ত্রাসী আক্রমণ করে ও হত্যার  প্রচেষ্টা চালায়।  তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসা তৈমুর নামের এক যুবক সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে ঘটনাস্থলে নিহত হয় (কোতয়ালী থানার মামলা নং ১৭, ১১/১০/১৯৯২). ঘটনার প্রতিবাদে কুমিল্লা শহরে অৰ্ধ দিবস হরতাল পালিত হয়। কুমিল্লার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এর নেতৃবৃন্দ এর আহবানে  অচল হয় পড়ে জনজীবন। তাদের দেয়া ৪৮ ঘন্টা আল্টিমেটামের মাত্র ২৪ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের  গ্রেফতার করে পুলিশ। কুমিল্লার জনগণ তাদের দাবি আদায় করে নিতে জানে।  এমনকি যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় দেশে সন্ত্রাস বিস্তার লাভ করেছিলো তখনও কুমিল্লার মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ কুণ্ঠা বোধ করেনি।

ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক এ সহিংসতা সৃষ্টির  পর কুমিল্লায় কাউন্সিলর মো. সোহেল ও তাঁর সহযোগী হরিপদ হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।  এটি একটি পরিকল্পিত ছক যা  দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি ও বিপর্যয় ডেকে আনার ক্ষেত্র করছে । এমন আশংকা মোটেই অমূলক কিছু নয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে আওয়ামীলীগের ভিতরেই  আত্মঘাতী, স্বার্থান্নেষী একটি গোষ্ঠী যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার ও রাজনীতিকে ব্যর্থ করে দিতে চায়। যেমনটি করেছিল বঙ্গবন্ধুকে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যা, সন্ত্রাস এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এখনই কঠোর অবস্থান নিবেন এবং একটি শুদ্ধি অভিযানের  সূচনা করবেন তা এখন সময়ের দাবি। “আওয়ামী লীগ গণমানুষের দল। আওয়ামী লীগ সৃষ্টি হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য” .এ  অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন দেখতে চায় বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ।

আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর মো. সোহেল ও তাঁর সহযোগী হরিপদ হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অপরাধীদের যথাসম্ভব দ্রুত শনাক্ত  এবং আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।  অক্টোবর ৯২ এর অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি পুলিশের অসাধ্য কিছু নেই।  কুমিল্লা সহ বাংলাদেশের মানুষ এ দুর্বৃত্তদের হাত থেকে মুক্তি চায়.

লেখক : দেলোয়ার জাহিদ, সাবেক সভাপতি কুমিল্লা প্রেস ক্লাব ও কুমিল্লা সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিসার্চ ফ্যাকাল্টি মেম্বার ইউনিভার্সিটি অব ম্যানিটোবা, সেন্ট পলস কলেজ, কানাডা; মুক্তিযোদ্ধা ও  প্রাবন্ধিক, রেড ডিয়ার, (আলবার্টা) কানাডা প্রবাসী

…………………………………………………………………………………………………………………………………
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here