হও সচেতন স্বাস্থ্যে, দেশ গড়ারই অর্থে

জুঁই জেসমিন :: ‘সুন্দরভাবে বাঁচতে তোমার দুটো জিনিসের দরকার-তা হচ্ছে, বুদ্ধি এবং রুচিবোধ।’ এটা জে জি হুইটিয়ারের বিখ্যাত উক্তি।

আর জন ওয়েসলে বলেছেন – ‘সুন্দর থাকা একটি সুন্দর রাজ্যে বসবাস করার আনন্দের মতো।’  সত্যিই তাই। আনন্দে থাকতে, বা আনন্দ পেতে কে না চাই— তাহলে এই চির সত্যি উক্তি দুটি বাস্তবায়নে আমাদের সুন্দর ভাবে বাঁচতে এবং সুন্দর থাকতে কী কী করা প্রয়োজন?  অবশ্যই নিজ বুদ্ধিতে নিজ রুচিতে পরিষ্কার পরিছন্ন থাকা প্রয়োজন।

পরিষ্কার রাখি, পরিবার পরিবেশ, মহামারি ভাইরাস করি নিঃশেষ।  এই স্লোগানে কিংবা এমনো চিন্তাধারায় ভাইরাস কী শেষ করছি, নাকি রোজ ভাইরাসের জন্ম দিয়ে আলিঙ্গন করে চলেছি আমরা ?  আমরা ভাইরাসের সাথে এতোবেশি কোলাকুলি করি যে রোজ পরিবারের মানুষ গুলো ওষুধ না খেলে চলতেই পারিনা। এখন যদি প্রশ্ন করা হয়  দেশে মূলত কতভাগ পরিবারে স্যানিটেশন আছে বা ব্যবহার করা হয়? উত্তরে আসবে ৭০ বা ৮০ভাগ পরিবার স্বাস্থ সম্মত পায়খানা ব্যবহার করে।  কিন্তু যা ব্যবহার করা হয় তা কি নিরাপদ? কতটুকু স্বাস্থ সম্মত, কতটুকু নিরাপদ, তা উপরিউক্ত স্লোগানকে সামনে রেখে, তুলে ধরতে চাই জাতীয় স্যানিটেশন মাস  অক্টোবর  ২০২০ ও বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষ্যে নিজ গ্রাম সহ কিছু জেলা উপজেলার স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে বর্ণ চিত্র।

যে দেশ যতই উন্নত হোকনা কেন,  দেশের  মানুষ অসুস্থ বা  সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হোকনা কেন, একমাত্র কোভিট ১৯ এর কারণেই  হাত ধোয়া বিষয়ে বিশ্ববাসী বিশেষ ভাবে ঢের এখন সচেতন, তবে তা দীর্ঘকাল পর।
যাহোক, শুরুটা করছি নিজ গ্রামের  অতীত বর্তমান দৃশ্য দিয়েই, আমি যখন থ্রিতে পড়তাম, সকাল সকাল উঠলেই দেখতে পেতাম প্রতিবেশী  মহিলা  পুরুষ, ছেলে মেয়ে সবাই হাতে বঁধনা নিয়ে মাঠ, ক্ষেত, বাঁশবাড়িতে যেতো, যে যতটুকু আড়াল হয়ে মলমূত্র ত্যাগ করে বাড়ি ফিরতো। সে সময়কালে সুগন্ধি সাবান সবার ঘরে ঘরে ছিলোনা ব্যবহার করা হতোনা। শুধু মাত্র ঈদ বা কোনো উৎসবে সুগন্ধি যুক্ত সাবান  কেনা হতো। ক্ষারযুক্ত সাবান কাপড় কাচার জন্য ব্যবহার করা হতো তবে অনেকের ধারণা ছিলো এই ক্ষারযুক্ত সাবান শুধু মাত্র কাপড় পরিষ্কার করে মাত্র, জীবানু নাশক নয়। তাই ছাঁই বা মাটি দিয়েই হাত পরিষ্কার করা হতো।
আমাদের বাড়িতে  সে-সময়কালে  ছিলো কাঁচা টয়লেট যা গর্ত করে উপরে বাঁশের বাতা দিয়ে বানানো। সারা পাড়ার মধ্যে একমাত্র আমাদের বাড়িতেই ছিলো পায়খানা ঘর। বাবা প্রাইমারীর শিক্ষক ছিলেন হয়তো তাই স্বাস্থ্য নিরাপদের দিকটা ঠিক দ্বার করে রেখেছিলেন, শক্ত ভাবনায়। তবে আমি  কিন্তু খোলা মাঠেই হাগু করতাম, আইলে  নড়ে নড়ে বসে হাগু করতে সেই মজা  লাগতো। এতে বাবা মায়ের বেশ বকুনিও খেতে হয়েছে কতশত দিন।  সে সময়ে রাস্তাঘাট এতো বেশি নোংরা ছিলোযে দুর্গন্ধে হেটে যাওয়া যেতো না, কারণ রাতের বেলা  মানুষজন ঘরের আশপাশ রাস্তার ধারেই পায়খা প্রসাব করতো।
এখন খোলা মাঠে যেখানে সেখানে মলমূত্র ত্যাগ না করলেও  বেশির ভাগ পরিবারের পায়খানা ঘরগুলো নাজেহাল অবস্থা! আর বেশির ভাগ পায়খানা ঘর হলো বাঁশ বাতা ও টিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি। সারাক্ষণ বড় বড় মাছি উড়ে চারপাশ,  তেলাপোকার উৎপাত তো আছেই, মাঝেমাঝে মনে হয় রোগ জীবাণুর বসবাস আগে ছিলো বাইরে,  আর এখন  ভাইরাস চাষবাস বা লালন করা  হচ্ছে ঘরে ঘরে। কারণ যখন তখন পায়খানা ঘরের মাছিগুলো সারা ঘর বাড়িতে উড়ে মিষ্টান্ন বা ফলমূলের গন্ধ পেলে। আবার পেটে ব্যথা উঠলেই আরামসে বসে একটু মলমূত্র ত্যাগ করা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা হয়ে যায়,
কেননা ঘরে উঁকি মারতেই নাকে বিকট একটা দূর্গন্ধ ছোবল মারে। বেশির ভাগ পরিবারের  স্যানিটেশন গুলো আঁটসাঁট।  উচ্চ প্রেসার, হার্টের রুগীর জন্য যা বিপদজনক।  আমরা অনেক সময় অনেক রুগীর মৃত্যুর খবর শুনি,  রুগী নাকি ভালোই ছিলো এই পায়খানা ঘর থেকে বের হতেই দম চলে গেলো।  তাহলে ভাবুন  —!!

যাহোক বর্ষাকালের কথা বলি, বর্ষার পানিতে বেশির ভাগ বাড়ির আঙ্গিনা পানিতে ভরে যায়, ভরে যায় পায়খানা ঘরগুলো যা প্রতিবছর মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হয় মলমূত্র ত্যাগে। ভাইরাস ভাসে, মহা উৎসবের মতো গ্রামে গঞ্জে অলিতেগলিতে শহরে প্রান্তরে।

আমরা আসলে নিজ স্বাস্থ্য সচেতনতায় এখনো যথেষ্ট সচেতন না, দায়িত্বশীল না। আজ যেখানেই যাচ্ছি দৈনন্দিন জীবনের কর্ম গতির তালে তালে সেখানেই কোনো না কোনোরকম অস্বস্তিকর মোকাবেলা। লম্বা জার্নিতে যখন নাস্তা করা বা ফ্রেস  হওয়ার জন্য ফুড ভেলেজ বা আবাসিক হোটেলে দ্বার করানো হয় গাড়ি। ওয়াশরুমে ঢুকতেই  বিকট দূর্গন্ধের হাওয়া, আবার ওয়াশরুম গুলো  এতোটা নোঙরা চোখ খুলে তাকানোর মতো না।

আমরা ইচ্ছে করলেই কি পারিনা মলমূত্র ত্যাগের সাথেসাথে অধিক পানি নিষ্কাশন করে পরিষ্কার রাখতে ? পারি নিশ্চয়ই তবে আমরা তা করিনা।

বাঙালির স্বভাবই হলো নিজ কাজ শেষ তো পিছনে ফেরার বা দেখার প্রয়োজন কী?  নিজের পাছায় তো আর মলমূত্র লেগে নেই!  নোংরা করানো একধরনের রোগ আমাদের, যা আমরা বুঝে উঠতে পারিনা। শহরের বস্তিগুলোর দৃশ্য দেখলে পুরো মাথা নষ্ট, মানুষ কিভাবে এমন অবস্থায় জীবনযাপন করতে পারে? যখন, আমি এক প্রজেক্টে দেড় মাসের ট্যুরেতে যাই ’eminence – Center for Health  and Development Intellgence যা ওয়ার্কিং প্লেস ছিলো  সিলেট চিটাগাং বান্দরবান। ১০ টি বিশ্ববিদ্যালয় হতে আমরা ছিলাম বারোজন। প্রথম কার্যক্রম সিলেট  থেকেই শুরু করি আমরা।

সিলেটে মধ্যশ্রেণীর তুলনায় -ধনী আর নিম্ন শ্রেণির সংখ্যায় বেশি। সিলেটের শহরে বস্তিগুলো এতোটাই খারাপ অবস্থা যা বলার মতো না। থাকা খাওয়া চলা সবই কঠিন এক পর্যায়ে।  ২০টা পরিবারের লোকজন লম্বা এক ড্রেনে মলমূত্র ত্যাগ করে যা চট দিয়ে ঘেরানো। আমার মনে হইনা কেউ ওই পরিবেশ দেখে মুখে জল খাবার দিতে পারবে! এতোটাই ড্রেইন নোঙরা। আবার টিউবওয়েল এর প্রকট সমস্যা, তো আছেই। বেশিরভাগ মহিলা স্বামী পরিত্যক্তা, কাঁথা সেলাই বা অন্যের বাসায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে!  সিলেটের শহরে বস্তিগুলোর রূপ চিত্র দেখে মনেই হইনা এটা স্বাধীন দেশের এক অংশ, ভূখণ্ড।   এদেরও স্বাধীনতা বলতে কিছু চাওয়া পাওয়া আছে!
যখন আমরা সবাই মিলে এক ধনী পরিবারে গেলাম সেই চারতলা বিশিষ্ট বাড়িতে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আর টিপটপ চাকচিক্যতায় বেশ দারুণ এক প্রাসাদ।  তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো বাসার শিশুর মলমূত্রাদি যাবতীয় নোংরা জানালা দিয়ে নীচে ফেলায়, তারা।  মৃদু একটা গন্ধও ভেসে আসে বাতাসের গতিতে তবে তা যখন তখন।।  আমি জানিনা সেই প্রাসাদের মানুষগুলো কতটা সুস্থ,  তবে শিশুটির অবস্থা দেখে বুঝা গেলো পুরনো রোগের সাথে লড়ছে যার বসবাস হয়তো দীর্ঘ সবকটা ঋতুর সাথে আলিঙ্গন।  আমরা দেওয়ালের ওপারে অনেকে  নোংরা সব ফেলি,  একটিবারো ভাবিনা ভাইরাসের কতবড় ডানা, কতবড় শক্তি। উড়ে আসতে পারে তা মোটেও ভাবিনা। কম বেশি সব পরিবার গুলোতে এই এক বাজে অভ্যাস আছে জানালা দিয়ে পঁচা বাসি খাবার বা নোংরা কিছু ফেলা।  সবচেয়ে নারীরা ভয়ংকর ভুলটা যা করি,  তা হলো প্রিয়ডের প্যাড ব্যবহিত টিস্যু জানালা দিয়ে বাইরে ফেলি, কতটা ঠিক করছি নারী নামে রমণীরা? এতো মাশি এতো মশা আসে কোথা থেকে ঘরে গুণগুণ গান গেয়ে ? আমাদের ভুলগুলোই- এসব মশা মাছি রকমারি ভাইরাস সাদরে নিয়ে আসে বিশেষ অতিথি হিসেবে।
তবে চিটাগং এর মানুষকে দেখে বেশ অনুমান করা গেছে, ঘরে খাবার থাক আর না থাক, স্বাস্থ্য সচেতনায় বেশ সজাগ।  কাঁচাপাকা স্যানিটেশন যার যেটাই থাকুক না কেন,  একদম স্বাস্থ্য সম্মত।  এতোটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা যে,  সেখানে বসে খাবার খেতেও কোনো সমস্যা নেই!

আজ দেশের সরকার যা সুযোগ সুবিধা  দিয়েছেন, দিয়ে যাচ্ছেন, আমরা তার সঠিক ব্যবহার বা মান রাখতে পারিনা। ব্যক্তি স্বার্থের দৌড়ে সচেতনতা ভুলে, নিজের প্রতি যত্ন ভুলে লুটিয়ে পড়ছি অসুস্থতায় অসুখে বিসুখে- কারণ একটাই, ভাইরাসের চাষ আমরা নিজেই করে চলি অজান্তে।

জুরাইনের এক কিন্ডারগার্টেন স্কুলে গেছিলাম আর্টের টিচার হিসেবে। স্কুলের সবই ভালো লেগেছিলো, স্যালারিও দিতে চেয়েছিলেন বেশ আমায়। কিন্তু ওয়াশরুমের অবস্থা দেখে সেই স্কুলে আর দ্বিতীয় বার যেতে পারিনি। বালতির কালো জলে ভাসছিল কালো জল পোকা, আর খাবার জলটাও ছিলো অনেক গন্ধ,,,ফুটফুটে শিশুরা এ জলে রোজ পিপাসা নিবারণ করে, খবর নিয়ে শুনি সেই স্কুলের শিক্ষার্থীরা নাকি ক্রমাগত ভাবে অসুস্থ হয়।  এক সপ্তাহ টানা স্কুলে আসতে পারেনা।  পারবে কেমন করে?, ওয়াশরুমে সাবানের কোনো বংশ নেই! নেই টয়লেট টিস্যু, নেই পরিষ্কার জল।

শুধু জুরাইনের সেই স্কুলটি নয়, দেশের অনেক স্কুলের দশা ঠিক এমন। শিশুরা কি শুধু বাইরের খাবার খেয়ে অসুস্থ হচ্ছে? স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশনের অভাবেও অসুস্থ হচ্ছে।

বর্তমানে সবার ঘরে ঘরে স্যানিটেশন লেট্রিন থাকলেও তবে তা আরও বিপদ্দজনক কেন? এই একটি মাত্র কারণ, অসচেতনতা দায়িত্বশীলের অভাব, রুচিবোধের অভাব,  আর  খামখেয়ালিপনা ।

এবার আসা যাক শহর বা উপশহরে- শহর বা উপশহরের স্যানিটেশন খুব একটা চাকচিক্যময় হলেও সুবিধার নয়, আঁটসাঁট অবস্থা বেশির ভাগ বাসার।  হোস্টেল বা ম্যাসের অবস্থা তো আরও জটিল। গোসলে সিরিয়াস মলমূত্র ত্যাগে সিরিয়াল,  এতে দেহে ভূমিকম্প বয়ে গেলেও করার কিছু নেই! হাসপাতাল গুলোতেও এই একই সমস্যা।

তাই আর সমস্যাকে সমস্যা নয়ই, আসুন নিজ নিজ অবস্থান হতে, নিজ দায়িত্ব্যে নিজ তাগিদে পরিষ্কার রাখি পরিবার পরিবেশ। মনে রাখতে হবে -জীবন যতক্ষণ সুন্দর, মন ততক্ষণ সুন্দর।  আর এ জন্য জীবন রাঙাতে ও সাজাতে ভাইরাসমুক্ত পরিবেশের খুব বেশি প্রয়োজন। রুশো বলেছেন ” দূর্বল দেহ মনকে দূর্বল করে দেয়।” অতএব আর ভুলের সাথে স্নান নয়, সঠিক পথে সঠিক নিয়মে হবে সুস্থ থাকার জয়।

হও সচেতন হও হে মানব, হও সচেতন স্বাস্থ্যে, রেখো খেয়াল স্বাস্থ্য সেবায়, দেশ গড়ারই অর্থে।

.
.
.
লেখক: মানবাধিকার কর্মী। ইমেইল: [email protected] 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

যাত্রা শুরু করল ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

  স্টাফ রিপোর্টারঃ যাত্রা শুরু করেছে ইউসিবি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। গতকাল (২৯ ডিসেম্বর) ...