সড়ক নয় যেন ক্ষেত!

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর-চাঁদপুর ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কে

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: লক্ষ্মীপুর-রায়পুর-চাঁদপুর ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কের সংস্কার কাজটি এক বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও গত ২০ মাসেও সংস্কার কাজ শেষ হয়নি। ব্যস্ততম আঞ্চলিক এ মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার সড়কের নির্মাণ কাজ যেন-তেন ভাবে করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর সড়কটির কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় ক্ষুব্ধ হয়ে একাধিকবার এ সড়কের সংস্কার কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল স্থানীয় লোকজন। এর মধ্যে দীর্ঘ ২০ মাসেও সড়কটির সংস্কার কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদার ও সড়ক বিভাগের উপর চড়াও হয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে সড়টির দুই পাশে ধানের চারা রোপনের মাধ্যমে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের প্রতিবাদ করেন এলাকাবাসী।

ঠিকাদারের গাফিলতি, অবহেলা, অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় গত কয়েক মাস সড়কটির সংস্কার কাজ বন্ধ ছিল। এখন আবার বর্ষা মৌসুমে সড়কের সংস্কার কাজ শুরু করেছেন ঠিকাদার। সংস্কারের জন্য রাস্তার কার্পেটিং তুলে বড় বড় গর্ত করে কাজ শেষ না করে ফেলে রাখা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত করে রাখায় প্রায়ই গাড়ি উল্টে ঘটছে দুর্ঘটনা। সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকি না থাকায় ইচ্ছেমতো কাজ করছেন ঠিকাদার।

এতে ব্যস্ততম লক্ষ্মীপুর-রায়পুর সড়কে ধীরগতির সংস্কারের কারনে দুর্ভোগ নিত্যসঙ্গী করে এ সড়কে চলাচল কারীরা বর্ষায় কাদা ও গ্রাীস্মে ধুলার মধ্যে চরম ভোগান্তিতে চলাচল করতে হচ্ছে। বর্তমানে সড়কটি আর সড়কের অবস্থানে নেই, এটি একটি মাড়াই দেওয়া ফসলের ক্ষেতে পরিনত হয়েছে।

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জেলার উন্নয়ন সভায় ও জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন হাওলাদার লক্ষ্মীপুর-রায়পুর আঞ্চলিক মহা-সড়কের নির্মাণ কাজের অনিয়ম ও ধীরগতির কথা তুলে ধরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী উপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এ ছাড়া সড়কটির সংস্কার কাজে জড়িত সড়ক ও জনপথ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতাই আনার দাবী জানান।

অভিযোগ রয়েছে, সওজের কয়েকজন মিলে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে নিজেদের ইচ্ছামতো কাজের প্রাক্কলন তৈরী করেছেন। চলতি বছরের জুনে সড়কটির নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদার কাছের মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়িয়ে নিয়েছেন।

সড়কটিতে শুধু নতুন মাটির ব্যবহারের জন্যই ১০ কোটি ৪০ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩৯ টাকা বরাদ্ধ রয়েছে। অথচ সড়ক থেকে ওঠা মাটি দিয়েই কাজটি করা সম্ভব বলে জানিয়েছে স’ানীয় লোকজন। আবার কয়েকদিন আগে সড়কটির কয়েকটি অংশের কাজের জন্য পুনরায় আরো ৬ কোটি টাকা বরাদ্ধ নেন ঠিকাদার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে দুই যুগ পুরনো ইটের কণা-খোয়া ও ভিটি বালুর ব্যবহার, সড়কের পারে নতুন মাটি ব্যবহার না করা এবং কাজের সিডিউল অনুযায়ী সড়ক প্রশস্ত করনের কাজ করা হচ্ছে না। শুকনো মৌসুমে সংস্কার কাজের সময় পানি না ছিটানোর কারণে ধুলাবালিতে খুব কষ্ট পায় চলাচলকারীরা। ধুলাবালির কারণে সামনে কী আছে তাও দেখা যায় না। আশপাশের গাছপালা ও ফসলের ক্ষেত অনেকটা বিবর্ণ হয়ে গেছে। আর এখন বর্ষায় কাদায় ভরে গেছে পুরো সড়কটি। এতে কাদার কারনে চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে সড়কটি।

এ ছাড়া ঠিকাদারের মনগড়া ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন তীব্র জানজট ও দুর্ঘটনায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সড়কে চলাচলে নষ্ট হচ্ছে বিপুল কর্মঘন্টা। সড়কের দুই পাশে তিন ফুট করে ছয় ফুট প্রসস্ত করার জন্য মাটির বক্সকাটিং করার কথা থাকলেও বিভিন্ন স্থানে ২৭-২৮ ইঞ্চি কাটিং করা হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর-চাঁদপুর ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কে

সওজ সূত্র জানায়, সড়কটি এখন ১৮ ফুট চওড়া রয়েছে। এটি ২৪ ফুট করা হবে। দুই পাশে ছয় ফুট সমপ্রসারণের পাশাপাশি পাঁচ ফুট করে ১০ ফুট আরো মাটি ফেলে ভরাট করা হবে। লক্ষ্মীপুর থেকে রায়পুরের বর্ডার পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার নির্মাণের জন্য ৫৮ কোটি ৯৪ লাখ ১৩ হাজার ৫৭ টাকা বরাদ্ধ হয়। এর মধ্যে মাটি ব্যবহারের জন্য ১০ কোটি ৪০ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩৯ টাকা বরাদ্ধ রয়েছে। কাজটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কুমিল্লার রানা বিল্ডার্স। পরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যৌথভাবে কাজে চুক্তিবদ্ধ হয় হাসান বিল্ডার্স ও মেসার্স সালেহ আহমেদ। তারা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে।

নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক সওজের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের দু-একজন কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে এ অনিয়ম হচ্ছে।

উক্ত কাজের ঠিকাদার আজিজুল করিম বাচ্চু নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সড়ক সংস্কার কাজে ব্যবহারকৃত যন্ত্রপাতির সমস্যা ও মন্ত্রণালয়ের কিছু কাজ অনুমতি না পাওয়ার কারণে সড়কের কিছু অংশের কাজ দেরি হচ্ছে। শিগগিরই বাকি কাজগুলো শেষ করা হবে।

লক্ষ্মীপুর সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শুভ্রত দত্ত জানান, নিয়ম মেনে কাজ করা জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিতে সংস্কারকাজে কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সঠিকভাবে দ্রুত সড়কের সংস্কার কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে।

এছাড়া সড়ক নির্মাণের পর কোনো সমস্যা হলে তিন বছর পর্যন্ত ওই ঠিকাদারকেই তা সংস্কার করে দিতে হবে। অব্যবস’াপনার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লিবিয়ায় বিমান হামলায় ৫ বাংলাদেশি নিহত

ডেস্ক নিউজ :: লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে একটি বিস্কুট কারখানায় বিমান হামলায় সোমবার ...