সড়ক দুর্ঘটনায় এক বছরে ৪৮৩৯ জন নিহত: নিসচা

নিসচা

স্টাফ রিপোর্টার :: ২০১৮ সালে তিন হাজার ১০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় চার হাজার ৮৩৯ জন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও সাত হাজার ৪২৫ জন।

নিসচার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে প্রাণহানি কমেছে। সংগঠনটির হিসাবমতে, ২০১৭ সালে সড়কে নিহত হয়েছিলেন পাঁচ হাজার ৬৪৫ জন।

মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন নিসচা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ১০ দফা সুপারিশও করা হয়েছে নিসচার প্রতিবেদনে।

সংবাদ সম্মেলনে ইলিয়াস কাঞ্চন জানান, ছয়টি জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন ও অনলাইনের খবর এবং নিসচার দেশব্যাপী শাখাগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সাড়ে চার হাজার মৃত্যুর সংখ্যা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে মনে করেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

তিনি বলেন, অনেক আঞ্চলিক তথ্য অপ্রকাশিত রয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমে আসেনি। এ কারণে সড়ক দুঘর্টনার প্রকৃত সংখ্যা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের নির্দেশ সত্ত্বেও পুলিশ, হাসপাতাল ও জেলা প্রশাসন দুর্ঘটনার নিয়মিত তথ্য দেয় না। এ কারণে দুর্ঘটনার হতাহতের পুরোপুরি সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা যায়নি।

বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যার তারতম্যের প্রসঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, সঠিক সংখ্যা খুঁজে পেতে সরকারকে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে। সরকার না পারলে বেসরকারি সংগঠনগুলোকেই দায়িত্ব দিতে বলেন।

প্রতি বছর সড়কে হাজার হাজার প্রাণ গেলেও বিচার হয় মাত্র দুই-একটি ঘটনার।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে দুই যুগ আন্দোলন করে একুশে পদকপ্রাপ্ত ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বিচার না হওয়ার কারণ হচ্ছে, সরকার পরিবহন খাতের সংগঠন ও নেতাদের খুবই ভয় পায়। ভয়ের কারণেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। যখনই পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, তখনই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। মানুষ উত্তেজিত হয়। সরকার মনে করে, এই বুঝি তার গদি চলে গেল।

নিসচার প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জেলাওয়ারি হিসাবে ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়। গত বছর ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৩৪৬ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে গাড়িচাপায়। মোট নিহতের ৪৬ শতাংশ অর্থাৎ এক হাজার ৩৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে গাড়িচাপায়। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ৫৮৫ জনের। গাড়ি উল্টে প্রাণ গেছে ২৫৩ জনের।

নিসচার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় বড় ছিল বাস। তিন হাজার ১০৩টি দুর্ঘটনার মধ্যে বাসের কারণে ঘটেছে ৮৭৯টি। ট্রাকের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭৯৩টি। ওই বছরে দুর্ঘটনায় পড়ে ৬৩৪টি মোটরসাইকেল। ১৬০ জন মোটরসাইকেল চালকের প্রাণ গেছে ২০১৮ সালে। বাসচালক নিহত হয়েছেন ৬৪ জন। ট্রাকচালক নিহত হয়েছেন ৫৯ জন।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মহাসড়কে।

ইলিয়ার কাঞ্চন বলেন, এ থেকে প্রতীয়মান হচ্ছে, মহাসড়কে আইন মানছে না যানবাহন। অবৈধ ও ধীরগতির গাড়ি মহাসড়কে চলায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাস বেশি সংখ্যায় দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার অন্যতম কারণ বেপরোয়া গতি ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ঘোষিত তিন চাকার অটোরিকশা, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা, নছিমন-করিমন-ভটভটির মতো অবৈধ যানবাহন চলছে; যা বন্ধে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন তৎপর নয়। এসব যানবাহনের চলাচলে স্থানীয় রাজনীতিকদের প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর জন্য জনঘনত্ব, অপর্যাপ্ত রাস্তা ও ট্রাফিক আইন অমান্য করাকে দায়ী করা হয়েছে নিসচার প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, উল্টোপথে গাড়ি চলাচল বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাবে তা কার্যকর হচ্ছে না। পথচারীরাও নিয়ম মানেন না। যত্রতত্র সড়ক পারাপারকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করা, সব সড়কে উঁচু বিভাজক (রোড ডিভাইডার) নির্মাণ ও মহাসড়কগুলো চার লেনে উন্নীত করে ধীরগতির যানবাহনের জন্য নিচুতে পৃথক লেন নির্মাণের সুপারিশ করেছে নিসচা। এ ছাড়াও যত্রতত্র পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা, ছাদে যাত্রী পরিবহন, অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন ও বেপরোয়া গতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ করা হয়েছে। বেকার তরুণদের ঋণ দিয়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ চালক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বলেছে নিসচা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রুটি দূর হওয়ায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমেছে। এ জন্য সব সড়কের নকশাজনিত ত্রুটি দূর করতে হবে। এ ছাড়াও স্কুলের পাঠ্যক্রমে ‘ট্রাফিক শিক্ষা’ অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে নিসচা মহাসচিব সৈয়দ এসহানুল হক কামালসহ সংগঠনটির কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত ২৫ জানুয়ারি ‘যাত্রী কল্যাণ সমিতি’ নামে আরেকটি বেসরকারি সংগঠনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০১৮ সালে পাঁচ হাজার ৫১৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ২২১ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হন ১৫ হাজার ৪৬৬ জন। যাত্রী কল্যাণ সমিতির দেওয়া পরিসংখ্যানের তুলনায় নিসচার হিসাবে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান

জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এসডব্লিউএ -এর পরিচালনা সংসদের সভা

স্টাফ রিপোর্টার :: প্রায় দুইশতাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, নেটওয়ার্ক ও জোটের আন্তর্জাতিক ...