ব্রেকিং নিউজ

স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি হতে কি বার্তা পেলাম ?  

রিপন আশরাফ

রিপন আশরাফ :: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমান  চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, আনেস্থেটিস্ট থাকা দরকার মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড সংখ্যা বাংলাদেশের তা নাই। এটা প্রচন্ড হতাশার দিকটি যা প্রবল ভাবে  করোনার মধ্যে আমাদের দেখতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে একজন ডাক্তারের বিপরীতে নুন্যতম তিনজন নার্স প্রয়োজন অথচ আমাদের আছে দশমিক পাচ জন। প্রয়োজনীয় সেবা-চিকিৎসা অবকাঠামোর অনুপস্থিতি তো আছেই । অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর পার হয়ে যাচ্ছে। কেন রাস্ট্র আমাদের জনগনের জন্য চার যুগের বেশি সময়ে এসব আবশ্যিক কাঠামো –পরিকাঠামো দাড় করাতে ব্যর্থ হয়ে গেল? বাজেট কম? মনোযোগ ছিলনা? দায়-দায়িত্বের অভাব  ছিল? রাস্ট্র উদাসীন ছিল? এসব প্রশ্নের এক কথায় উত্তর কী হতে পারে? স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য চিন্তা বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে বিভোর ছিল নতুবা হতে পারে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ অপ্রতুল ছিল। এই বিষয়ে সরেজমিনে আমরা কি কি উপাদান পাই তা পর্যালোচনার দাবী রাখে।

প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে৷ স্বাস্থ্য খাতে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য মোট ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেট বরাদ্দের ৭.২ ভাগ এবং জিডিপির ১.৩ ভাগ৷ তবে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা৷ ২০১৯-২০ সালে বরাদ্দ ছিলো ২৯ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৫.৬৩ ভাগ৷ এবার বাজেটে আগের চেয়ে তিন হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ করা হয়েছে৷ আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিলো ২২ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা৷ স্বাস্থ্যখাতের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে ১৩টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ৷ স্বাস্থ্যখাতে প্রস্তাবিত বাজেটের ১৬ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকাই অবশ্য পরিচালন ব্যয়৷

এবার করোনা ভাইরাসের কারণে স্বাস্থ্যখাতের বাজেট বাড়ানো হয়েছে ১৩ শতাংশেরও বেশি৷ আর করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি কোনো চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে৷ অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন কোভিড-১৯ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিভাগ আরো সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে৷

বিএমএ নেতা  ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বেড়েছে ভালো কথা৷ কিন্তু এটা পরিকল্পনাহীন৷ থোক বরাদ্দ কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয় নয়৷ এর ফলে যা হয়, এই বরাদ্দের ৮০ ভাগ চলে যায় ব্যক্তিগত তহবিলে৷ দুর্নীতি খেয়ে ফেলে৷ তাহলে আর বরাদ্দ বাড়িয়ে লাভ কী?’’

আসলে দুর্নীতি প্রতিরোধে বাজেটে কোনো পরিকল্পনার রূপরেখার আসল কথাই  বলা হয়নি৷ কি ভয়ংকর তথ্য? ভাবা যায়! বরাদ্দ অর্থ দিয়ে কি কি কাজ কিভাবে করতে হবে তার কোন নির্দেশনা থাকবেনা এটা কি ধরনের জনবৈরি বার্তা! ভাবতে অবাক লাগে  স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি রোধে বা অপচয় কমাতে  অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় কিছুই বলেননি৷ তাহলে এই বরাদ্দ কি খালি বরাদ্দের জন্য বরাদ্দ?  বলা যায় যেন হাওয়াই ঘোষনা মাত্র। আমাদের ৩৩০ জন সংসদ সদস্যের কোন একজন সদস্য বাজেট অধিবেশনে এই সব প্রশ্ন জনস্বার্থে কেন আলোচনা পর্যালোচনা করলেন না। কেউ পয়েন্ট অব অর্ডার নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। স্বাস্থ্য মন্ত্রানালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এসব পর্যালোচনা করে কার্যকর রূপরেখা ও সুপারিশমালা দিয়েছে এমন প্রমান আমরা পায়নি।  এটা অবশ্যই তাহলে একটা দুর্নীতি সহায়ক বাজেট হয়েছে৷ সঙ্গত কারনেই বরাদ্দ বাড়লেই যে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন হবে এমন আশা করা যায়না৷

যার পরিনাম রিজেন্টের সাহেদের, জেকেজির সাবরিনার, মিঠুর বা অপরাজিতা বাংলাদেশের সারমিনে নিন্মমানের মাস্ক, পিপি, কীট-টেস্ট জালিয়াতির নমুনা, বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও মুদ্রা পাচার । সকল হিমালয় সম দুর্নীতিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর মন্ত্রনালয় যে জড়িত তা এই মুহূর্তে  অঘটন সংগঠিত হবার পর গণমাধ্যমের কল্যানেই আমরা এখন একের পর আরেক জানতে  পাড়ছি। র‍্যাব –ডিবি-সিআইইডির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার হওয়া মাফিয়ারা রিমান্ডের কবলে পরে  বলে দিচ্ছেন সরকারের দফতরের উচু তলার লোকেদের নাম। পরিস্কার ভাবে তারা সব জানতেন । জেনে বুঝে ঠান্ডা মাথায় নির্বিকার ভাবে এই গন দুশমনদের দুষমনিতে সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার দরজা খুলে দিয়ে সব মাসতুতো ভাইরা মিলে ভাগ যোগ করে লাভবান হয়েছেন। সাহেদ সাবরিনা  শারমিন বা মিঠুদের বাপের সাহস নেই উচ্চ মহলের সহযোগিতা ছাড়া এসব কাজ বহাল তবিয়তে করে যাওয়া। রাস্ট্রের উচ্চ পদস্থদের নৈতিক স্খলন কত ব্যাপক যা আলোচনা করলে হাজার রজনী পার হয়ে যাবে। কিন্তু এইসব রুপকথা-কপকথার মত কথা মনের ভিতরের গল্পগুলি  বলে শেষ হবে না। স্মরণকালের বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্নীতির এই থাবা কত বড় থাবা তার কিছুটা বোঝাতে-

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ১৮৬ গুণ বেশি দাম দেখানো হয়েছে৷ এক সেট পর্দার দাম দেখানো হয়েছে ৩৭ লাখ টাকা৷ ১৭৫ কোটি টাকার নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কেনা হয় গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য৷ রংপুর মেডিকেল কলেজে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও চার কোটি টাকার সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি কেনা হয়, যা কখনোই ব্যবহার করা হয়নি৷

২০১৭ সালে টিআইবির খানা জরিপে স্বাস্থ্যখাতকে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়৷ জরিপে অংশ নেয়া ৪২.৫ ভাগ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ঘুস দুর্নীতির শিকার হয়েছেন৷

সর্বশেষ চিকিৎসকদের জন্য পিপিই এবং এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারির কথা সবার জানা৷ এখনো তদন্তই চলছে৷

একটি বিস্ময়কর তথ্য বা বড় বার্তা যে এসব দুদক জানতো। এমনকি তাই গত বছর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির ১১টি খাত চিহ্নিত করে৷ তার মধ্যে বেশি দুর্নীতি হয় ৮ টি খাতে:  ১)কেনাকাটা ২) নিয়োগ ৩) পদোন্নতি  ৪)বদলি  ৫)পদায়ন  ৬)চিকিৎসাসেবা  ৭)চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার ৮)ওষুধ সরবরাহ খাতে৷

সাদা চোখে দেখা দুর্নীতির বাইরে একটি অভিনব দুর্নীতির কথাও তখন বলে দুদক৷ আর তা হলো, দুর্নীতি করার জন্য অনেক অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা৷ এমন যন্ত্রপাতি কেনা হয় যা পরিচালনার লোক নেই৷ ওইসব যন্ত্রপাতি কখনোই ব্যবহার করা হয়না৷

দুদক তখন এই দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ করে বলে, দুর্নীতির কারণেই স্বাস্থ্যখাতের করুন অবস্থা৷ তারা তাদের এই তদন্তপত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ব্যবস্থা নেয়ার জন্য৷ কিন্তু সময় মত এসব আমলেই নেওয়া হয়নি। যে কারনে আজকের বাংলাদেশ কত কড়া মাশুল দিচ্ছে। প্রবাসীরা পজিটিভ সনদ নিয়ে  প্লেনে উঠে ল্যান্ডিং এর পর আবার টেস্টে পজিটিভ হয়ে ইতালির মাটি সহ অনেক দেশের মাটিতে পা স্পর্শ করতে পারছেনা। নিউইয়র্ক টাইম সহ বিশ্ব মিডিয়ায় বলা হচ্ছে টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশে করোনার সন্দ বাণিজ্য । কত বড় কলংক তিলক আমাদের কপালে।

স্বাস্থ্য খাতে নাকি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে কমপক্ষে এক হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে স্বাস্থ্যখাতের যন্ত্রপাতি কেনায়৷ সরকারি কাঠামোগুলি কতটা বেহাল হলে পূর্বেকার বছরগুলিতেও একই খাতের এসব ক্ষত চিহ্ন দেখার পরেও এতদিন কীভাবে নিরব থাকতে পারে? এই প্রশ্নটি হাজার কথার  সমান নয় কী?

এমনকি ২৭টি সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটার তথ্য নিয়ে সংবাদমাধ্যম দুর্নীতির এই চিত্র প্রকাশ করে৷ এজন্য এসব দেখার জন্য কি দেশ স্বাধীন করেছিল ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধারা, বেসরকারি–সরকারি হায়েনারা-শকুনেরা জাতির পতাকা খামছে ধরেছে।

“আমি কিছু জানি না”-এই খাতের উজির এই গৎবাঁধা বাক্য ছাড়া যেন তার আর কথা নেই।  তিনি কি লজ্জা–শরমের মাথা খেয়েছেন । বিবেক কোন বর্ষার জলে ধুইয়ে নিয়ে চেয়ারে বসেছেন?  তিনি তবে জানেন কী? আমরা কপাল দোষে ইনাকে পেলাম কেন? কেন বিধি বাম হোল? এসব খামাকাদের হাত থেকে নিস্তার পেতেই হবে ।

করোনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আসল চেহারা খুলে দিয়েছে৷ দেখিয়ে দিয়েছে এই খাতটি কতটা দুর্বল৷ আর সাধারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলতে গেলে ভেঙে নগ্ন হয়ে পড়েছে৷ এখান থেকে যদি  বাংলাদেশ শিক্ষা  না নিয়ে সবার জন্য সত্যিকারের দুর্নীতির রাহুগ্রাস মুক্ত সবার জন্য স্বাস্থ্য বান্ধব ব্যবস্থা গড়ে না তোলে, তবে সেটা হয়ে যাবে বাংলাদেশ ভয়ংকর দেশদ্রোহী পরিচালিত একটি সংগঠন মাত্র ।  আশায় আমরা বুক বেধে আছি সামনে ঝলমলে রোদে অন্ধকার দূর হয়ে এগিয়ে যাবে আমাদের সোনার –প্রানের বাংলাদেশ। সত্যিকার ভাবে স্বাস্থ্য  অধিদফতর  দুর্নীতিমুক্ত হয়, তার যাত্রাটা শুরু করতে হবে এখন থেকেই।

একজন  আবুল কালাম আজাদের পদত্যাগেই কোন ভাবেই যেন যথেষ্ট না হয়। স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান বলেন, কোনো ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিচার না হলে দেশে কোনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে না। দুর্বৃত্তায়নের লালন করা হবে। তিনি বলেন, কাউকে সরিয়ে দেওয়া বা বদলি করা কোনো শাস্তি নয়। জড়িত অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদের (স্বাচিপ) মহাসচিব ডা. এম এ আজিজ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কোনো ঘটনা ঘটলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি বা ওএসডি করা হয়। কেউ চাকরি ছেড়ে চলে যায়। তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে। বদলি কোনো সমাধান নয় বলে জানান তিনি।

 

লেখকঃ কলামিস্ট

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

করোনায় আরও ৪২ জনের মৃত্যু: নতুন শনাক্ত ২৯৯৫

স্টাফ রিপোর্টার :: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ...