সেই ছেলেটি আজ কাস্টমস ফারুক

জুঁই জেসমিন :: নব বিকশিত কুসুম কলির মত উদ্ভাসিত হয়ে সৈয়দ বংশে জন্ম নিলেও কালের প্রবাহে এবং পিতামহের সহজোগিতার অভাবে আর দশ জন ছাত্রের মত সুযোগ ও সুবিধায় নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় পড়ালেখা করতে পারেনি ফারুক। জীবনের শুরু থেকে যুদ্ধ, স্বপ্ন ও সংগ্রাম একটাই পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া। ” যেখানে পড়ালেখা করতে হাতপাখা ও সোয়েটার নিজ হাতে তৈরি করে বিক্রি করতে হয় শুধু মাত্র এসএসসির ফরম ফিলআপের টাকা যোগাড়ের জন্য, সেখানে অজানা অচেনা শহরের গর্ভে পড়ালেখা করার আশ্রয়টুকু যে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন,আর এই আশ্রয়টুকু ধরে রাখতে যতই কঠিন হোক না কেন পাপ বা পূর্ণের হিসেব ছুঁড়ে ভয়ংকর এক কাজ করতে পাপের শিরোনামে কালো কুকুরের সন্ধানে বের হতে হবে, এক কোপে এক কালো কুকুর মারতে হবে এবং তা রাতের মধ্যেই এক মুন্সির কাছে নিয়ে যেতে হবে বাঘিনীর জঙ্গলে। তা না হলে বাসার মালিক সাহেবা তাকে বের করে দেবেন। আর বের করে দিলেই তাকে রাস্তায় নামতে হবে রিক্সা বা ভেন চালাতে নিজ পড়ালেখার জন্য।
ভাবতে ভাবতে চলতি পথে পেয়ে যায় এক কালো কিশোরী কুকুর। ফারুকের হাতে শক্ত ভারী গাছের ডাল, বার বার বিবেকের ছোবল কিন্তু নিরুপায়, মাথায় এক আঘাত করতেই কুকুরটি মাটিতে লুটে পড়লে তা বস্তায় ভরিয়ে রাতের রানার মতো হন হন করে ছুটে চলে বাঘিনীর জঙ্গলে। মুন্সির কথা মতো নির্জন জঙ্গলে একাকী কুকুরের একটি দাঁত চাকু দিয়ে তুলে পুর্নভবা নদীর তীরে শ্মশানঘাটের দিকে ছুটে চলে ফারুক। সেই শ্মশানে কুকুরটির দাঁত ও তাবিজ পুঁতে দিতে পারলেই মালিক সাহেবার কাছে নাকি অবাধ্য স্বামী ফিরে আসবেন।
কিন্তু শ্মশানে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই তুমুল ঝড়,ভয়ে তার গা ছমছম করে উঠে, কোনো ক্রমে একটু মাটি আলগা করেই সেগুলো পুঁতে এক পা দো পা এগুতে থাকে-চারদিক কুকুরদের ভয়াল কান্না,মাথার ওপর যেন যম, মৃত্যুর ঘণ্টা বাজায়, পথে এক ঝাঁক কুকুর তাকে ঘিরে ফেলে সে দৌড় মারে উল্টো পথে দৌড়াতে দৌড়াতে অজানা পথে চলে যায়, যে পথ যে গ্রাম সবই অজানা তার। ভোরের আভায় এক ট্রাকে চেপে মালিক সাহেবার বাসা ফিরে আসে ফারুক সাহসিকতার সব’কটা জানালা খুলে। সকালে পান্তাভাত, আর রাতে গরম ভাত দেওয়া হতো জীবন সংগ্রামী ফারুককে। দুপুর বিকেল এক খাস্তা খুরমা খেয়েই রোজ কাটিয়ে যেতো তার।
ছোটো বেলায় কতশত দিন না খেয়ে গেছে সেই দিন গুলো ফারুক আজও ভুলতে পারেনি! ক্ষেত বাড়িতে যেখানে সেখানে কচি কুশার পড়ে থাকলে তা চিবাইতে চিবাইতে স্কুল যেতো , কলোনির সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছে ক্ষুধার্ত মানুষের ভিড়ে দুটি রুটির জন্য। এভাবেই ক্ষুধা নিবারণ করে গেছে দিনের পর দিন। ক্রমশ বাড়ি থেকে প্রথমিক শেষ করে নানির বাড়িতে থেকে মাধ্যমিক স্কুল পড়াশোনা চলে তাঁর। মামা মামীর আদেশ ছিলো রোজ মাছ ধরে নিয়ে আসতে হবে পুকুর ডোবা খাল বিল হতে। তবেই সে খেতে পাবে।
রাতের জ্যোৎস্নায় সে স্কুলের পড়া পড়েছে, পাখা ও সোয়েটার বানিয়েছে, রান্নাঘরে চুলোর আগুনে বই পড়েছে,তার সময়ে ছিলোনা বিদ্যুৎ! হারকিন বা কুপি জ্বালিয়ে পড়বে, সেই সামর্থ ছিলোনা কেরোসিন তেল কেনার। এসএসসি পরীক্ষার সময়ে তার জুতো না থাকায় মামার এক পুরনো ছেঁড়া জুতো মুচির কাছ থেকে ঠিক করে নিয়ে আসে প্রায়ই মাইল দশএক পথ হেটে। কিন্তু ঠিক করে আনলে কী হবে, সে ঠিক করে আনা জুতো পরে যেতে পারেনি পরীক্ষা দিতে, কারণ তার মামী জুতো জোড়া কেড়ে নেয়! ছলছল চোখে বাধ ভাঙা নদীর মতো স্বপ্ন গন্তব্যে ছুটে চলে নীরবে, আগের পুরনো জোড়াতালি চটিজুতো পরে শেষমেশ পরীক্ষা দিতে যেতে হয়েছে।
বাসার মালিক কিভাবে কেমন করে জানি বুঝতে পারে, লজিং মাস্টার ফারুকেই তার বউকে সাহায্য করে, দোয়া তাবিজ করতে ওঝা কবিরাজের কাছে যেতে। মালিক কোনো ক্রমই রাখতে নারাজ লজিং মাস্টার ফারুককে। শেষমেশ অনেকের অনুরোধে থাকার ব্যবস্থা হলেও চলে অমানবিক আচরণ! বাজার করা, তিনবেলা ওদের মেয়ে দুটোকে পড়ানো ,এসবের মধ্যে গাছ কেটে খড়ি করা, এই কাজটা ছিলো বড় কঠিন! হাতে ফসকা পর্যন্ত পড়ে গেছিলো তার।
এভাবে দেখতে দেখতে চলে আসে এইচএসসি পরীক্ষার ফরম ফিলাপের সময় , চিন্তা এখন ফরম ফিলআপের, বারোশত টাকা প্রয়োজন। হাতে মাত্র পাঁচশত টাকা। উপায়? উপায় একটাই রিক্সা চালিয়ে বাকিটাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এতো টাকা এমনি এমনি তো কেউ দেবে না। গভীর ভাবনায় একরকম আশ্বাসে গ্যারেজের পরিচিত মালিককে অনুরোধ করে,রিক্সা নেন। চলে একটানা বারো রাত রাতের শহরে রিকশা চালানো। রাত ১১ টা হতে ভোর ৪ টা পর্যন্ত ১২ রাতে ৭০০ টাকা জোগার করেন যার সাক্ষ্য সে যুগের আদি জনপদ। বি, এ পরীক্ষা দিয়ে সে ঢাকা চলে যায় আজ ফারুক আর সেই লজিং মাস্টার বা রিক্সা চালক নেই!
টুপটাপ বৃষ্টি ফোটার মত ছন্দে কারুকাজে রাঙিয়ে তোলে জীবন- আজ তিনি ‘সুপারিন্টেনডেন্ট বাংলাদেশ কাস্টমস’। তিনি নিজ এলাকা শুধু না পুরো উপজেলার অসংখ্য গরিব পরিবারে আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি,গরিব ছাত্র ছাত্রীদের স্কুলের বেতন, বই কেনার টাকা দিয়েছেন, এলাকার দিন মজুর লোকদের গাভী কিনে পুষতে দিয়েছেন কারো কাছ থেকেই দুধ বিক্রির টাকা বা লাভের বৃহৎ ভাগ পর্যন্ত নেননি, এতিম অসহায় অনেক মেয়েকে নিজ খরচে বিয়ে দিয়েছেন ভাল পাত্রের সাথে। অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের পথ করে দিয়েছেন, একক খরচে প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদ্রাসা,যা ১৯ বছর ধরে মাদ্রাসার সকল দায়িত্ব বহন করে যাচ্ছেন আর্থিক সহযোগিতা ও প্রেরণাদানে।
সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যা অতীতকে লুকিয়ে দম্ভে পথ চলে, ভাবসাবে মনে হয় যেন বিশাল এক খানদানি নামীদামী বংশের ছেলে। কিন্তু এই ফারুক সাহেব অতীতকে লুকোতে চাননি, বরং অতীতের কষ্টমাখা স্মৃতিতে রোজ স্নান করে, সাধারণ মানুষের কাছে তার জীবনীর পাতা একের পর এক উল্টাতে থাকেন। তিনি চান হোক প্রত্যেকে পরিশ্রমী, হোক সংগ্রামী। দেশের মানুষ প্রত্যেকে ভাল থাকুক।
সত্যিকার জ্ঞানী যারা তারা অতীতকে অস্বীকার করতে পারেনা। অতীতেই তাদের কাছে এক স্বর্ণময় সাফল্যের সনদ। জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে তার রয়েছে বিশাল চাঞ্চল্যকর কাহিনী , ঢাকার জীবন,এম এ পাশ, প্রেম,বিয়ে, সব যেন অদ্ভুত এক রহস্যের যুদ্ধ খেলা। এসব অবশ্যই থাকছে তবে তা গল্পের দ্বিতীয় পর্বে ।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

সত্তর’র ভয়াল ১২ নভেম্বর

এএইচএম নোমান :: ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রোজা কনকনে শীত গভীর রাতে ...