মুজাহিদুল ইসলাম সোহেল, নোয়াখালী প্রতিনিধি ::
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের চরপানা উল্যা এলাকায় ফসলি জমির মাটি কেটে, করাতকল বসিয়ে বনের গাছপালা উজাড় করে ইট তৈরি করছে আকবর কবির ব্রিকস (একেবি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুবর্ণচর উপজেলায় মোট ১৭টি ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে নয়টির অবস্থান চর আমানউল্যাহ ইউনিয়নে। এখানে বেশ কয়েকটি ইটভাটায় করাতকল স্থাপন করে গাছ পোড়াতে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলাবালিতে আশপাশের বাড়িঘর ছাই ও কুড়োই আচ্ছাদিত থাকে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও গ্রামবাসীর মধ্যে সর্দি, কাশি ও ফুসফুসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে।
এ নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কিবরিয়া বলেন, সকালে গোসল করে জামা কাপড় শুকাতে দিতে পারিনা। এমন একটা শীতের মৌসুমে ও বাড়ির আঙিনায় কাঁথা কম্বল রোদে দিতে পারিনি। ইটভাটার ধোঁয়ার কারণে আমার বাড়ির গাছ মরে যাচ্ছে কোন ফল হয়না। টমোটো ফলন অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম হয়েছে। এভাবে ভাটা চলতে থাকলে এলাকার মানুষের অনেক ক্ষতি হবে।’
স্থানীয়রা বলছে, এই এলাকা পুরোটায় সবজি উৎপাদন এলাকা। এখানে বারমাস সবজি ফলায় কৃষক। দেশের প্রতিটি অঞ্চলে প্রতিদিন কয়েকটি ট্রাক বোঝাই সবজির গাড়ি যায়। কোটি কোটি টাকার সবজি রপ্তানি হয়।
স্থানীয়রা জানান, ১২-১৩ হাজার ইট নিয়ে ট্রাক চলাচল করার পর নতুন রাস্তার পলেস্তরা উঠে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ওই ইটভাটার মালিক কবির মাঝি প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ও তিন ফসলি জমিতে ইটভাটা গড়ে তুলেছেন তিনি। এতে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, কমছে জমির ফলন।
এলাকাবাসী বলছেন, আইন অনুযায়ী জনবহুল এলাকায় ইটভাটার জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র পাওয়ার সুযোগ নেই। তবু বহাল তবিয়তে চলছে একেবি ব্রিকস। বিষয়টি নিয়ে কয়েক দিন আগে জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম কিবরিয়া। এরপর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে প্রশাসনের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। এর আগে অন্যরা অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি।
সরেজমিনে উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের চরপানা উল্যা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিন ফসলি জমির মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে একেবি ইটভাটায়। সেই মাটি দিয়ে কাঁচা ইট বানিয়ে পোড়ানোর জন্য মজুত করে রাখা হয়েছে। এর ২০ মিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থান সুবর্ণচর উচ্চ বিদ্যালয়, ৩২০ পরিবারের শেখ হাসিনা কলোনী ও চরপানা উল্যা গ্রাম জামে মসজিদের। ভাটাসংলগ্ন ১০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে অন্তত ছয়টি গ্রাম। ৮০০ থেকে ৯০০ মিটার দূরত্বে রয়েছে ৩টি সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৫টি মাদ্রাসা ও দুটি বাজার। একই দূরত্বে রয়েছে চরজব্বারা ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স।
এ ছাড়া ইটভাটা থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরেই রয়েছে আরও দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ, দুটি গ্রাম এবং মসজিদসহ বিভিন্ন এজেন্ট ব্যাংক ও এনজিও অফিস। অর্থাৎ সম্পূর্ণ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চলছে একেবি ইটভাটার কার্যক্রম।
শিক্ষার্থীরা বলছে, ভাটায় ইট পোড়ানোর সময় ধোঁয়া তাদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এ বিষয়ে প্রশাসন ও সরকারের হস্তক্ষেপ চাইছে তারা।
স্থানীয় নুর উদ্দিন বলেন, ‘আমার বাড়ির সঙ্গেই ইটভাটা। এর ধোঁয়ায় বাড়ির আসবাবপত্রসহ কাঁঠাল, আমগাছ নষ্ট হচ্ছে।’
আবদুল মতিন বলেন, ‘ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে স্কুলের বাচ্চারা শ্বাসকষ্ট রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। আমি এর প্রতিকার চাই।’
সুবর্ণচর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হাকিম বলেন, ‘ইটভাটার কারণে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। সেই সঙ্গে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তাই দ্রুত এটি বন্ধ করার জোর দাবি করছি।’
চরজব্বার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এডভোকেট ওমর ফারুক বলেন, নিয়ম ভেঙে ইটভাটাটি গড়ার ফলে ফসল ও মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক তদন্ত করে এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
সুবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ইটভাটার কালো ধোঁয়ার কারণে শ্বসনতন্ত্রে মারাত্মক অসুস্থতা তৈরি হতে পারে। ওই ইটভাটা পরিদর্শনে শিগগিরই স্যানিটারি কর্মকর্তাকে পাঠানো হবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিবেচনায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হবে।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবলু চন্দ্র কাহার সুভাষ কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে বলেন, কয়লা সঙ্কট থাকায় আগুন জ্বালাতে কাঠের ব্যবহার করা হয়। তবে আস্তে আস্তে কাঠ পোড়ানো কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি আমরা। এখন স্কুলের শিক্ষার্থী ও জনসাধারণ অসুস্থ হলে কী করার আছে? ইট না থাকলে তো আর ঘরবাড়ি-স্কুল-কলেজ পাকা হতো না।’ তবে বন্ধ করার নির্দেশ পেলে ভাটা বন্ধ করে দেবেন বলে জানান তিনি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ অবশ্য বলছেন ইটভাটাটিকে প্রত্যয়নপত্র না দেয়ার কথা।
তিনি বলেন, ‘আমার কাছে ইটভাটার প্রত্যয়নপত্র চেয়ে আবেদন করেছিল। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ইটভাটাটি হবে কৃষিজমিতে। তাই পরে আর প্রত্যয়নপত্র দেয়া হয়নি।’
জানতে চাইলে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিহির লাল বলেন, সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ দেওয়ান মাহবুবুর রহমান বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের আলোকে তদন্ত করা হবে।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here