সুন্দরবনে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় পানির ন্যায্য হিস্যা চেয়েছে বাংলাদেশ

সুন্দরবনে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় পানির ন্যায্য হিস্যা চেয়েছে বাংলাদেশ

সোহানুর রহমান, কলকাতা থেকে :: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব মোকাবিলা ও সুন্দরবনকে তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখতে যে কোনো মূল্যে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর বিকল্প নেই। তাই উজানের দেশগুলো থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা ও যথাযথ বন্টনের দাবি তুলেছেন জলবায়ুকর্মীরা। এছাড়া সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রাখতে আন্তদেশীয় সমন্বিত পরিকল্পনা এবং স্থানীয় মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর দাবি তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বনজীবীদের বিকল্প জীবিকায়ন  এবং যথাযথ জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে নানা অব্যস্থাপনা, দখল-দুষণ প্রতিরোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

সোমবার (১৫ এপ্রিল) পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে সুন্দরবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তারা এসব দাবি তুলেছেন।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে ভূগোল ও পরিবেশ পত্রিকা গোষ্ঠীর তত্বাবধানে দুই বাংলার সুন্দরবনের জলবায়ু সংক্রান্ত দিনব্যাপী আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে। সুন্দরবন অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতি, জীবন ও জীবিকায় বিরুপ প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় করণীয় বিষয়গুলো সম্মেলনের আলোচনায় স্থান পায়। জলবায়ু ন্যাযতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুন্দরবনকে সুরক্ষিত রাখতে তরুণ প্রজন্মকে আরো জোরদার ভূমিকা পালনের আহবান জানান বক্তারা।

সুন্দরবনে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় পানির ন্যায্য হিস্যা চেয়েছে বাংলাদেশ

সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত  ছিলেন আন্তজার্তিক পরিবেশ ও নদী বিজ্ঞানী, বিশ্বভারতীর ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মলয় মুখোপাধ্যায়। সুন্দরবনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিষয়ক আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তব্য রাখেন সুন্দরবন গবেষক গৌতম কুমার দাস, কলকাতার সরশুনা কলেজের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক ডঃ শাশ্বতী রায়, সিধুকানু বিরষা মুন্ডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের শিক্ষক বিশ্বজিৎ বেরা, গবেষক সনত কুমার পুরকাইত এবং বাংলাদেশ মডেল ইয়ুথ পার্লামেন্টের প্রধান নির্বাহী  সোহানুর রহমান প্রমুখ। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সম্মেলনের আহবায়ক ও আয়োজক সংস্থা ভূগোল ও পরিবেশ  পত্রিকার সম্পাদক উমাশংঙ্কর মন্ডল। সম্মেলনে ভারত ও বাংলাদেশের  গবেষক ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দেড়শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নুনের আধিক্য সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভের জন্য ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে উঠেছে। ভারতীয় সুন্দরবনের তুলনায় বাংলাদেশ সুন্দরবনের বিপন্নতা আরও বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ততা বেড়ে চলেছে। শুষ্ক মৌসুমে নুনের পরিমাণ বাড়ে সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কিন্তু তা কাটানোর জন্য উজান থে বিভিন্ন গবেষণা বলছে যে বাংলাদেশের সুন্দরবনে গড়পড়তা সমুদ্রের জল বাড়ার প্রবণতা বছরে দশ মিলিমিটারের কাছাকাছি অর্থাৎ ২১০০ সালে সমুদ্র প্রায় আড়াই ফুট পাড়ের কাছাকাছি উঠে আসতে পারে। এর ফলে যে সমুদ্র তীরবর্তী বাংলাদেশের বড় অঞ্চল জলে ডুববে তাতে সন্দেহ নেই। সুন্দরবনের সমুদ্রতলের তাপমাত্রা ০.০৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড গারে বাড়ছে প্রতি দশকে।যা বিশ্বের আনুপাতিক গড় ০.০৬ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড প্রতি দশক। পাশাপাশি রয়েছে তীব্র সামুদ্রিক ঝড় বাড়ার সম্ভাবনা।

ইতিমধ্যে নার্গিস, সিডর, আইলার মতো ঝড় আছড়ে পড়েছে এই অঞ্চলে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে দুর্যোগের ঝুঁকি  ক্রমশ বাড়ছেই। এতে শুধুমাত্র জীবন হারানোর আশঙ্কাই নয়, আরও বেশি করে জীবিকা হারানোয় আশঙ্কা রয়েছে। নদীতে কমছে মাছ, আশংকাজনকভাবে কমছে সুন্দরী গাছ, বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর  কমছে। পাশাপাশি কমে আসছে জঙ্গল নির্ভর মধু,মোম ইত্যাদি। জলবায়ুগত পরিবর্তনে প্রাকৃতিক পরিবেশে দুর্যোগের প্রভাব পড়ায় কৃষিতে সমস্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে।  জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের প্রতিকারের ব্যাবস্থা সুন্দরবনে ভীষন দুর্বল।পরিবেশবান্ধব সংগঠিত শিল্প এবং বিপণন ব্যবস্থা যেমন দুর্বল যা আর্থ সামাজিক ব্যবস্থায় শিকড় আলগা করে দিচ্ছে। মৎস্য বীমা,কৃষি বীমার তেমন কোন প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপদ যখন তখন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে কলকাতা বা ঢাকার মতো শহরের বুকে।ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন নানা রকম প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের কবলেও পড়েছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন ।

সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে তেলদূষণ, শব্দদূষণ, অগ্নিকান্ডসহ আরো নানা ধরনের মনুষ্যসৃষ্ট আপদ। অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প এবং শিল্প কারখানা সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। যত সুন্দরবন নষ্ট হবে, নষ্ট হবে বাদাবনের দেওয়াল; তত বিপদ বাড়বে। এই বিপদ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা হাতে নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশকে এগিয়ে আসার আহবান জানানো হয়।

এসময় বক্তারা আরো বলেন,  সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে ভারত এবং কলকাতা শহর। তাই কলকাতাকে সুন্দরবন রক্ষা উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ সুন্দরবন সুরক্ষিত থাকলে রক্ষা পাবে কলকাতা এবং ঢাকা।   সম্মেলনটি আয়োজনে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ মডেল ইয়ুথ পার্লামেন্ট।

সংগঠনটির চেয়ারপারসন ফিরোজ মোস্তফা জানান, এ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে পানি বন্টনের দাবি তোলা হয়েছে।

পরবর্তী সম্মেলন এ বছররের নভেম্বরে ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ সুন্দরবন লাগোয়া সাতক্ষীরা শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান

জার্মানিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এসডব্লিউএ -এর পরিচালনা সংসদের সভা

স্টাফ রিপোর্টার :: প্রায় দুইশতাধিক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, নেটওয়ার্ক ও জোটের আন্তর্জাতিক ...