সুইডেনে নাজমুন নাহারের করোনা ডায়েরি

বিশ্ব যখন লকডাউন তখন সুইডেন কেন লকডাউন নয়?

নাজমুন নাহার ::  বৈশ্বিক এই করোনা অস্থিরতার মধ্যে কেমন আছে সুইডিশরা? বিশ্ব যখন প্রকম্পিত এই পরিস্থিতিতে সুইডেন তখন শিথিল অবস্থা অবলম্বন করছে, যেমনটা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘নিরপেক্ষতা পদ্ধতি অবলম্বন’।

আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি- আমার মনে হয় সুইডেনই পৃথিবীর একমাত্র উদাহরণ যেখানে করোনার জন্য এখনো দেশটিকে লক ডাউন করা হয়নি। এখন একটি প্রশ্ন পুরো ইউরোপ জুড়ে, “সুইডেন করোনার সঙ্কটটিকে গুরুত্বের সাথে কেন নেয় না?”

ঘর থেকে বের হয়ে যখন বাইরে হাঁটবেন তখন খুব একটা বেশি অনুধাবন করা যাবেনা যে সারা পৃথিবীতে আসলে কি হচ্ছে সেটার প্রভাব কোনভাবে এখানে পড়ছে কিনা!

সুইডেনে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ১৮০ জন, আক্রান্তের সংখ্যা ৪,৪৩৫ জন। বৈজ্ঞানিকরা ধারণা করছেন যে লক্ষণ ছাড়াই আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজারেরও বেশি। এই পরিস্থিতি নিয়ে সুইডেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তারা সুইডেনের সরকারকে জানিয়েছে এভাবে চলতে থাকলে সুইডেনের মানুষ করোনায় বিপর্যস্ত হতে বেশি সময় লাগবে না।
তবে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সুইডিশ চিকিৎসক এবং গবেষকরাও কোভিড -১৯ এর শিথিল পদ্ধতির জন্য সুইডিশ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছেন।

কিন্তু সরকার তার নিজস্ব স্টাইলে আগাচ্ছেন। সরকার তাদের পূর্ববর্তী মহামারী অভিজ্ঞতা থেকে শিথিল অবস্থা অবলম্বন করেছেন। অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইতিমধ্যে দেশটি শিথিল পদ্ধতির সাথে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যখন এর প্রতিবেশীরা ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। সুইডেনের করোনভাইরাস কৌশলটি অন্য দেশের তুলনায় স্পষ্টভাবে আলাদা, তবে লোকেরা কার উপর নির্ভর করবে? এবং সামনে কী আছে তা নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না।

করোনাভাইরাস যখন স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে প্রবেশ করল, তখন নরওয়ে এবং ডেনমার্ক বিস্ফোরণ রোধে তাদের সীমানায় বিস্তৃত বিধিনিষেধ তৈরি করেছিল। কিন্তু তাদের প্রতিবেশী সুইডেন একটি সিদ্ধান্তযুক্ত ভিন্ন পথ নিয়েছিল।

ডেনমার্ক এবং নরওয়ে যখন তাদের সীমানা, রেস্তোঁরা এবং স্কুলগুলো বন্ধ করে দিয়েছে এবং এই মাসে সকল শিক্ষার্থীকে বাড়িতে থাকতে বলছে। অন্যদিকে সুইডেন কেবলমাত্র তার বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ বন্ধ করে দিয়েছিল তখন। তবে এখন পর্যন্ত প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, পাব, রেস্তোঁরা এবং সীমানা খোলা রেখেছে – এবং কোনও সীমাবদ্ধতা রাখেনি।

সুইডেনের দৃষ্টিভঙ্গি কোভিড -১৯ নামক এই রোগের সাথে কেন এমন শিথিলতা পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, অথচ এখন পর্যন্ত যার কোনও নিরাময় বা ভ্যাকসিন নেই।

বর্তমান এই পরিস্থিতিতে সুইডিশ সরকারের এই কৌশল সমর্থনের বেশ কয়েকটি যুক্তি দিয়েছেন, এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং খাদ্য সরবরাহের লাইনে মূল চাকরিতে কাজ করা পিতামাতাদের কাজের সুযোগে রাখার জন্য স্কুলগুলি উন্মুক্ত রাখা দরকার।
সরকার এই শিথিল কৌশল পদ্ধতি অবলম্বন করে তারা তাদের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার জন্য এবং মানুষ যেন চাকরীচ্যুত হয়ে ঘরে বসে না থাকে তাই করোনার এই ঝাঁকুনির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সচেতনতা হিসেবে শিথিল শান্তিময় কৌশল অবলম্বন করেছেন সুইডিশ সরকার।

প্রত্যেকটা অফিসের মধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে কেউ অসুস্থ থাকলে বাসায় থাকার জন্য, কিংবা বাসা থেকে কাজ করার জন্য। এখানে শিথিলতা অবলম্বন করেছে ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত খোলা রাখা হয়েছে।

বড় গ্যাদারিং করা যাবে না, বড় বড় ম্যাকডোনাল্ডস, চেইন রেষ্টুরেন্টগুলো বন্ধ হয়েছে। শুধু তাই নয় বিভিন্ন শহরের রেষ্টুরেন্টগুলো যেখানে বসে মানুষ অনেকক্ষণ ধরে খাওয়া দাওয়া করতেন আড্ডা মারতে সেখানকার রেস্টুরেন্ট গুলো এখন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। সে রেস্টুরেন্টগুলোতে মানুষ এখন আর খেতে যাচ্ছে না। এর মধ্যে কিছু কিছু টেকওয়ে রেস্টুরেন্ট মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। কাঁচা বাজারের স্টোর, ছোট ছোট সুপার শপ খোলা আছে। খাদ্য ঘাটতির কোন অসুবিধা নেই।

রাষ্ট্রের মহামারীবিদঅ্যান্ডারস টগনেল একটি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন যে সুইডেনের কৌশল বিজ্ঞানের উপর ভিত্তি করে চলছে। আমরা প্রচুর পরিমাণে করোনা প্রসারণটি ধীর করার চেষ্টা করছি যাতে বেশিরভাগ রোগীদের হাসপাতালে না আসতে হয়, তাতে আমরা পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারবো।

সুইডিশ কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করে যে লক্ষণ ব্যতীত অনেক সংক্রামিত লোক রয়েছে এবং যারা ক্লিনিকাল নজরে আসে তাদের মধ্যে পাঁচ জনের মধ্যে একজনকেই কেবল হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হবে। বাকিরা বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে পারবে।

মহামারীটি ছড়িয়ে পড়বে তাতে সন্দেহ নেই, তবে এর গতি বিতর্কিত। জাতীয় জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দেশের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক-ডাউনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করছে, তবে রাজধানী অঞ্চল স্টকহোমে এই ধরনের হস্তক্ষেপ কার্যকর করতে এখনও আলোচনা চলছে।

যদিও অন্যান্য স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলির তুলনায় সুইডেনের বিধিনিষেধগুলি যথেষ্ট স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা হয়েছে, তবুও এটি গোথেনবার্গের মতো শহরে অতিরিক্ত হাসপাতালের জায়গা তৈরি করে করোনভাইরাস রোগীদের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যান্য সংক্রামক রোগগুলি শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পরেও কোভিড -১৯ জটিলতা এখানে শিশুদের তুলনামূলকভাবে বিরল।

সুইডিশ সরকার যুক্তি দেখান যে, একটি দীর্ঘমেয়াদী লকডাউনের বড় অর্থনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে যা ভবিষ্যতে সংস্থানগুলির অভাবে স্বাস্থ্যসেবা ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারে। এটি শেষ পর্যন্ত কোভিড- মহামারীর তুলনায় আরও বেশি মৃত্যু এবং দুর্ভোগের কারণ হতে পারে।

শেষ পর্যন্ত, এই মুহুর্তে সুইডেনে ভাইরাসটির অসম এবং অপেক্ষাকৃত বিনয়ী সংক্রমণের কারণে, এর প্রাথমিক কৌশলটি ততটা খারাপ হতে পারেনি। তবে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকহারে বেড়ে গেলে সরকারকে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, কারণ স্টকহোমে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে।
সুইডেনের জনসংখ্যা কম এবং অর্থনৈতিক অবস্থা অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো হওয়ার কারণে এখানে এই শিথিল অবস্থার গ্রহণযোগ্যতা এখানকার জনগণ অনেকে স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। তবে রিস্ক গ্রুপে থাকা বয়স্করা এই ব্যাপারে খুবই উদ্বিগ্ন।

তবে সুইডিশরা বাইরে চলাফেরা করার সময় সবাই নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছেন। তারা যথেষ্ট সচেতনতা অবলম্বন করছেন।
দূরত্ব বজায় রাখা, যারা অসুস্থ তারা ঘরে অবস্থান করছেন, যে যার মত করে বাসা বাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখা, বারবার হাত ধোয়া, ইত্যাদি সব নিয়মবিধি সঠিকভাবে মেনে চলছে এখানকার জনগণ।

এখন পর্যন্ত সুইডেনে ২ দুইজন বাংলাদেশী করোনায় আক্রান্ত এবং একজন প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়াও সুইডেনের বিভিন্ন হাসপাতালের রিস্ক জোনে কর্মরত আছেন বাংলাদেশের অনেক ডাক্তার এবং নার্সরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন সুইডেনের বিভিন্ন হাসপাতালে। আমার বিশ্বাস তাদেরকে বিধাতা বাঁচিয়ে রাখবেন করোনার ভয়াল থাবা থেকে।

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

আন্তর্জাতিক সর্বজনীন তথ্যে প্রবেশাধিকার দিবস: সংকটকালে তথ্যে প্রবেশাধিকার

হীরেন পণ্ডিত :: বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ মহামারী সময়ে, ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছরের মতো এবারো ২৮ ...