বাংলাদেশের প্রত্ন সম্পদের  মাঝে হাটিকুমরুলের “নবরত্ন” মন্দিরটি অন্যতম প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন। নবরত্ন মন্দির, শিব পার্বতী মন্দির, দোচালা মন্দির, শিব মন্দিরের গায়ে শুশোভিত পোড়া মাটির চিত্র ফলক নিয়ে এ লেখার অবতারনা। সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানার হাটিকুমরুল একটি পাড়াগাঁ। প্রাচীন প্রত্নতাত্বিক নির্দশন ছাড়াও এই গ্রামে রয়েছে একটি ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি পরিবার পরিকল্পনা অফিস। হাইওয়ে থানা, পোষ্ট অফিস, পেট্রোল পাম্প, অত্যাধুনিক রেস্টুরেন্ট ফুডগার্ডেন এবং তৎসংলগ্ন বাসস্ট্যান্ড। বগুড়া-নগরবাড়ি মহাসড়কের হাটিকুমরুল বাসস্ট্যান্ডে নেমে পুর্বদিকে তাকালেই দেখা যাবে পায়ে চলা একটি পথ। একে বেকে চলে গেছে। এই পথ ধরে সামনে এগুলেই প্রথমে দোচালা মঠ, এর পরেই শিব পার্বতী মঠ, তারপর আর একটু এগুলেই দেখতে পাবেন এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ প্রত্নতত্ত্ব নির্দশন “নবরত্ন মন্দির”। নবরত্ন মন্দির সংলগ্ন পশ্চিম পার্শ্বে রয়েছে একটি বৃহৎ খাস পুকুর। এটা লক্ষ্য করলেই  বোঝা যাবে স্থানটি এককালে ছিল হিন্দুদের ধর্মীয় পীঠস্থান। হয় তো একদিন এই গ্রামেই আসতেন শত শত তীর্থ যাত্রী। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বরসতী নদীর কল কল রব। আর তীর্থ যাত্রীদের পদস্পর্শে মুখরিত হয়ে উঠতো গ্রামখানী। সে সব এখন বিলুপ্ত। মহাকালের বিবর্তনে ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন ধারন করে কোন রকমে টিকে আছে নবরত্ন মন্দিরগুলো।  নবরত্ন ঃ ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত থেকে জানাযায়, নবাব মুর্শিদকলি খার আমলে স্থানীয় জমিদার রমানাথ ভাদুরীর অর্থায়নে অস্টাদশ শতাব্দির প্রথমার্ধে মন্দিরটি নির্মিত হয়। মন্দিরটি ৫২.৬ ফুট বাহু বিশিষ্ট বর্গাকার এবং ত্রিতল। দেখতে দিনাজপুরের কান্তজির মন্দিরের অনুরুপ। মন্দিরের দেওয়ালে সর্বত্রই পোড়া মাটির চিত্র শোভিত। গ্রামীন শিল্পীদের অংকিত পোড়া মাটির ফলকে রয়েছে হিন্দুদের ক্রেতা অবতার, রাম-রাবনের যুদ্ধের দৃশ্য। রাবনের রথ চালনার দৃশ্য। গদা হাতে বিষ্ণু অবতার, হুনুমানের বীরত্ব, ও কিন্নরী প্রভৃতি ধর্মীয় চিত্র। এ ছাড়াও রয়েছে গ্রামীণ নারীর অসংযত যৌবন, মাতৃত্ব এবং লোক জীবনের নানা চিত্র, ফুল লতা পাতার নক্সা, সুদীর্ঘ সময়ে অযত্ন আর অবহেলা মন্দিরটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। একের পর এক হারিয়ে যেতে থাকে পোড়া মাটির ফলকগুলো। দুর্বৃত্তরা গুপ্ত-ধনের আশায় খোঁড়াখুড়ি করে ভিতের ক্ষতি সাধন করে। এছাড়াও বট পাকড়ের গাছ জন্মায় এবং ভূমি কম্পের ফলে দেওয়ালে ফাটল দেখা দেয়। যা ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করে। বিগত কয়েক বছর বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক মন্দির গুলো প্রাচীন পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করে সংস্কারের কাজ হাতে নেয়। কিন্তু তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। নবরত্ন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি শংকর কুমার রায় জানান, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মন্দির সংস্কার ৩য় দফা সংস্কার কাজ করেন এবং মন্দিরটি রক্ষনাবেক্ষণের জন্য এক জন নাইট গার্ড মাষ্টারুলের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছে। বর্তমানে মন্দিরের এরিয়ার জন্য দেড়বিঘা জমি অধীগ্রহণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় মন্দিরের প্রাচীন নির্মাণ পয় নিস্কাশন, পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং দর্শনার্থীদের বসার জন্য বেদী তৈরী করা, মন্দিরের প্রবেশ পথ সহ পাকা রাস্তা করণ, মন্দিরের চারিপাশে ৮ ফিট ঢালাই সহ দর্শনার্থীদের স্নানের জন্য পুকুরের ঘাট পাকা করণ এবং মন্দির এলাকায় বিদ্যুতায়ন আসু প্রয়োজন। অথচ প্রাচীন এই পুরাকীর্তি রক্ষা করা আমাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এ বিষয়টি জাতীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব শফিকুল ইসলাম শফি স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ্ব জাহিদুল হক সহ উল্লাপাড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা অতুল সরকারকে উন্নয়ন করার জন্য ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংসদদের পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়।

শিব মন্দির :

নবরত্ন মন্দিরের দক্ষিণ পশ্চিমে রয়েছে একটি শিব মন্দির। শিব মন্দিরটি এক চূড়া বিশিষ্ট। অনেকটা পিরামিড আকৃতির মন্দিরটি ১৫.৩ ফুট বাহু বিশিষ্ট বর্গাকার। অপরটি শিব পার্বতী মন্দির এক কক্ষ অবস্থিত। দশা দেখে মনে হয়না কেউ এসব আইন মেনে চলে। মন্দিরটি নবরত্নের সমসাময়িক মনে করা হয়। দোচালা মন্দির ঃ নবরত্ন মন্দিরের কিয়দংশ দুরে এক বাংলা দোচালা মন্দির অবস্থিত এবং  ২০.৩ ১২.৩ ফুট আয়তকার ভূমির উপর স্থাপিত। এদুটি মন্দিরে কোন পোড়ামাটির চিত্র নেই। যতদুর জানাযায় দেবেন্দ্র নাথ ভাদুরী নামক ব্রাহ্মণ কর্তৃক মন্দিরটি নির্মিত বলে এলাকাবাসী জানায়। (ছবিসহ)

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/সুজন সরকার/সিরাজগঞ্জ

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here