ব্রেকিং নিউজ

সিটি নির্বাচন পেছাল ইসি

স্টাফ রিপোর্টার :: অবশেষে সিদ্ধান্ত পাল্টাল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ঢাকার দুই সিটির ভোট গ্রহণের দিন পিছিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বদলে গেছে এসএসসি পরীক্ষা শুরুর তারিখও। ১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে পরীক্ষা শুরু হবে ৩ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচন পেছানোর দাবিতে দুই সপ্তাহজুড়ে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন, ইসি ও আদালতে একের পর এক আবেদন এবং বিভিন্ন মহলের তীব্র্র সমালোচনার পর ইসি এ সিদ্ধান্ত নিল। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন চার মেয়র প্রার্থী। সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।

শনিবার কমিশনের এক জরুরি সভায় ভোট পেছানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিকেল সোয়া ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বৈঠকের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেন, বিষয়টি খুবই জটিল ছিল বলেই সময় লেগেছে। ৩০ জানুয়ারি পূজার দিন ভোট নির্ধারণের ব্যাখ্যায় তিনি আবারও বলেন, সরকারি ক্যালেন্ডার দেখে তারা ভোটের দিন ঠিক করেছিলেন। সরকারি ক্যালেন্ডারে পূজা ২৯ জানুয়ারি দেখানো হয়েছিল। সাংবাদিকরা জানতে চান, কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন পেছানো হলো? সিইসি জানান, কোনো ভিত্তি নেই। যদিও দাবি ওঠার শুরু থেকেই নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের বিষয়ে এত দিন অনড় অবস্থানে ছিল ইসি। এর আগে সকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নির্বাচনের দিন পরিবর্তনে তার দলের কোনো আপত্তি নেই।

ভোটের দিন পরিবর্তনের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আজ একটি আবেদনের শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। তার আগের দিন ইসি তার নতুন এ সিদ্ধান্তের কথা জানাল। এর আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ একাধিক নেতা পূজা ও ভোট একই দিন নির্ধারণের সমালোচনা করেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের এই দাবিতে একাত্মতা প্রকাশ করেন দুই সিটির মেয়র প্রার্থীরাও। বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেন আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য পংকজ নাথ। গত ২২ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুসারে ৩০ জানুয়ারি ঢাকা উত্তর ও  দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোট গ্রহণের দিন নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ২৯ জানুয়ারি সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে পরদিন ৩০ জানুয়ারি সকাল ১১টা পর্যন্ত সরস্বতী পূজার তিথি উল্লেখ করে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তনের নির্দেশনা চেয়ে ৬ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগে রিট করেন আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ। শুনানি শেষে আদালত রিট আবেদন খারিজ করে দেন। ওই একই আইনজীবী ভোটের দিন পরিবর্তনের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন।

এর আগে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে ইসিতে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছিল। ভোট পেছানোর দাবিতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী আমরণ অনশন শুরু করেন। গতকাল তারাও অনশন ভাঙেন।

পূজার জন্য ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটের দিন বদলের দাবিতে বিভিন্ন মহলের জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার বিকেলে জরুরি বৈঠকে বসে ইসি। সোয়া ৪টায় এ বৈঠকে যোগ দিতে নির্বাচন কমিশনারদের টেলিফোন করা হয় ইসি সচিবালয় থেকে। বৈঠকে ডাকা হয় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের দুই রিটার্নিং কর্মকর্তাকেও।

সিইসি কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে চার নির্বাচন কমিশনার বৈঠকে বসেন। সন্ধ্যায় মাগরিবের বিরতির দিয়ে রাতে আবারও শুরু হয় বৈঠক। সূত্র জানায়, এই সিদ্ধান্তের আগেই মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েছিলেন কমিশনের সদস্যরা।

এর আগে সকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তারিখ এগিয়ে আনা কিংবা পেছানো সম্ভব কিনা, তা কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভোটের তারিখ পরিবর্তন বিষয়ে তিনি বলেন, আগামী ৩০ জানুয়ারি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দিন সরস্বতী পূজা পড়ায় নির্বাচন পেছানোর জন্য আন্দোলন করছে ছাত্রসমাজ। তিনি বলেন, ভোটের তারিখ আগানো কিংবা পেছানোর সুযোগ আছে কিনা, সেটা এক জিনিস; আর সম্ভব কিনা, সেটা আরেক জিনিস। পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে। আদালত যদি বলে, তাহলে তো কমিশনকে ভোট পেছাতেই হবে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতিগতভাবে আমরা প্রতিটি জিনিস নিয়ে আন্দোলন করি। কিন্তু কতটা যৌক্তিক এসব বিষয় দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় সরকারকে অথবা অন্য প্রতিষ্ঠানকে। সবকিছু বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে।

এর আগে ইসি কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর একাধিকবার নির্বাচনের দিন পরিবর্তনের সুযোগ নেই বলে কমিশনের অনড় অবস্থানের কথা জানান। এমনকি তিনি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের পরও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। কেন তারা করছেন? কারা তাদের সংগঠিত করছেন- এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অন্যভাবে বোঝানো হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা ভুল বুঝতেই পারেন। কারণ, তাদের তো বয়স কম। আমার ধারণা, তাদের এই ভুলটা কেটে যাবে এবং তারা বিষয়টি বুঝতে পারবেন।’

ইসি সচিব আরও বলেছিলেন, ‘সরকারি ক্যালেন্ডারে ২৯ জানুয়ারি পূজার কথা বলা আছে। ক্যালেন্ডার তো সেদিন হয়নি, এটি অক্টোবরে হয়েছে এবং নভেম্বরে এটি গেজেট আকারে প্রকাশ হয়েছে। সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই ক্যালেন্ডার রয়েছে। তখন কেন তারা সরকারের কাছে বলেননি পূজা ২৯ নয়, ৩০ তারিখে। সরকার যদি মনে করত, পূজা ৩০ তারিখে, তাহলে সেদিন পূজার তারিখ ঘোষণা করত। তাহলে আমরাও ২৯ তারিখেই শিডিউল দিতে পারতাম, কোনো সমস্যা ছিল না। এখন সরকারিভাবে ২৯ তারিখ পূজার তারিখ দেওয়ায় সেদিন ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না নির্বাচন কমিশনের।’

ভোটের দিন পেছানোর দাবি করে হাইকোর্টে রিট দায়েরকারী আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ বলেছেন, ভোটের কেন্দ্র স্কুল-কলেজে হয়। আর সরস্বতী পূজাও হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। এ কারণে একই দিনে ভোট ও পূজা হলে সাধারণ মানুষের পূজা উদযাপন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এটা সংবিধানেরও বিরোধী।

তবে রিটের শুনানি নিয়ে ১৪ জানুয়ারি বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন। কারণ হিসেবে আদালত তখন বলেন, গত ২ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২৯ জানুয়ারি সরস্বতী পূজা উপলক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি নির্ধারণ করে। সুপ্রিম কোর্টের চলতি বর্ষের ক্যালেন্ডারেও ওই দিন ছুটি। ছুটি নির্ধারণের পর রিট আবেদনকারীসহ কেউই কোনো আপত্তি জানাননি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ৩০ জানুয়ারি ভোটের দিন ঘোষণা করেছে। প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রচারও চলছে। নির্বাচনের দু’দিন পর থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে। এই পর্যায়ে ভোটের তারিখ পেছানোর কোনো সুযোগ নেই। সারবত্তা না থাকায় রিটটি সরাসরি খারিজ করা হলো।

পেছাল এসএসসি পরীক্ষা :ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কারণে পিছিয়ে গেল ২০২০ সালের মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষাও। ১ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে একযোগে এ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরিবর্তিত সময়সূচি অনুসারে, এ পরীক্ষা ৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিয়াউল হক গত রাতে সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। রাত ৯টায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালেও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, পরীক্ষার পরিবর্তিত সময়সূচি শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে।

বিশিষ্টজন সোচ্চার ছিলেন :নির্বাচন পেছানোর দাবিতে কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। এ দাবিতে শনিবার রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ৩১টি সংগঠনের জাতীয় সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক, বাসুদেব ধর, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, স্বপন কুমার সাহা, পলাশ কান্তি দে, মনোরঞ্জন মন্ডল, ভদন্ত সুনন্দপ্রিয় ভিক্ষু, নির্মল রোজারিও, সঞ্জীব দ্রং, রামানন্দ দাস, সন্তোষ শর্মা, অ্যাডভোকেট অশোক ঘোষ, গোবিন্দ চন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ।

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

পাপুল কুয়েতের নাগরিক হলে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে: প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার :: লক্ষ্মীপুর-২ আসনের এমপি কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল কুয়েতের নাগরিক ...