সিটি নির্বাচন ও আমজনতার কথা

রহিমা আক্তার মৌ

রহিমা আক্তার মৌ :: আব্বাইচ্ছা আর আঁচিয়া নতুন দম্পতি। দুইজন দুই ঢাকার ভোটার। আঁচিয়া ‘ক’ ঢাকার ভোটার আর আব্বাইচ্ছা ‘খ’ ঢাকার ভোটার। দুই ঢাকার মেয়র প্রার্থী নির্ধারণ হবার পর থেকেই আঁচিয়ার মন খারাপ, কারণ ও ‘খ’ ঢাকার প্রার্থীকে পছন্দ করে। আঁচিয়া ওর মূল্যবান ভোটটা পছন্দের লোককে দিতে চায়, কিন্তু…..
আব্বাইচ্ছার পছন্দের ব্যক্তি ‘ক’ ঢাকা থেকে দাঁড়িয়েছেন। একই সমস্যা ওর, সে ‘খ’ ঢাকার ভোটার কিন্তু ক ঢাকার পছন্দের ব্যক্তিকে কি করে ভোট দিবেন। একই চিন্তা দুজনের ভেতরে। বেশি চিন্তা আঁচিয়ার, কারণ পছন্দটা একটু গভীর জায়গার। অবশেষে দুজনে সমযোতায় এলো দুজনে ভোট দিবে তবে আঁচিয়া দিবে আব্বাইচ্ছার পছন্দের প্রার্থীকে আর আব্বাইচ্ছা দিবে আঁচিয়ার পছন্দের প্রার্থীকে। সুন্দর ভাবনা, ভাবনা শুনেই গলা ছেড়ে গাইতে ইচ্ছে করে, এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি……..
পহেলা ফেব্রুয়ারি হয়ে গেলো ঢাকা সিটি নির্বাচন। “আমার ভোট আমি দিব, যাকে খুশি তাকে দিবো, জেনে শুনে বুঝে যোগ্য প্রার্থীকেই দিব”। ১৯৭৫ সালে জন্ম বলে ১৯৯৪ সালে ভোটার হই, প্রথম ভোট দিই ১৯৯৬ সালে। সে থেকে এই পর্যন্ত সব নির্বাচনে ভোট দিয়েছি, আমার ভোট আমিই দিয়েছি। কখনও হেরেছি কখনও জিতেছি। দেশকে প্রতিমুহূর্তে ঠিক একই ভাবে ভালোবেসেছি। ১৯৯৭ সালে দেশের বড় একটা রাজনৈতিক দল থেকে রাজনীতিতে অংশ নেয়ার প্রস্তাব পাই। স্বাভাবিক ভাবেই সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই। কারণ আমি সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের কেউ হতে চাইনি। আমি সাধারণ আমজনতা হয়ে চলতে থাকতেই পছন্দ করি। ২০০১ সাল থেকে সন্তানদের অভিভাবক হিসাবে একটা স্কুলে আছি। তিন বছর পরপর অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন হয়, প্রায় বছর অনেকের আবদার ছিলো যেন আমি প্রতিনিধি প্রার্থী হই। কিন্তু ঠিক একই কারণে আমি তা চাইনি। আমি সব সময় আমজনতাই থাকতে চাই।
পহেলা ফেব্রুয়ারি ২০২০ সিটি নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্যে দুপুর একটায় বের হই। বলে রাখি আমি আগে যে এলাকায় বসবাস করতাম সে এলাকার ভোটার আমি। তাই নির্বাচনের দিন ঘর সংসারের কাজ সামলিয়ে ভোট দিতে বের হই, এবারও ঠিক তাই। ভোট কেন্দ্রের বাইরে থেকে আইডি কার্ড দেখিয়ে সিরিয়াল নাম্বার জেনে নিই। সে ভাবে সেই বুথে যাই ভোট দিতে। রুমে ঢুকতেই দেখি তিনজন লোক(পুরুষ) রুম থেকে বেরিয়ে যান। আমি আমার সিরিয়াল নং বলে চার আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে যাচাই বাচাই করে মুল্যবান ভোট প্রধান করি। বের হয়ে আসার সময় অন্য দুই রুমে চোখ পড়ে। আরেকটা রুমে সেই তিনজনকে দেখতে পেয়ে একটু দাঁড়াই। তখনিই মনে পড়ে আগের বার সিটি মেয়র নির্বাচনে একই কেন্দ্রে আমি উনাদেরকে দেখতে পাই। সেই বার মহিলা কেন্দ্রের ভেতরে এতো পুরুষ লোক কেনো তা জানার জন্যে এই তিনজনের একজনকেই জিজ্ঞেস করি। একজনকে জিজ্ঞাস করায় উনি অন্যদের বলেন, ‘উনি জিজ্ঞাস করছে এত পুরুষ লোক মহিলা কেন্দ্রে কি করে’ কথা শুনার পর উনারাও আমায় দেখে। মনে হল কথা তো বলিনি, আমি চিড়িয়াখানার জন্তু বা কোন জানোয়ার দাঁড়িয়ে আছি। এক পর্যায়ে আমি পুলিশকেও জিজ্ঞেস করি। তখন পুলিশ অনেকগুলো ছেলেপুলেকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়।
আমি তিনজন লোককে অন্য রুমে দেখে একটু দাঁড়াই। রুমের সামনে দাঁড়ানো আইনের পোষাক পরা লোককে জিজ্ঞেস করায় উনি বলেন,
— উনারা পোলিং ও পিজাইডিং অফিসার।
— পোলিং ও পিজাইডিং অফিসার তো বসে আছেন। একরুমে কয়জন করে থাকেন পোলিং ও পিজাইডিং অফিসার।(যদিও আমি জানি একরুমে একজন সহকারী পিজাইডিং অফিসার ও দুইজন পোলিং অফিসার থাকেন। আর দলীয় এজেন্টরা থাকেন।)
উনি কোন জবাব দিলেন না। রুমে ভোটার ছিলেন দুজন, উনারা পর্দার আড়ালে ভোট দিতে গেলে সাথে অন্য নারী ও পুরুষও যায়। অথচ ভোট দেয়ার গোপন রুমে ভোটার ছাড়া কারো প্রবেশ নিষেধ। আর কি ভাবে ইভিএমে ভোট দিতে হবে তা কিন্তু পিজাইডিং ও পোলিং অফিসার শিখিয়েই দিয়েছেন। পুরো রুমে অনেক মানুষ দেখে আমি মোবাইলের ক্যামেরা অন করি একটা ছবি তুলতে। একটা ক্লিক ও করি কিন্তু সেই মুহূর্তে দরজায় এক মহিলা চলে আসায় ভেতরের ছবি তেমন উঠে নি। একজন পুলিশ বুঝতে পেরে আমায় জিজ্ঞেস করে আমি কেনো ছবি তুলছি। ততক্ষণে আমি ক্যামেরা অফ করে মোবাইল লক করে ফেলি। আর ছবি তুলিনি বলি। সেই সময়ে এখানে আসেন সেই তিনজনের দুইজন। উনারা আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করে। আমি বলি, আমি একজন ভোটার। উনারা আবারও আমার পরিচয় জানতে চায়। আমি বলি আপনারা কেউ ড্রেস পরা কেউ গলায় দলীয় স্টিকার নিয়ে ঘুরেন আর আমি তো একেবারেই সাধারণ আমজনতা। পোষাক নেই, নেই সাইনবোর্ড ও। এখানে আমার কি কাজ তা জানতে চাইলে ভোট দিতে আসার কথা বলে বুইরা আঙ্গুলের কালির দাগ দেখাই। আর বলি,
“হাসপাতালে ডাক্তারদের রুমের সামনে ওষুধ কোম্পানির লোকেরা ঘুরঘুর করে। সুযোগ পেলেই ডাক্তারের রুমে ঢুকে, ওষুধ নিয়ে কথা বলে। পেসেন্টরা ডাক্তারের রুম থেকে বের হলেই তাদের হাতের প্রেসক্রিপশন দেখে। এক একটা হাসপাতালে অনেক কোম্পানির লোক থাকে। আর প্রতিটা হাসপাতালে একজন সিবিল ড্রেসের লোক থাকে যিনি নজর রাখেন ওই ওষুধ কোম্পানির লোকদের দিকে। ওরা ঠিক দায়িত্ব পালন করে কিনা তা দেখার জন্যে। ধরে নিন আমি তেমন কেউ।”
উনারা আমার কথার হিসাব মিলাতে মিলাতে আমি নিচে নেমে আসি। পরিচিত জনদের সাথে কিছুক্ষন গল্প করি। সেই দুই লোকের নির্দেশে পরপর দুই মহিলা নেত্রী এসে আমার পরিচয় জানতে চায়। আমি সাধারণ ভাবেই জবাব দিই, বলি আমি একজন ভোটার। এক পর্যায়ে একজন বয়স্ক নেত্রী এসে আমায় জিজ্ঞেস করেন,
— আপনার বাসা কোথায়?
— আমার বাসায় যাবেন।
— না, জানতে চাইলাম যে কত নাম্বার বাড়ি আপনার।
— আমায় কি চেনা চেনা লাগে?
— আমি তো আপনার সাথে খারাপ আচরণ করিনি, এমন জবাব দেন কেনো?
— আমিও তো খারাপ জবাব দিইনি। কত ভোটার আসে আপনি কি সবার বাসা নাম্বার জিজ্ঞেস করেন।
— না,  মানে….
— আমি জানি আপনাকে কে বা কারা পাঠিয়েছে।
এই কথা শুনার পর উনি চলে যান। কারণ আমি দেখতে পাই একটু আগে একজন অন্যজনকে বলছে আর দেখাচ্ছে, ‘ওই কালো শাল পরা’।
ব্যক্তিগত ভাবে বর্তমান সময়ে সিটি নির্বাচন নিয়ে আমি মনে করি, এইমুহূর্তে ক্ষমতায় যারা আছেন তাদের দলের প্রার্থীরাই মেয়র হওয়া দরকার। কারণ, উনাদের দলের মেয়র নির্বাচিত হলে ঢাকা সিটিতে ভালো কাজ হবে, দ্রুত কাজ হবে, উন্নয়ন হবে। আমার কাছে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। যারা ক্ষমতায় নেই তাদের দলের প্রার্থী মেয়র হলে সিটির উন্নয়ন ঠিক ভাবে হবে না। ক্ষমতায় যারা আছেন তারা সব সময় সব দাবী দাওয়া মেনে নিবেন না। ঠিক সময় বিল পাশ করবেন না। অন্য দলের মেয়র কাজ করতে যাবে ক্ষমতার দাপট সেখানে বাধা দিবে। আমরা এখন কথায় কথায় বিগত মেয়র মরহুম আনিসুল হকের কথা বলি, উদাহরণ দিই। উনি অল্পদিনে যা কাজ করেছেন, তিনি বাঙালি জাতির চোখ খুলে দিয়েছেন। উনার মতো সৎ, সাহসী, দাপটি আর ক্ষমতার সহযোগিতাই এই উন্নতির মূল কাজ।
সরকার দলের প্রার্থী জয় লাভ করুক তা চাওয়ার আরেকটা কারণ হল, ২০০৮ সালের শেষ থেকে একটি রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আছে। ক্ষমতা মানেই আগে নিজের পকেট ভরা, ব্যক্তিগত ভাবে আমি নিজেও রাজনীতি করলে হয়তো তাই করতাম। এটা নিয়ম নয় এটাই রীতি হয়ে গেছে। বিগত ১১ বছর ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতাসীন দিলের পকেট এখন পুরাই ভরা। ওই দলের প্রার্থীরা জিতলে মেয়র হলে নিজের পকেটে আর কতই ঢুকাবে, তারা জনগনের জন্যে কাজ করবে। অন্য দলের প্রার্থী জিতলে তারা আগে নিজেদের পকেট ভরবে। নিজেদের পকেট ভরে কিছু থাকলে জনগনের জন্যে ব্যায় করবে। তাই আমি চাই ক্ষমতায় যারা আছে তাদের দলের প্রার্থীই জয়লাভ করুক।
কেন্দ্রে ভোটার আসে দুই একজন করে। এই কেন্দ্রে প্রায় পনেরোটি বুথে ভোট নেয়া হচ্ছে। বুথের বাইরে কেন্দ্রের খোলা জায়গায় প্রায় সবাই দলীয় কর্মীরা। এটা বুঝতে জ্ঞ্যানের দরকার ছিল না, উনাদের গলায় ঝুলিয়ে রাখা আইডি কার্ডই জানিয়ে দিচ্ছে উনাদের পরিচয়। তবে আমার ভালো লাগতো যদি এই খোলা জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীকে দেখতে পেতাম। কোন মাঠেই একদল খেলোয়ার কেউই দেখতে চায় না। গোল একটা হয়েও কেউ জিতে আবার সাতটা গোল দিয়েও কেউ হারে যদি অন্যদল আটটি গোল করে ফেলে। গেইটের কাছাকাছি একটা চেয়ার পেয়ে বসি, তখন কেন্দ্রের ভেতরে দুপুরের খাওয়ার আয়োজন চলছে। নেতা কর্মীরা বক্স ভরা খাবার আর পানির বোতল নিয়ে নিয়ে বসেছেন, খাচ্ছেন সেলফি তুলছেন। দু একজন করে ভোটার আসছে ভোট দিচ্ছে চলে যাচ্ছে। আমার পাশে একটা বেঞ্চিতে তিনজন মা বসে ছিলেন। তিনজনের ছেলেই দলের জুনিয়ার কর্মী, এটা বুঝতে পারার কারণ জুনিয়ার কর্মীরা এসে উনাদের সাথে কথা বলে। আমি খুবই নিরিহ প্রজাতির প্রাণী হয়ে বসে আছি।
যারা ভোট দিয়ে বের হচ্ছেন তাদের সাথে দু একটা কথা বলি। নতুন ভোটারদের অনুভূতি জিজ্ঞেস করি। কেউ কেউ ডিজিটাল ভোটের পক্ষে আবার কেউ কেউ বলেন আগের এনালগ ভোটের কথা। সত্যি বলছি কেউ ভোট দেয়া নিয়ে কোন অভিযোগ করেন নি। ঘড়িতে তখন বেলা প্রাত তিনটা। আমি যে বাড়িতে ভোটার হয়েছিলাম সেই বাড়িতে ভাড়া থাকতো লিজারা। লিজার আম্মু এসেছে ভোট দিতে। সাথে লিজার ভাই অয়ন। অয়ন এবার নতুন ভোটার। মায়ের ভোট দেয়া হলে সে যাবে নিজের ভোট দিতে। লিজার আম্মুকে সোজা আমার ভোটের বুথ দেখিয়ে দিয়ে বলি, ‘আমরা ওই রুমেই। তুমি যাও দিয়ে আসো’। লিজার আম্মু যে টোকেন হাতে নিয়ে এসেছে সেখানে ওর রুম অন্যটা লেখা। দুই রুম ঘুরে পরে আমার দেখানো রুমেই গিয়ে সে ভোট দেয়। বের হয়ে এসে একটু অভিযোগই করে, ওর সাথে পর্দার আড়ালের রুমে অন্যরা গিয়েছে। ভোটার সুইচ টিপবে অথচ সাথে যারা গেছে তারা সুইচ টিপতে চায়। এক পর্যায়ে লিজার আম্মু তাদের বের করে দিয়ে নিজেই ভোট দেন। লিজার আম্মু ভোট দিয়ে বের হয়ে আসার সময় সহকারী পিজাইডিং অফিসার বললেন,’আপনি খুবই ভাগ্যবতী’।  কিন্তু কেনো কথাটা বলেছেন তা লিজার আম্মু জানেন না।
আমি গেইটের পাশেই বসা, তিনজন লোক এলেন এই কেন্দ্রে। আমার সামনেই দাঁড়ানো। নিজেরা নিজেরা কথা বলছেন, কথা শুনেই বুঝি উনারা কোন দল সমর্থন করেন। আমি উনাদের কথা শুনি কিছুই বলিনা। কথা বললেই আমাকে কোননা কোন দলের ধরেই নিবে। যদিও আমি কোন দলকেই সেই ভাবে সমর্থন করিনা, দেশের নাগরিক হিসাবে ভোট দিই, ভোট আমার নাগরিক অধিকার। সমস্যা একটাই দল না করলেও আপনাকে দলের লোক বানিয়েই ছাড়বে এই দেশ। প্রথম ফেইসবুকে আসার পর সবাই যখন দেখলো আমি হেজাব পরি, কয়েকজন সরাসরিই জিজ্ঞেস করেছে, ‘আপনি কি জামাত বা শিবির করেন’। আমি কথা শুনে হাসি। পত্রিকায় লেখা নিয়েও অনেকের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দু কি তিনটা পত্রিকা ছাড়া আমি সব পত্রিকায় লিখেছি, এখনও লিখছি। আর আঞ্চলিক পত্রিকা ম্যাগাজিন তো আছেই। এই পত্রিকায় লেখা দেখলে বলে, আপনি কি এই দল করেন? অন্য পত্রিকায় লেখা দেখলে বলে, আপনি কি ওই দল করেন?
মানে হল আমাকে দল করতেই হবে, না করলে জোর করে হলেও দলে নাম লিখিয়েই ছাড়বে। নির্বাচনের আগের দিন একটা পারিবারিক আলোচনায় বসি আমরা কয়েকজন। উঠে আসে নিজের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির কথাগুলো। প্রতিটা ব্যক্তি যেমন আলাদা ওদের মতাদর্শ ও আলাদা, তাই বলে কেউ কাউকে জোর করতে পারেনা এইসব বিষয়ে। আমার খুব কাছের একজন ও ভোট কেন্দ্রে ডিউটি দিয়েছেন পোলিং অফিসার হিসাবে। উনি এসে সুন্দর নির্বাচন হয়েছে জানিয়েছেন। ভোট গনণার পর টিভি নিউজে বলছে ৩০% ভোটার ভোট দিয়েছেন। বিগত কোন এক সময়ে ৮০% ভোটার ভোট দিয়েছেন তা জানতে পারি নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার এর মুখেই।
গত বুধবার (২২ জানুয়ারি, ২০২০) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বৈঠকে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘ইভিএমে ৫০ শতাংশ ভোট না পড়লে আবার ব্যালটে ফেরা উচিত’। বৈঠকে ইসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মাহবুব তালুকদার জানান, ‘চট্টগ্রাম-৮ আসনের সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে সবগুলো কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যালট পেপারে যে ২৯৪টি আসনে ভোট হয়েছে, ভোটের হার যেখানে ছিল শতকরা ৮০ ভাগ, সেখানে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে এমন কেন্দ্রে ২৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম ভোট পড়েছে। এর কারণ ইভিএম নিয়ে ভোটারদের মনে ভীতি আছে।’–(তথ্যসূত্রঃ টাইম নিউজ বিডি, ২২ জানুয়ারি, ২০২০)
ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র মাত্র ১৪ দশমিক ৮৪ শতাংশের সমর্থন পেয়ে অন্যদিকে  দক্ষিণ সিটি মেয়র ১৭ দশমিক ৩০ শতাংশের সমর্থন পেয়ে মেয়রের দায়িত্ব নিচ্ছেন। ভোট পড়ার হার উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯ শতাংশ। উত্তরে মোট ভোটার ৩০ লাখ ১২ হাজার ৫০৯ জন। ভোট দিয়েছেন ৭ লাখ ৬২ হাজার ১৮৮ জন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আতিকুল ইসলাম ৪ লাখ ৪৭ হাজার ২১১ ভোট পেয়েছেন। দক্ষিণে মোট ভোটার ২৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৫৯ জন। ভোট পড়েছে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৫০টি। ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৯৫ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস।–(তথ্যসূত্রঃ ৩ ফেব্রুয়ারি ; দৈনিক প্রথম আলো)
তখন ভাবনায় পড়ি, যদি ৮০%/৯০% ভোটার ভোট দিতে আসতো, ভোট দিতো তাহলে কেমন হতো ফলাফল। আচ্ছা সেই ফলাফল কি সবাই মেনে নিতো। নাকি ঘোষিত হরতালের মতো হরতাল ডাকা হতো হেরে যাওয়া দলের পক্ষ থেকে। ভোটকেন্দ্র ঘুরে উপস্থিতির হার নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘নির্বাচন ভালো হয়েছে৷ পার্সেন্টেজ আমি জানি না৷ পার্সেন্টেজ বোধ হয় ৩০ এর নিচে থাকবে; এর বেশি যাবে না আমার মনে হয়”
বাংলাদেশে ডয়চে ভেলের কনটেন্ট পার্টনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানিয়েছে, বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ, স্বল্প ভোটার উপস্থিতি এবং আঙুলের ছাপ না মেলার ঘটনা ঘটলেও ‘অনেকটা শান্তিপূর্ণভাবে’ শেষ হয়েছে নির্বাচন৷ ঢাকার এই ভোটে একজনের ভোট আরেকজন দিতে পারেনি, এজেন্ট বের করে দেওয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগও তিনি পাননি৷ (তথ্যসূত্রঃ ১ ফেব্রুয়ারি; লাইভ টিভি বাংলাদেশ)
খুব আক্ষেপ নিয়েই বাসায় ফিরলাম। নির্বাচন একটা আনন্দের বিষয়, নাগরিক হিসাবে সবার। কিন্তু সেই আনন্দ ছিল না। ফলাফলে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই জিতেছে, যা ব্যক্তিগত ভাবে আমিও চেয়েছিলাম। তবে আনন্দ ও পেয়েছি যখন টিভির পর্দায় দেখেছি বিরোধী দলের প্রার্থীরা উনাদের অর্ধেকের মতো ভোট পেয়েছেন। আরো আনন্দ পেতাম যদি মাত্র হাজার খানেক ভোটে ক্ষমতাসীনরা জিততো। ৩০% এর কম ভোট পড়েছে দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণতান্ত্রিক দেশে ৩০% এর কম ভোট পড়া আশংকার বিষয়। ভোটাররা কেন ভোট দিতে আসেন নি তা রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিদের খুঁটিয়ে বের করতে হবে। নইলে এর ভবিষ্যৎ ভাল হবে না।
কেউ কেউ বলেন ইভিএমে ভোট দিতে ভোটাররা ভয় পাচ্ছে তাই ভোট দিতে আসেনি। এটার সাথে ব্যক্তিগত ভাবে আমি আরো কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছি। কারো কারো মতে, ‘ভোট দিলেও ক্ষমতাসীনদের প্রার্থী জিতবে, ভোট না দিলেও ক্ষমতাসীনদের প্রার্থী জিতবে’। কারো কারো মনে ভয় ছিলো কেন্দ্রে গেলে হয়তো নিজেদের ভোট নিজে দিতেই পারবেন না। কারো কারো ভাবনা ছিলো, যাকে ভোট দিতে চান তাকে হয়তো দিতে পারবেন না তাই ভোট দিতে যান নি। আরেকটা বিশেষ কারণ ছিল, ভোটারের স্থান পরিবর্তন। ঢাকা শহরে ৮৫ ভাগ মানুষই ভাড়া থাকেন। বারবার বাসা বদলের কারণে নিজেদের ঠিকানা পরিবর্তন হয়। ভোটের দিন যানবাহন বন্ধ থাকায় তারা ভোট দিতে যেতে পারেন নি। মিরপুরে বসবাস করেন এক আপা জানান উনি পুরানো ঢাকার ভোটার, তিনবছর আগে তিনি মিরপুরে চলে আসেন। এখন বাস চলে না, কি করে তিনি মিরপুর থেকে পুরানো ঢাকায় যাবেন ভোট দিতে।
নির্বাচন হোক আমাদের জন্যে উৎসবের দিন, নির্বাচনের দিন হোক আমাদের সব ভয় ভীতি দূর হবার দিন। যানবাহন বন্ধ করলেই ঘর বন্ধি মানুষ, নিজের মূল্যবান ভোট দিতে হলে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো থাকা জরুরি। স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি, স্বপ্ন বিলাসী বলে বন্ধুরা। আমি আজো স্বপ্ন দেখি, ঈদের মতো পরের দিন ভোট দিতে যাব বলে রাত জেগে রান্না করবো, আপনজনদের দাওয়াত করবো। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে দল বেধে ভোট কেন্দ্রে যাবো, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নিজের মূল্যবান ভোট দিয়ে বাসায় ফিরবো। আড্ডায় মেতে উঠবো, দিনের শেষে ফলাফলের অপেক্ষায় টিভির সামনে বসবো ফ্লাক্স ভরা চা নিয়ে, প্যাকেট ভরা বাদাম নিয়ে। একটা আনন্দময় দিন পার করবো। স্বপ্ন দেখতে কার না ভালো লাগে, স্বপ্ন আমাদের দেখতেই হবে, সে ভাবে কাজও করতে হবে নইলে ৩০% এর উপস্থিতি ৮০% এ আসবে কি করে?
লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।
rbabygolpo710@gmail.com
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কাজী জুবেরী মোস্তাক’র কবিতা ‘লাশঘর’

লাশঘর -কাজী জুবেরী মোস্তাক  এই পৃথিবীটা যেন আজ এক লাশঘর মরছে মানুষ ...