সায়ীদ স্যারকে শাড়ি নিয়ে দুটো কথা

নূর কামরুন নাহার :: শাড়ি নিয়ে সায়ীদ স্যারের লেখা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বেশ কিছু লেখা পড়লাম। ভেবেছিলাম কিছু লিখবো না কিন্তু পরে মনে হলো না দু একাট কথা বোধহয় লেখা প্রয়োজন। প্রথমত যেটি আমার মনে হয়েছে পুরো লেখাটাতেই ঢাক ঢাক গুরু গুরু ভাব। তিনি যা বলতে চেয়েছেন বা লিখতে চেয়েছেন তা যেন পুরো খুলে লিখেননি। তাই লেখাটা আমার কাছে হোচট খাওয়া সামঞ্জস্যহীন ও সমন্বয়হীন লেখা মনে হয়েছে।

নারীর শরীরে শাড়ি কিভাবে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে, বাঙালি নারীকে শাড়ি কতো মোহনীয় আর কমনীয় করে তোলো সুন্দর সুন্দর শব্দ আর চাতুর্যপূর্ণ ভাষায় সেটিই তিনি বলতে চেয়েছেন এমন একটি ভান পুরো লেখাটা জুড়ে থাকলেও আদতে পুরো লেখাটাই যৌনতা আর নারী শরীরকে ঘিরে উগদ্র কামনার দুগন্ধ পূর্ণ। তার মতে- একটা মেয়ের উচ্চতা অন্তত ৫ ফুট ৪–এর কম হলে তার শরীরে নারীজনিত গীতিময় ভঙ্গি পুরোপুরি ফুটে ওঠে না | এব কম উচ্চতার কম হলে ‘ললিত–মধুর ও দীর্ঘাঙ্গী নারীর কমনীয় শরীর নিয়ে ফুটে ওঠা কঠিন’ এছাড়া বাঙালি নারীর শরীরের কিছু দুবর্লতা রয়েছে এবং তার শারীরিক গঠন ত্রুটিপূর্ণ যা নাকি নাকি শাড়িতে ঢেকে শরীরকে অনেক বেশি যৌনাবেদনময়ী করে উপস্থাপন করা যায় শাড়িতে। তার মতে- ‘তাদের শরীরের অসম অংশগুলোকে লুকিয়ে ও সুষম অংশগুলোকে বিবৃত করে শাড়ি এই দুর্লভ কাজটি করে’।

কথা হচ্ছে যদি বাঙালি নারীর শারীরিক গঠনে দুর্বলতা থাকেও তাকে কেন ঢাকতেই হবে? নারীকে কেন আবেদনময়ী হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতেই হবে? নারীর কি শরীরটাই সব? নারীর কি সমাজে আর কোনো ভূমিকা নেই। তাকে আবেদনময়ী হয়ে নিজেকে উপস্থাপন করতেই হবে? সায়ীদ স্যার আপনি যতই নারীকে এভাবে ভোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করুন না কেন, সভ্যতা যে নারী-পুরুষ উভয়ের দান তা অস্বীকার করতে পারবেন না। নারীর ভূমিকা অনেক ব্যাপক ও বিশাল, তার কাজ শুধু নিজেকে আবেদনময়ী করা নয়।

সায়ীদ স্যারের মতে- বাঙালি নারীকে জিন্স, এবং অনান্য পাশ্চাত্য পোশাকে সেভাবে আবেদনময়ী মনে হয় না। ঐ পোশাকগুলো তাদেরকে পুরুষের চোখে লোভনীয় করে তোলো না। তাই আবেদনময়ী হবার জন্য বাঙালি নারীকে শাড়ি পরতে হবে। শাড়ি ঝেটিয়ে বিদায় করা ঠিক হয়নি। কি আশ্চর্য অভিব্যক্তি ! কসমোপলিটান সংস্কৃতির এ সময়ে, ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এ সময়ে তিনি পোশাক নির্ধারণ করে দিচ্ছেন তাও আবার শুধুই নারীর! নারীকে আবার এ শাড়ি পরতে হবে তার শারীরিক গড়নের অসমতা ঢাকার জন্য, পুরুষের চোখে যেন মোহময় আর কামবতী হয়ে ওঠতে পারে যাতে ‘সৌন্দর্যের লালসা’ যাতে বাদ না যায়।

অথাৎ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বাঙালির ঐতিহ্য শাড়ি ম্লান হয়ে যাচ্ছে তাতে তিনি চিন্তিত নন বরং শাড়ির মতো অন্য পোশাকগুলো নারী দেহের খুঁত ঢাকতে পারে না, শাড়িতে নারী যাদুকরী আবেদনময়ী হয়ে উঠে সেজন্য শাড়ি না পরাতে এবং সেজন্য শাড়ি ঝেটিয়ে বিদায় করাটা ঠিক হয়নি বলে তিনি খুব দুঃখিত পুরো লেখাটাতেই নানাভাবেই নারীর শরীরকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেখানে নারীর অস্তিত্বই হচ্ছে তার দেহ। নারী আর কিছুই নয় একটা মাংসপিন্ড। আর এই মাংসের দলাটাই নারী। তাই আর যাই কিছুই হোক সে যত মেধাবী হোক অথবা যত বড় পদেই সে থাকুন না কেন তার পরিচয় সে একটা মাংসের দলা আর সেই মাংসদলাকে উপভোগ্য করা রাখাই তার প্রধান ও একমাত্র কাজ।

নারীকে এই শরীর সর্বস্ব ভাবার ক্ষেত্রে কোনো শ্রেণি, গ্রোত্র, শিক্ষিত আর অশিক্ষিত নেই এখানে সকলের ভাবনাই সমরৈখিক। সেখানে অতি শিক্ষিত ডক্টরেট, সমাজের উঁচু তলার মানুষ থেকে শুরু করে ঠেলার মজুরের মধ্যেও একই কামনার দৃষ্টি, একই ভোতা ভাবনা আর একই আদিমতা।এভাবে নারীকে চিত্রিত করায় এবং এভাবে নারী দেহকে প্রধান করে তোলার ভেতরে রয়েছে হীন উদ্দেশ্য ও স্বার্থকামিতা। যা দ্বারা পুরুষ খুব সহজেই লুটে নেয় তার স্বার্থ । নারীকে দেহ সর্বস্ব করে যেমন অস্বীকার করা হয় তার মেধা, শ্রম ও অবদানকে। তেমনি দেহের পবিত্রতা আর সতীত্বের দোহাই দিয়ে খুব দ্রুতই নারীকে ছুঁড়ে ফেলা দেয়া যায় আস্তাকুড়েঁ।

আর নারী দেহের এই প্রাধান্য ও দেহ পুজাকে পুঁজি করে পুজিবাদী বিশ্ব লুটে নেয় পুঁজি। নারী হয়ে পড়ে পুরোই পণ্য ও পুঁজিবাদী বাজারের শিকারে। তাই নারীর মেধাকে ও যোগ্যতাকে আড়াল করার জন্য পুরুষের কাছে বড় অস্ত্র হচ্ছে নারীদেহ। আর এভাবেই নারী দেহ বিষয়ক ভাবনায় জড়িয়ে আছে পুঁজি, রাজনীতি, অর্থনীতি আর পুরুষের আধিপত্যবাদ। সায়ীদ স্যারের লেখার পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে নারী দেহ নিয়ে সেই অর্থনীতি, রাজনীতি পুরুষ-আধিপত্য, পুরুষের লালসা আর কৌশলের সেই আদি খেলা।

অধ্যাপক সায়ীদ স্যার আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর। আলোকিত মানুষ গড়ার দায়িত্ব তিনি নিজ হাতে নিয়েছেন। তার কাছে নারী দেহ সর্বস্ব এমন ভাবনায় অবশ্যই আমরা ব্যথিত হই এবং সেটা সত্যি আমাদের দূভাগ্য। কিন্তু এটাই হয়তো সত্য যে অনেক আলোকের মুখোস পরে থাকলেও চিন্তার মৌলিক জায়গায় হয়তো তিনি এভাবেই চিন্তা করেন। তাই অনেক মোলায়েম শব্দের শিশিরে ভেজানো তার কথার ভেতরেও আমরা দেখি সেই কামনার লেলিহান শিখা।

 

 

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কবি

 

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কামাল আহমেদের লিরিক্যাল মিউজিক ভিডিও প্রকাশিত

স্টাফ রিপোর্টার :: কামাল আহমেদের লিরিক্যাল মিউজিক ভিডিও “পলকে হেসে চলে যাও” ...