সাহানা খানম শিমু
সাহানা খানম শিমু :: ওই হারামজাদী, নাচনেওয়ালী,বদবেটির দল কতোবার কইলাম ঘর থন বাইর হবি না। সারাদিন ঘুইরা ঘুইরা খালি রঙ তামশা, নাচন কুন্দন। ঘরে তোমগে মন টিকে না, না! ঢোক, বদবেটিরা ঘরে ঢোক, হারামজাদীরা ঢোক ঘরে।
দশ বারো জন জোয়ান ছেলে, হাতে সবার বড় লাঠি। লাঠি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে পিঠে, হাতে এবং গায়ের অন্যান্য অংশে সপাং সপাং। মুখে অকথ্য গালি আর হুস হুাস শব্দ তুলে ঠেলে ঠুলে ঢুকিয়ে দিলো ছোট গেইটের ভিতরে। তারপরও গালি গালাজ থামছে না,
সরকার পুরা দ্যাশে ছুটি দিছে, সবাইরে ঘরে থাকতে কইছে। কোন মানুষ ঘর থন বাইর হয় না, আর এইগুলা সারাদিন শরির দুলাইয়া ঘুইরা বেরায়। তোরা জানছ না, ‘করোনা’ নামে তগো মতো এক বদ বিমার সারা পিরথীবি কাঁপাইয়া এখন আইছে আমগো দ্যাশে। শরীলের লগে শরীল লাগলেই এই বিমার ছড়াইবো। সকলরে ঘরের ভিত্রে থাকন লাগব, বাইর হওন যাইব না। সারা দুনিয়া করোনার ভয়ে বেসামাল,আর তগো খালি ফালাফালি।
ঘটনার আকস্মিকতায় কিংক্রতব্যবিমূর আলেয়া,রুপসী,জুঁই,চামেলী,বিউটি,মনি,মুক্তা,রত্নাদের বিশাল দলটি। এতো মার, বকা খেয়েও ওরা চুপ। কান্না করতেও যেন ভুলে গেছে। আবার হুঙ্কার দিয়ে উঠে,
আর একবারও যদি একটারেও বাইর হইতে দেহি তাইলে কিন্তু খবর আছে কইয়া গেলাম। যদি আমার কাছে খবর যায়, ঘর থন এক পাও বাইরে আনছোস্ তাইলে ঠাং ভাইঙ্গা হাতে ধরাইয়া দিমু মনে থাকে য্যান। এইখানে খাড়াইয়া কি রঙ তামশা দেখতাছোস্, যা তোরা সবগুলান বাড়ির ভিতর ঢোক।
হঠাৎ ওদের হুঁশ আসে, হুরমুর করে সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়। বাড়ি কি আর, একটি লম্বা দোচালা টিনের ঘর। মেঝেতে একটার পর একটা বিছানা করা, একেকটা বিছানায় তিন/চার জন করে ঘুমায়। একই রুমে থাকা,খাওয়া,টিভি দেখা, ঘুমানো এমনকি কাপড় বদলানো পর্যন্ত করতে হয়। আর কোথাও যাবার জায়গা নেই ওদের জীবনে।
আলেয়া, রুপসী, বিউটিরা কিছুটা সিনিয়র, বাকিরা বছর দুই এর মতো হয় এখানে এসেছে। মনি,মুক্তা,রত্নারা কাছাকাছি বয়সের। তবে সবচাইতে ছোট রত্না, এগারোর কাছাকাছি বয়স। দলেও এসেছে এ’বছরই। সবসময় আলেয়ার সাথে সাথে থাকে ঘুমায়ও এক বিছানায়। কট কট করে কথা বলে সারাদিন রাত। খালি প্রশ্ন করে করে সকলকে বিরক্ত করে। আলেয়া যেন ওকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দেয়। আলেয়াদের চাইতেও সিনিয়র আছে বেশ ক’জন। সবচেয়ে বয়স্কজন ‘গুরুমা’ সত্তরের ঘরে বয়স। সকলেরই অভিভাবক তিনি। কোকিলা খালা আর ফেরদৌসী খালারও কম বয়স নয়, এই তিনজনে আরেকটা ছোট রুমে থাকেন। বাকি ওরা একুশ জনে এই লম্বা রুমটায় থাকে।
তিন বোনের পর ঘর আলো করে যখন এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়, বাবা মায়ের আনন্দের যেন কোন শেষ নেই, খুব আহলাদ করে নাম রাখেন আনোয়ার। সারাদিন তিন বোনের কোলে কোলেই কাটে ওর সময়। বাবা মায়ের গভীর আদরে বড় হতে থাকে। যখন স্কুলে যাওয়া শুরু হলো, তখন নতুন জামা জুতো ব্যাগ আরো কতো কি কিনে নিয়ে আসলেন বাবা। ছেলে স্কুলে যাবে, বাবা মায়ের হাজারো প্রস্তুতি। তিন বোনের জন্য এমন আয়োজন কখনও হয়নি, তারপরও বোনদের মনে হয়নি বাবা মা আনোয়ারকে বেশি ভালোবাসে। কারন ওরা তিন বোনও যে আনোয়ারকেই বেশি ভালোবাসে। বাবা মা আর তিন বোনের আদর আর ভালোবাসায় বড় হতে থাকে আনোয়ার।
কিন্তু ধীরে ধীরে আনোয়ারের জগত বদলে যেতে শুরু করে, বিকালে বন্ধুদের সাথে খেলতে আর ভালো লাগে না। ফুটবল, ক্রিকেট খেলার চাইতে ঘরে বসে সাঁজতে ইচ্ছে করে। মা বোনদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘরের দরজা লাগিয়ে আপুদের কাছ থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা লিপস্টিক কাজল টিপ দিয়ে সাঁজে। বড়আপুর শাড়ি গায়ে জড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে আর মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে কি যে ভালো লাগে। একসময় মা,বোনদের কাছে ধরা পরে যায়।
তোর কি হয়েছে? সবসময় ঘরের দরজা দিয়ে রাখিস? বন্ধুদের সাথে খেলতে যাস না।
নিজেকে আর সামলাতে পারে না আনোয়ার,মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরে,
মা, ওরা আমারে নিয়ে হাসাহসি করে, আমারে ‘হাফ লেডিস’ বলে ডাকে। আমি আর স্কুলে যাবো না মা।
মা সাহস দেন,
কাঁদিস না বাবা আমার, বোনদের সাথে সাথে বড় হয়েছো, তাই একটু মেয়েলি ভাব আসতে পারে এটা কিছু না। যত তুমি ওদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকবে তত ওরা তোমাকে পেয়ে বসবে। ওদের ভয়ে আর তুমি ঘরে লুকিয়ে থাকবে না।
মা ছেলেকে যতই অভয় বানী শুনাক না কেন, আনোয়ারের পরিবর্তনটা মনের কোণে ভয়ের কালো মেঘ হয়ে শুধু ওরাওরিও করে না, জাকিয়ে বসে মাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে। আঁচল দিয়ে ছেলের অপূর্ণতাকে ঢেকে রাখতে চায়,পারে না। স্বামী, পাড়া প্রতিবেশী কারও কাছেই আর গোপন রাখা যায় না। বাবা রেগে আগুন,
পুরুষ মানুষ কেন ঘর থেকে বের হবে না। যা, বাইরে যা। আর ঘরে বসে থাকবি না। বের হ..
বাবার চিৎকার, চেঁচামেচি হুঙ্কার কোন কাজে আসে না। ছেলে তো নড়ে না। অগত্যা শুরু হলো লাঠি নিয়ে বেদম মার,তাতেও ক্ষতি বৃদ্ধি কিছু হলো না। আনোয়ার কাঁদে আর জড়িয়ে ধরে একবার মাকে, আবার বোনদেরকে। কেউ সাহস করে বাবার মুখের উপর কিছু বলতে পারে না। মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে একসময় বাবা থামেন। এভাবেই প্রতিদিন মার খায় আনোয়ার কিন্তু তারপরও ঘরেই থাকে,বের হবার সাহস হারিয়ে ফেলেছে সে।
ছেলেকে নিয়ে বাবা মায়ের ঝগড়া এখন নিত্যদিনের বিষয়। দিনদিন তা আরো বাড়তেই থাকে।
একদিন বাবার কথায় আনোয়ারের মধ্যে যে অষ্পষ্টতা ছিল তা দূর হয়ে যায়।
আমি কিছু শুনতে চাই না। ওরে বাসা থেকে চলে যেতে বল, ‘হিজড়া’ বাসায় থাকলে কি মেয়ে তিনটারে বিয়ে দিতে পারব? ওই শয়তানরে এখনই বার হয়ে যেতে বলো।
‘হিজড়া’ শব্দটা প্রথম শুনেছিল কয়েকমাস আগে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবার সময়, দোকানে বসা কয়েকটি ছেলের মুখে। মানে বুঝেনি। এরপরও শুনেছে স্কুলে, তখনও মানেটা পরিস্কার হয়নি। সেই সাথে আরেকটা কথা মনে পড়ে যায়, বেশ কয়েকদিন আগে একদল সাঁজগোজ করা শাড়ি পড়া মেয়ে ওকে খুব ডাকছিলো,
আসো, আমাদের সাথে চলে আসো। এখানে কেউ তোমাকে ভালো পায় না, কেউ তোমাকে ভালোবাসে না। পরে পরে আর কতো মার খাবা? তুমি আমাদের দলে আসো। ‘গুরুমা’ আছেন, তিনি আমাদের সকলকে ভালোবাসেন।
সেদিন এদের ডাকে ভয় পেয়ে ঘরের দরজা লাগিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল। আজ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,
‘এখানে আর নয়, অনেক মার খেয়েছি, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য অবহেলা সয়েছি। আমার এই অবস্থার জন্য কি আমি নিজে দায়ী? আমার ভেতরকার পরিবর্তন কি আমি চেয়েছি? আমি নিজেও তো এই পরিবর্তনে কষ্ট পাচ্ছি। আমার কষ্টের কথা আমি কাকে বলব!’
আর দেরি করেনি বের হয়ে পরেছিল, যাবার আগে শুধু মায়ের গলা জড়িয়ে অনেক্ষণ কেঁদেছিল,তারপর বের হয়ে গেছে। মা একবারের জন্য জানতে চায়নি, ‘কোথায় যাবি, কি করে চলবি’। বোনেরা পথ আগলে দাড়িয়ে বলেনি, ‘যাসনে ভাইটি’। বরঞ্চ মনে হলো মা বোনেরা যেন হাফ ছেড়ে বেঁচে গেলো। আর পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেনি আনোয়ার।
প্রথমে সাভারে একটা দলের সাথে ছিল কিছুদিন। শুধু কান্না কাটি করত, মায়ের কথা খুব মনে হতো। ইচ্ছে হতো এক দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে যায়। কিছু খেতে পারত না, মন খারাপ করে থাকত। দলের বোনেরা অনেক বোঝাত তবুও লাভ হতো না। তারপর পুরানো ঢাকায় চলে আসে দলের কয়েকজনের সাথে। ছোট একটা ঘরে দশ/বার জনকে থাকতে হতো। খুবই মানবেতর জীবন মেনে নিতে কষ্ট হতো।
একসময় আনোয়ার নিজেকে বুঝায়-‘এই জীবনের বাইরে তোমার জন্য আর কোন জীবন নেই’ কথাটা মনের মধ্যে গেঁথে নেয়, মনকে শক্ত করে তোলে। মানিয়ে নিয়েছে নিজেকে। এখন দলের বোনদের আপন লাগে। ওদের সাথে গল্প করতে খারাপ লাগে না। সুখ দু:খের কথা শেয়ার করে। প্রথমেই নাম বদলে ফেলা হয়, এখন সে ‘আলেয়া’ আনোয়ার নয়। নামের সাথে সাথে পোষাকেরও পরিবর্তন হয় প্যান্ট শার্ট লুঙ্গির জায়গায় ছায়া, ব্লাউজ শাড়ি পড়া শুরু করে। এরপর শুরু হয় ট্রেনিং, শরির বাঁকিয়ে দু’হাতে তালি মারা,বিশেষ অঙ্গ ভঙ্গি করে কোমর দুলিয়ে নাচ করা, হাতে তালির সাথে গান ধরা। কড়া মেকআপ করা, রুজ লিপস্টিক দিয়ে চকচকে সাজ করা। হাতে,কানে গলায় মন ভরে গয়না পড়া। এখন আর খারাপ লাগে না আলেয়ার। ‘গুরুমা’ খুব ভালো, সবার দায়িত্ব তার। ওরা কখনও একা বের হয় না, একজনের নেতৃত্বে কয়েক সদস্যের একেকটা দল বের হয়। ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করে, অর্থকরি সংগ্রহ করে। দিন শেষে সবার আয় জমা করে। সেটা দিয়েই সবার খরচ মেটে। এখানে কেউ আয় আলাদা করে নেয় না। এটা গুরুমায়ের আদেশ। গুরুমাকে ওরা খুব মান্য করে।
এরপর পুরানো ঢাকার থেকে কিছুটা ভেতরের দিকে মোটামুটি ভাবে স্থায়ী একটা বাসা দেয়া হয়। বড় একটা দোচালা টিনের ঘর, আরেকটা ছোট ঘর। রান্না ঘর, গোসলখানা আছে আলাদা করে, দুটো টয়লেট আছ। আগের গুলোর চেয়ে বেশ ভালো ব্যবস্থা। এরকিছুদিন পর একজন মহিলা নেত্রী একটা রঙিন টেলিভিশন কিনে দেন। তখন থেকে ওরা টেলিভিশন দেখে অবসর সময় কাটায়।
টিভি দেখে আলেয়ারাও জানে করোনা নামে একটা রোগ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও এ’রোগের সংক্রমন শুরু হয়েছে। যদি নিয়মমতো না চলা হয়, তবে রোগের প্রকোপ আরও বাড়বে। কারও সাথে হাত মেলানো যাবে না, বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিশ সেকেন্ড সময় নিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুঁতে হবে, বাইরে বের হওয়ার সময় মাস্ক দিয়ে নাক মুখ ঢেকে নিতে হবে। প্রত্যেকের মধ্যে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যেখান সেখানে কফ্ থুতু ফেলা যাবে না। হাঁচি কাশি দেবার সময় নাক মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকতে হবে।
টেলিভিশনে এসব কিছু দেখলেই কি পেটের ক্ষুধা মিটে যাবে! যাবে না। ক্ষুধার কারনে পথে বের হয়েছিল। তাতে কি হল! শুধু শুধু মার খেলো, বকা খেলো, কিন্ত সাহায্য কিছুই পেলো ন।
গুরুমা ফিরলেন দুপুরের কিছু পর। তার হাতও খালি, কোন সাহায্য পায় নাই। তবে পাওয়ার আশ্বাস পেয়েছেন। গুরুমাকে কাছে পেয়ে, তাকে জড়িয়ে ধরে শতধারায় কেঁদে যাচ্ছে আলেয়ারা। সব শুনে গুরুমা জানালেন,
কাইল থেইকা তোরা আর বাইর হইবি না। কোকিলা, ফেরদৌসীরে নিয়া আমি বাইরে যামু। চেয়ে চিন্তে যা পাই তা দিয়াই চলতে হইবো। কম করে খাওয়ার অভ্যাস করো, কম জিনিস ব্যবহারে নিজেকে অভ্যস্ত করো। পরে দেখবা এইটা নিজেরই কাজে লাগবো।
গুরুমা দুই সাথী নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বের হয়ে যান। কিছু না কিছু সাহায্য নিয়ে বাড়ি ফিরেন। মনে হয় বেশি বয়সের কারনে তাদের বের হতে তেমন সমস্যা হয় না, মানুষেরা তাদের দেখলে দৌড়ানী দেয় না। গুরুমা তেমন কিছু বহন করতে পারেন না, তাই তুলনামূলক কিছুটা কম বয়সি দুই জনকে সঙ্গী করে নিয়ে যান। এছাড়া কিছু কিছু এনজিও বাসায় এসে খাবার এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে যায়। গুরুমায়ের কথা মতো জিনিসের পরিমিত ব্যবহার শিখতে শুরু করেছে ওরা ছোটরা। তাই অল্পতেই বেশ চলে যায়, কোন কিছুর অভাব তেমন হয় না। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়, ওদের সময় যেন কাটতেই চায় না, বন্ধ ঘরে দম আটকে আসে। কিছুই করার নাই। আগে প্রতিদিন সাঁজগোজ করে বের হয়ে পড়তো,পাড়া-মহল্লা, হাট- বাজারে ঘুরে ঘুরে নাচ গান করে দিনের আয় তুলে নিয়ে আসত। এখন করার মতো কোন কাজ নাই। মাঝে মাঝে নিজেরাই সাঁজগোজ করে নাচ গান করে সময় কাটায়। তবে ইদানীং ওদের মন ভালো থাকে না করোনার সংবাদে ওরা আতংক গ্রস্থ হয়ে পড়েছে। টেলিভিশন অন করলেই করোনার সংবাদ, আর মৃত্যুর খবর, কফিন বন্দি সারি সারি লাসের ছবি। আলেয়াদের অনেক কষ্ট হয়, কি করবে দম বন্ধ করা পরিবেশে! মনে পরে বাবা মা ভাই বোনদের কথা, তারা এখন কেমন আছে কে জানে!
এক সন্ধ্যায় গুরুমা কোকিলা আর ফেরদৌসী খালার কাঁধে ভর দিয়ে বাড়ি ফিরলেন। শরির খারাপ লাগছে, গায়ে জ্বর, কাশি হচ্ছে,চোখ দুটো লাল টকটকে। আলেয়াদের মধ্যে হুলস্থুল পরে গেলো। জ্বরে মায়ের মাথায় পানি দিতে হবে, জল পট্টি দিতে হবে, আদা চা খেলে কাশিতে আরাম পাবে। মায়ের জন্য নরম করে খাবার তৈরি করতে হবে। এতদিন যেন ওদের হাড়ে হাড়ে জং পরে গিয়েছিল, এখন অনেক কাজ পাওয়া গেলো। সকল প্রস্তুতি শেষে মায়ের ঘরের দরজার সামনে আলেয়ারা সবাই দাড়িয়ে,
শোন্ তোরা কেউ একজনও আমার ঘরের মধ্যে ঢুকবি না, একদমই আসবি না আমার কাছে। দরজার সামনে খাবার দিয়া চইলা যাবি, আমি নিজে নিজে খাইয়া নিব।
ওরা অনেক কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু গুরুমার ধমকে ওদের চুপ থাকতে হলো,
আমি তোদের বার বার কইরা কইতেছি, আমার ঘরে, আমার কাছে আসবি না। আমার কথা বুঝতে তোগো কষ্ট হয়! এখনও জানি না, আমার কি সাধারন জ্বর কাশি, নাকি করোনা হইছে। তাই সাবধানে থাকতে হইবো। টেলিভিশনের সাবধানতা গুলো দেখোস্ নাই! তোরা মন খারাপ করিস না, আমি ভালো হইয়া যাইতে পারি। আরেকটা কথা, আমাদের তো দুইটা টয়লেট আমি বাম পাশেরটা ব্যবহার করুম,তোদের সবাইরে কষ্ট কইরা একটা টয়লেটেই কাজ সারতে হইব, পারবি না।
ওরা কেঁদে কেঁদে সম্মতি দিল।
এখন আলেয়াদের সারাদিনের কাজ, করোনায় কি কি উপসর্গ দেখা দেয়,উপসর্গ বোঝার উপায়,উপসর্গ দেখা গেলে কি করতে হবে, রোগীকে কি কি সেবা শুশ্রষা করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। আলেয়াদের হিসেব মতো গুরুমাকে জরুরীভিত্তিতে, পারলে এখনই করোনা টেষ্ট করাতে হবে, আর পজিটিভ হলে হসপিটালে নিতে হবে। টেলিভিশনে স্ক্রলে দেখানো নাম্বারগুলো কাগজে তুলে নেয়। এখানে ফোন করলেই লোক এসে স্যাম্পল নিয়ে যাবে। কিন্তু গুরুমার অনুমতি ছাড়া ফোন করা যাবে না। জ্বর কাশিতে বরাবর যে সকল ওষুধ দেয়া হতো এখনও তাই দেয়া হচ্ছে গুরুমাকে, তবুও জ্বর কিছুতেই যাচ্ছে না,কাশির বেগ বাড়ছেই। আর দেড়ি করা ঠিক হবে না, আলেয়ারা সকলে গুরুমায়ের দরজার সামনে দাড়িয়ে ওদের ইচ্ছার কথা জানালো, অনেক অনুনয় করে,মিনতি করে গুরুমাকে টেষ্ট করাতে রাজি করাতে পারলো না। তার সাফ জবাব,
তোমরা যত সহজ ভাবছ, তত সহজ না। টেষ্ট করা, সেই মতো চিকিৎসা আমগোর পক্ষে কোনমতেই সম্ভব হইবো না। কেউ যদি জানে, আমার জ্বর কাশি হইছে তাইলে আমাগো বাড়ি ছাড়া করবো, এলাকা ছাড়াও করতে পারে। আমার এই জ্বর কাশির কথা যেন কাক পক্ষীও জানতে না পারে, এই তোদের কয়ে রাখলাম। এভাবেই ওষুধ পথ্য খায়ে দেখি ভালো হই কিনা। আর ডাক্তার দেখানো লাগবো না।
দিন দিন গুরুমার অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু ওরা কেউ কিছুই করতে পারছে না। এটা কোনো মতেই মেনে নিতে পারছে না আলেয়ারা। সবচেয়ে ছোট সদস্য রত্না, যে সারাদিন মুখে কথার তুবরী ছোটায় সেও কেমন চুপসে গেছে। শুধু আলেয়ার আচঁল ধরে বলে ‘মারে ডাক্তারের কাছে নিয়া যাও, ডাক্তার মারে ঠিক কইরা দিবো’। আলেয়ারা ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে, নিজেদের সীমাবদ্ধতা, অপারগতা, ওদেরকে কুরে কুরে খেতে থাকে। এতকাল নিজস্ব শারিরীক অক্ষমতার কারনে মন খারাপ করলেও, এখন ঐসকল কিছুকে তুচ্ছ লাগছে। শুধু গুরুমার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটাই কাম্য সকলের কাছে।
আজ গুরুমায়ের অবস্থা বেশি খারাপ করেছে, সন্ধ্যায় মা সকলকে ডাকলেন। দরজার বাইরে সবাইকে অপেক্ষা করতে বললেন। ঘন ঘন কাশি উঠছে, লম্বা টানে নিশ্বাস নিচ্ছেন। তারপরেও ধীরে ধীরে কথা শুরু করলেন,
আমার সময় শেষ হইয়া আসতেছে, বাতাস থিকা শ্বাস ঠিকমতো নিতে পারতেছি না, খুব কষ্ট হইতেছে। এখন তোমরা আমার কথা খুব মনযোগ দিয়া শুনো, আমার অবস্থা বেশি খারাপ হইলে এমনকি মইরা গেলেও তোরা কেউ আমার কাছে আসবি না, আমারে ছুঁবি না। কথা দে তোরা।
সবই নিশ্চুপ, কারও মুখে কোন কথা নাই। শুধু প্রবল কান্নার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নাই।
প্রচন্ড কাশি আর শ্বাস কষ্টের মধ্যে আবার শুরু করলেন গুরুমা,
মৃত্যুর পরও আমারে তোরা ধরবি না, এই ঘরে ঢুকবি না। শুধু মেম্বার সাবেরে খবর দিবি তারা নিয়মমতো সৎকার করব। আমারে নিয়া গেলে এই ঘর, টয়লেটে ওষুধ ছিটাইয়া ধুইয়া ফেলবি, তাইলে আর সমস্যা হইবো না, তোরা এই ঘরে আবার থাকতে পারবি। আরেকটা কথা কোকিলা তগো নতুন গুরুমা হইবো, তারে সকলে সম্মান করবি, মাইন্য করবি।
আলেয়া মায়ের মুখের উপর কখনও কথা না বললেও, আজ আর চুপ থাকতে পারল না। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
মা, তোমার কথা মতো সকল কাজই আমরা করবো, তয় শেষ বারের মতো তোমার চিকিৎসাটা করাইতে দাও। তোমারে হসপিটালে নিয়া যাই? তুমি শুধু ‘হ্যাঁ’ কও মা, একবার রাজী হও।
কান্না এসে গলা আটকে ধরে, আর কিছুই বলতে পারে না আলেয়া। গুরুমা জোড়ে করে বড় শ্বাস নিয়ে তারপর বলেন,
তোরা একটা জিনিস বুঝস না কেন, এখন এই করোনার সময়ে ‘মানুষরাই’ ঠিকমতো চিকিৎসা পাইতেসে না, আর আমাগো কে দেখব!
সবচেয়ে ছোট সদস্য রত্না কাঁদছে আর চিৎকার করে বলছে,
কেন অরা মানুষ! আমরা মানুষ না! তুমি বইল্লা যাও গুরু মা আমরা মানুষ না! আমরা মানুষ না!
গুরুমার শেষ নিশ্বাসের সাথে রত্নার কথাগুলো ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে চারদিকে ছড়িয়ে পরলেও কোন উত্তর পাওয়া গেলো না।
Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here