ব্রেকিং নিউজ

সাহানা খানম শিমু’র গল্প ‘মানত’

সাহানা খানম শিমু

সাহানা খানম শিমু :: উঠোনে মনিতুরের লাশ। বাড়ি জুড়ে কান্নার রোল। কাঁদছে না শুধু একজন, সবচাইতে কাছের জন, পরম নির্ভরতার জন ‘মা’। ছেলের লাশ উঠোনে পরে রয়েছে। লাশটা বাড়ি পৌছাবার পর এক দৌড়ে উঠোনে ছুটে গিয়েছিল। উত্তেজনায় তার সমস্ত দেহ থর থর কাঁপছিল, চোখদুটো শুকনো মরুভূমি, দুই হাতে মনিতুরের ছোট শরিরটাকে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে দ্রুত ঘরে ফিরে গিয়েছিল। কি যেন হিসেব করল মনে মনে। হিসেবটা ভেতরে ভেতরে আরও আগেই শুরু হয়েছিল। যেদিন বড ছেলে মিফতাউর কাউকে কিছু না বলে হারিয়ে গিয়েছিল সেইদিন। নিজের বুক চিরে হৃদয়টাকে টেনে হিচরে বের করে খুব জানতে ইচ্ছে করছে, মনে যদি সন্দেহ ছিলই তবে ছেলেটার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হল কেন ? নিজেই নিজেকে প্রশ্নে প্রশ্নে ক্ষত বিক্ষত করে তুলছে। কেমন মা তুই ? মৃত্যুর পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পাখির মতো ছোট বাচ্চাটাকে যম দূতের কাছে দিয়ে রাখলি? কত না যন্ত্রণা, কি ভিষন কষ্ট সয়ে সয়ে ছেলেটা নিশেষ হয়ে গেলো ? বুক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রান চেষ্টায় রুহিতন।
.
মিফতাউর ঘর পালানোর আগে কয়েকবারই বাড়ি এসে মাকে জডিয়ে ধরে কান্নাকাটি করে বলেছিল…
মা হামি আর মাদ্রাসায় যাবেক লয়, বাংলা স্কুলেত পড়িবেক।
কান্দুস ক্যা বাপধন, কি হইল ক’ হামাক! ভালো জালাত্ পরলেম দেখি, না কলি মুই জানবেক কেমনি! কও বাপধন কও। ছেলেকে প্রশ্ন করে করে হয়রান রুহিতন। মুখ খুলল ছেলে
.
বড হুজুর হামাক বেশি পেয়ার করে, রাইতে হামাক তার কাছে রাইখে দ্যায়। হামি মাদ্রাসায় আর থাকপার নয়।
বাপধন শোনরে ব্যাটা, তোর বাপে মানত্ করিছু, ছেলে হলি তাক আল্লাহর লাইনে মাদ্রাসায় পড়াবেক। একন তুই যদি না পড়ু তো সে আল্লাহর কাছত মিত্তেবাদী হই যাবেক লয়? তুই লা করিস না ব্যাটা হামার। হুজুর পেয়ার করে, ভালোবাসে। সবাইকত্ তো কাছে রাকে লয়। তোক লিশ্চয়ই ভালো পায়।
তোমাগের পেয়ারের হুজুরের পেয়ার হামার লাগপে লয়। হামি যাবেক লয়।
.
প্রতিবারই বুঝিয়ে শুনিয়ে পাঠিয়ে দেয়। শেষবার বাড়ি আসার পর অনেক কান্নাকাটি করেছে যেতে চায়নি একদমই। সারারাত আদর করে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘুম পারিয়ে ঘুমাতে গেছে রুহিতন। তবে পরেরদিন কাকভোরে ছেলেকে মাদ্রাসায় পৌছে দিতে যেয়ে ওকে আর কোথাও খুঁজে পায়নি। ছেলেটি আর কোনদিনও ফিরে আসেনি।
.
বড ছেলে বাড়ি ছাড়ায় সব স্বপ্ন এখন ছোটটাকে ঘিরে। মাদ্রাসার বড হুজুর একদিন ময়েজকে ডেকে বলল,
তোমার বড পুতে তো অসৎ সংঙ্গে নষ্ট হইয়া বিপথে গেলো, এখন ছোটাটার দিকে খেয়াল রাখতে হইব। তুমি আল্লাহ তালাহর কাছে জবান দিছ, এর বরখেলাপ করন যাইবো না। এ্যারে আল্লাহর পেয়ারের বান্দা বানাইতে হইব। কোরআনে হাফিজ হইতে হইব। তুমি হ্যারে আমার খাস জিম্মায় দিয়া দ্যাও।
জ্বী হুজুর জ্বী, আপনে যেমনত ভালো মনে কইরেন। হামায়ক কোন আপিত্তি লাই।
.
কিছুদিন যেতে না যেতে আবার শুরু হলো ছোট ছেলের কান্নাকাটি। রুহিতনের কাছে মাদ্রাসায় না যাবার আকুতি। মিফতাউর যখন বাড়ি ছাড়া হয় তখন তার বয়স ছিল তের বছর। আর মনিতুর তো দশ বছরের শিশু।
মা হামি আর মাদ্রাসায় পড়বুক লয়। বাংলা স্কুলেত পড়িবেক।
ক্যান তুর আবার কি হইল? ক’ দেকিন
.
হুজুর হামাক তার ঘরত রাকে, হামাক পেয়ার করে, অনেক পেয়ার করে। রাইত ভইরে হামাক পেয়ার করে। হামার কষ্ট লাগে, মারে খুব কষ্ট…
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে মনিতুর। বুকে আকরে ধরে ছেলেটাকে মায়ের বুকে তির তির করে কাঁপতে থাকে শিশু মনিতুর
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি,সন্দেহের কালো মেঘ ঘিরে ফেলে রুহিতনকে, কিছু একটা করতে হবে।
মিফতাউরের ব্যাপারে ময়েজকে বলে দেখেছিলো, লাভ হয়নি কিছু।
তুই বেশি আদর দিয়ে দিয়ে ছাওয়ালগো মাতা খেয়েচিস। কিসের যাবিনা! ছাওয়ালোক্ মাদ্রাসায়ই
যাতি হবি। হামি হুজুরক কতা দিইসি,মোক কতার কুনু দাম নেই লাকি?
রুহিতন আর কথা বলার সাহস পায়নি। অগত্যা ছেলেকেই বুঝানোর চেষ্টা। কিন্তু তাতে ছেলেটা বাড়ি ছাড়া হলো। এবারও প্রথম দিকে কিছু না বললেও পরে খুব অনুনয় করে বলেছিল
.
গ্যান্দা তো মাদ্রাসায় একেবারেই যাবার চাইসে না। কি করি, আল্লাহর কাছত মাপ চাইয়ে বাংলা ইস্কুলেত দিয়া যাবি লয়?
তোর আস্কারা পাইয়ে এতো সাহস হলু, হামি কুনু কতা শুনপার লাই, ওক মাদ্রাসায়ই পইডতে হবিক।
রুহিতন এবারও কোন ফয়সালায় যেতে না পেরে মনিতুরকে…
এইবার যাও বাপ, শেইষবার যাও, হামি যেইভাবে পারি তুমার বাপোক বুজিয়ে তোমাক্ লিয়ে আসপ। তোমাক্ বাংলা ইস্কুলেত ভইরতি কর দিনু। দেখিস বাপ, হামার উপরি ভরসা রাকো বাপে…
অনেক আদর করে বুঝিয়ে শুনিয়ে ছেলেকে বিদায় করল
যাও বাপ যাও। আর তোমাক্ মাদ্রাসায় যাওয়া লাগপি না। দেইকো বাপ, শেইষবারের মতো যাও বাপে।
.
‘হু শেইষবারের মতোই গেইল মোর ছাওয়াল, মোর বুকের ধন। না হামি কাউকো ছারপো না, হামি এইর শেইষ দেইখে লিবো। বিচার হবি, কটিন বিচার হবি। শাইস্তি পাতি হবি’ বির বির করে বলে যায় রুহিতন…
.
ভিতর বাড়ি মহিলা শিশুতে ঠাসাঠাসি ভিড। পুরুষেরা উঠোনে জড হয়েছে। একবার উঠোনের মাটি চাপডে, আবার নিজের বুক চাপডে আহাজারি করেই চলেছে মনিতুরের বাবা ময়েজউদ্দিন
ওহ হামার আল্লাহ গো, মুই কি অপরাধ করিছিনু, হামাক কেন এই হাল করিলু? হামাক দুই ছাওয়াল দেলি তুই, দুই জনোকই হামার কাছ থন নিয়া নিলি ক্যা, ও হামার আল্লাহরে….
.
সকলে সান্তনা দিচ্ছে, কারও সান্তনাতেই মনকে দমাতে পারছে না ময়েজ। ময়েজউদ্দিনের একমাত্র জীবিত মুরুব্বী ছোট চাচা একা ঠিকমতো চলতে পারেন না, লাঠিতে ভর দিয়ে খুডিয়ে খুডিয়ে ময়েজের কাছে এসে জডিয়ে ধরে কাঁদছে আর বিলাপ করছে,
বাপরে সবর কর বাপ, আল্লাহ তুই হামাক দেখলি না? হামাক তুলি নিয়ে এই সোটো একখান গ্যাদা ছাওয়ালকো রাইখি যাতি, ওরে আমার আল্লাহ…
সান্তনা দিচ্ছে কতজনে, ওরে ময়েজ,অল্লাহর উপরে ভরসা রাক, হামাগের মন কইসে,তোর বড ছাওয়াল বেঁইচে আছে। একদিন দেকপিনে ঠিকই বাড়িতে চাইলে আসিছে, এ আমি কয়া দিলেম…
.
কান্না থামে না ময়েজের, কত শখ করে বিয়ে করেছিল পাশের গ্রামের রুহিতনকে। সুন্দর চেহারাতেই মন মজেছিল, এ নিয়ে ভাবী ভাউসরা কতো ঠাট্টা মস্করা করেছে। বিয়ের পরও তাদের ঠাট্টা মস্করা থামেনি, বরং বউ পাগলা বলে খেপাত সবসময়। বিয়ের পর কয়েক বছর গেলো, ছেলে পেলে হচ্ছিলো না রলে মুরুব্বীরা ময়েজকে আবার নিকহা করাতে চেয়েছিল। রাজী হয়নি ময়েজ –
এত অস্তির হসু ক্যা? দু’দন্ড তর সয়নাকো? মোক খানিক দেকপার দে।
ময়েজের ধমকে কিছু সময় চুপ থেকে আবার শুরু করে –
ওরে ময়েজ, তোর বংশে বাত্তি দেবি কে? আর তো বংশ রক্কা হলি না, বিওত মত দে।
নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিল ময়েজ।
.
সাত বছর পর রাতের বিছানায় স্বলাজ ভঙ্গিতে মহাখুশির খবরটা জানাল রুহিতন
হামার মন কইচ্ছে এবার হামগের ছাওয়াল হবি।
ময়েজের আনন্দ দেখে কে, গত সাতটা বছর সাত যুগের মতো ঠেকেছ। উঠতে বসতে কথা শুনতে হত। ওদের কথায় নিকাহতে মত না দেওয়াতে কথায় কথায় আটকুডে বলে ডাকত ময়েজকে। তবুও নিজেকে শক্ত রেখেছ। আল্লাহকে ডেকেছ,তার দরবারে মানত করেছে যদি ছেলে হয় তবে আল্লাহর লাইন মাদ্রাসায় পড়াবে। আল্লাহ ময়েজের ডাক শুনেছে পর পর দুটো ছেলে এরপর মেয়ে, ভরপুর সংসার। খানিক চুপ মেরে আবার ডুকরে কেঁদে উঠে ময়েজ
ওরে হামার আল্লাহ গো, কতো সাধনার ধন গো, কতো সাধনার ধন…..
.
ভিতর বাড়ি শুনসান, মা না কাঁদলে অন্য কে আর কাঁদে। বৌ ঝিরা পড়েছে সমস্যায়।
কি হল দ্যাকোনি চোক্কের সামনি ছাওয়ালডা মরি পড়ি রয়েচে, এর কান্নার কুনো লক্কণই দেকচি না। কি হইলরে তোর? ওক জডিয়ে ধরি একটু কাঁদ গো বইন কাঁদ…
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে হালিমা, রুহিতনের ছোটবেলার সই। কে শোনে কার কথা, শুকনো উদাস দৃষ্টিতে বসে আছে। ভাবী ননদের চেষ্টারও কমতি নেই।
ও হামার ভাবী গো ভাবী,ছোট গেন্দিটাক কোলে তুলি নেও। মনটাক নরম কর, কাঁন্দ দেকিন, বুকটা হাল্কা হবিনি। একটুক বুক চাপডি কান্দ বুইন কতক পর গা ধুইয়ে ছাওয়ালডাক নিয়ে যাবিনি। যাও গো বইন যাও, ছাওয়ালডাক জইডে ধইরে জন্মের আদর কইরে দাও….সারা জীবন মাতা খুটলিও আর দেকতি পাবি না গো…
প্রবল কান্না এসে কথা থামিয়ে দেয়। রুহিতনের কোন ভাবান্তর নেই, যেমনি নির্বাক বসে ছিল তেমনি বসে রইল।
.
বাইর বাড়িতে মাদ্রাসার শিক্ষকসহ অনান্য লোকেরা রয়েছে, একজন মুরুব্বী গোছের লোক ময়েজকে লক্ষ করে বলে,
বেলা বাডতিসে, আর তো দেরি করা ঠিক হবি না। দাফন কাফনের ব্যবস্হা করতি হবি। বাড়ির মেয়ে ছাওয়ালক দেকপার ক’।
ইংগিতটা রুহিতনের উদ্দেশেই। অগত্যা উঠতে হলো ময়েজকে,ভিতর বাড়ি এসে গলা খাকারি দিয়ে নিজের উপস্তিতি জানান দিলো,
শুনিসছিস নি বৌ, তোর ছাওয়ালটোক শেষ দেকা দেকি নে। আর ককোনো কি দেকপার পারবি? আয় বৌ আয়, গোসল দিয়ো মসজিদে নিয়ে যাওয়া লাগপি। এদিক তো আর আসা হবি না…আয় বৌ আয়…
ডুকরে কেঁদে উঠে ময়েজ। ভেতর বাড়ির সবাইকে অবাক করে দিয়ে, দৃঢ পায়ে দরজার কাছে গিয়ে শুকনো গলায় ময়েজকে ডেকে ওদের শোবার ঘরে নিয়ে দরজা আটকে দিল। বাইরে হতবিহব্বল চেয়ে রয়েছে ঘরে থাকা মেয়ে মানুষগুলো।
.
মিফতাউরের বাপ, আইজ আপনার কাছথন একটা জিনিস চাবু। আপনি হামাক না করতি পাইরবেন না, কতা দেন।
আইজ এরহম দিনে তুই ইসব কি কতা কচ্চিস! তোর মাতা টাতা টিক আসে তো?
.
হামার মাতা খুব ভালো টিক আসে। আমি যে কতাটা কবো একন, আপনি তা একটুক ভাইবে দ্যাকেন। আমি দিব্বি করে কচ্চি, মনিতুর অসুকত মরেনি, মাদ্রাসার বড হুজুর আমার মনিতুরের সাতে খারাপ কাম করিছে। হামার গ্যান্দা হামাক সব কয়েসে। হামি সব জানি, মাদ্রাসার লোকেরা ওক মারিসে। বড হুজুরেরা ওক অত্যাচার করি করি মারিসে। হামি থানাত যাবু, কেস করবু ওগের জেল খাটতি হবি। তুমি হামার সাথত আছ কতা দাও মিফতাউরের বাপ। তুমি হামাক নিরাশ করবি নও, কতা দাও। হামার বড গ্যান্দার সাতেও ওরা এমনি খারাপ কাম করিসে, সেই দুক্কে ছাওয়াল হামার বাড়ি ছাড়া হইল। আপনের কাছত্ কতবার কবার ছাইছুনু, আপনি শুনবার চাননি…
এতক্ষন পর রুহিতন দু’চোখ বেয়ে অঝর ধারায় গডিয়ে পরছে নোনা জল…
ময়েজের মধ্যে প্রচন্ড ভাঙাগড়া চলছে। মিফতাউর মনিতুরের মাদ্রাসা আতংক, বড হুজুরের অতি বেশি পেয়ার ভালোবাসা, সারারাত হুজুরের খাস কামরায় রেখে দেয়া। ছেলে দুটোর জন্য রুহিতন কতবার স্বামীর কাছে বলা, মাদ্রাসায় না পড়ানোর কথা। সব সব কিছু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রতিটা বিষয় বিচার বিশ্লেষনে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল।
.
ঘরের দরজা খুলে বেডিয়ে এল এক অন্য ময়েজ। দৌড়ে ছেলের লাশের কাছে গেলো, ডেকে নিল উপস্হিত সকলকে। দুই হাতে মনিতুরের শরিরটা জডিয়ে ধরে উঁচু করে উল্টিয়ে দিয়ে নিজে দেখল এবং অন্যদের দেখালো। মনিতুরের পাছার নিচটায় দলা দলা রক্ত জমাট হয়ে আছে। রক্ত কালচে রঙ নিয়েছে।
দ্যাকো তোমরা দ্যাকো, গত পরসু সন্ধ্যায় বাসাত ঘুরি মাদ্রাসায় গেছে, কাইল একটা দিনের মইদ্যি কি হলু যে হামার গেন্দাটা শেষ হই গেইল। তোমরা দ্যাকো, এইবার তোমরা কও কি কইরে কি হইল। চুপ করি থাকপার নাই।
উপস্হিত লোকেরা সব চুপ, এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে। কারও মুখে কোন কথা নেই।
.
রুহিতন ও ময়েজ খেয়াল করল, লাসের সাথে আসা মাদ্রাসার লোকগুলো কেউ কোথাও নেই। ময়েজ আবার বলা শুরু করল,
মাদ্রাসার হুজুরেরা কইল, ছাওয়াল হামার রক্ত বমি কইরে মারা গেছে। ছাওয়ালের যকন খারাপ অবস্হা তকন আমাগের ডাকলি না ক্যান? আমাগের খবর দিলি না ক্যা? রক্ত বমি করবি মুক দে, তাইলে পাছায় থোক থোক রক্ত আলি কি কইরে? মাদ্রাসার হুজুরেরা হামার মাসুম ছাওয়ালের সাতে খারাপ কাজ করিছে।
.
এ আমি কয়া দিলাম। আমাগের বড ছাওয়ালে তার মায়ের কাছে কয়া সে বাড়ি ছাড়া হইল। ছোটো ছাওয়ালও মার কাছে এইসব বলি বলি কান্দিসে, মাদ্রাসায় যাবার চায়নি। হামি এর শেষ দেকি ছারপো। হামাক কেউ ঠেকাত পারবি না। তোমরা হামাক সাথ দাও ভাইয়েরা। এই মাদ্রাসায় আমাগের ছাওয়াল পাওয়ালরা পড়া নেকা করে। এর ক্ষতি আমরা কেউ চাই না।
.
উপস্হিত সকলে ভিষন উত্তেজিত হয়ে উঠল, মাদ্রাসার হুজুরকে সামনে পেলে এখুনি যেন ঝাপিয়ে পড়ে। মাদ্রাসার কয়েকজন হুজুর এতক্ষণ উপস্হিত লোকদের সাথে মিলে মিশে ছিল, লাসের সৎকারের জন্য নাকি পরিস্হিতি কোন দিকে যায় তা দেখবার জন্য…হঠাৎ সকলের খেয়ালে আসে তাদের একজনও এখানে নেই। ময়েজের ফুপাতো ভাই তমিজ বলে
দেকিছো ঠিকই ভাগিছে, এতকন তো একানেই দাইডে ছিল।
.
মনিতুরের ছোট শরিরটা কোলে তুলে নিয়ে থানার পথে ময়েজ, ওর পেছনে শ’খানেক লোক মিছিল করে স্লোগান দিতে দিতে লাস নিয়ে থানায় আসে, এতো লোকের সমাগম দেখে কিনা থানার এস আই কোন ঝামেলা ছাড়াই মামলা নিল। ময়েজের কাছে শুনে পুরো বর্ননা লিপিবদ্ধ করল।
হাসপাতালেও কোন ঝামেলা ছাড়াই ডাক্তার ময়েজের কথা মন দিয়ে শুনল, জানালো লাস সন্ধ্যায় দিয়ে দিবে, তবে রিপোর্ট দিতে দু’দিন সময় লাগবে। এত সহজে সব কাজ হয়ে যাবে ভাবেনি ময়েজ।
.
আদরের সন্তানকে কবরের গহীন অন্ধকার প্রোকষ্ঠে পরম মমতায় শুইয়ে দিতে দিতে প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হলো ময়েজ
‘ বাজানরে আইজ যারা তোক্ এত কষ্ট যন্ত্রনা দিয়ে মারিসে তাদেরকেও শাস্তির ব্যবস্হা করতিসিরে বাপ’
.
রাত গভীর থেকে গভীর হয়, দু’চোখের পাতা এক করতে পারে না ময়েজ রুহিতন। বিছানায় দু’দিক মুখ করে শুয়ে আছে দু’জন,চোখ বেয়ে গডিয়ে পড়ছে নোনা জল। রাতের গভীরতার সাথে গভীর হয় নিরবতা। অচল,নিস্তব্ধতা পুরো গ্রাম কে গ্রাস করে ফেলে। তবে এর মাঝেও কূটচালের জাল বিস্তৃত করে যায় কেউ কেউ। রাত শেষে সকাল হয়, আলো ফোটে নিয়মমতো, শুধু রুহিতনের অন্ধকার ঘরটি আর আলোকিত হয় না।
.
পরের রাত গভীরে ময়েজের ঘরের দরজায় মৃদু টোকা, উঠোনে সাবধানী পায়ের শব্দ। রহিতুন ময়েজ জেগেই ছিল, কান খাড়া করে দু’জনই। আবার যেন একটু জোডে টোকা পড়ল। নিশ্চিত হয়ে গলা খাকারি দিয়ে উঠে ময়েজ
এত রাইতে কে আসিচ্চে হামার দাওয়াত? কি কতা কও না কেনে?
রুহিতন স্বামীর হাত জড়িয়ে ধরে নিচু গলায় বলে-
খুলবার লাগপি লয়। আপনি কোতাও যাবিন না। হামি দুই ছাওয়ালক্ হারাইছি, একন আপনাক হামি যাতি দিব না।
হামাক না করিস না, খানিক দেকপার দে।
এমন সময় নাসু চেয়ারম্যানের কন্ঠ শোনা গেল
ময়েজ খানিক বাইরে আয় দেকিন
রুহিতনের বন্ধন ছিন্ন করে বেরিয়ে এল ময়েজ,
এত রাইতে আইছেন ক্যা? দিনত আসপার পারলেন না। কি কবার আইছেন কন।
.
চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দিনের সাথে আরও দু’জন লোক ছিল, ওরা ময়েজকে নিয়ে বাঁশ ঝারের কোনায় গেল,
দ্যাক ময়েজ, যে চইলে গ্যাসে তাক্ তো আর ফিরি পাবার লয়। থানা পুলিশ কইরি কার কবে ভালা হইছিল ক্। কতো কতো টাকা বেরিয়ে যাবিনি দেকিশ্। তাছাড়া তাতে গ্রামেরও বদনাম হবি। হামাগের গ্রামে তো ঐ এক্কান মাদ্রাসা রইসে। হামাগের সক্কলের ছাওয়াল পাওয়াল ওকানে নেকাপড়া করতিসে, মাদ্রাসা উঠি গেলি কার ক্ষতি! হামাগের ক্ষতি নাকি ভিনদেশি হুজুরের ক্ষতি ক্ দেকিন?
ময়েজ বুঝতে পারে চেয়ারম্যান সাহেব কি চাচ্ছে,কিন্তু সে দৃঢ তার প্রতিজ্ঞায়
না, চেয়ারম্যান সাব হামাক এ অনুরোদ করবার লয়। হামি মামলা তুলবিক লয়। হামার নাদান ছাওয়ালক্ কতো অত্যাচার করি করি মারি ফালাইল, আর আপনি একন তাগের পক্ক লিয়ে কতা কইবের আইসেন! হামি কি মাদ্রাসা তুলবার কয়েসি, না মাদ্রাসা চলিবে। তবে যারা খারাপ কাম করিসে, যাগের কারনে মনিতুর মরিলো তাগের শাস্তি পাইতে হবি, তাগের কোন ছাড় নাই।
চলল দেনদরবার কথার পিঠে কথা। তবে ময়েজকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরানো গেলো না। কিছু করতে না পারায় চেয়ারম্যান তার সঙ্গী-সাথী নিয়ে বিদায় হলো।
সে রাত আর ঘুম এলো না ময়েজের,মনিতুরকে যারা কষ্ট দিয়ে দিয়ে মেরে ফেলল তারা কি কোন শাস্তি পাবে না? মনে নানান রকম শংকা ভর করছে। কেসটার ভবিষ্যত কি হবে ভাবতে ভাবতেই সকাল হয়ে গেলো।
.
সকাল সকাল থানায় হাজির হলো ময়েজ, মনিতুরের কেইসটার অগ্রগতি জানতে চাইলো এস আই এর কাছে। থানার এস আই নির্বিকার কন্ঠে জানিয়ে দিল-
.
কিসের কেইসের কতা কচ্চো, তোমার ছেইলে তো অসুকত্ মরিসে, রক্ত বমিত্ মরিছে। এই দেকো ডাক্তারের রিপোর্ট, সব লেকা আছে।
ময়েজ নিজেকে আর নিয়ন্ত্রন করতে পারে না, রাগে ফেটে পরে, টেবিল চাপডে চিৎকার করে বলতে থাকে-
ডাক্তার হারামজাদা টাকা খেইয়ে রিপোর্ট উল্টায়ে দিছে, তুমি দারোগাও কম যাও না টাকা খেইয়ে কতা ঘুইরে দিছো। হামার গেন্দাটাক্ বলাৎকার কইরে অত্যাচার করতি করতি মেইরে ফেললো। আর একন কোন মুকে এ এসকল রিপোর্ট দেকাচু? তোমরা সব হারামখোর,বদ নষ্ট লোক। হামি তোমাদের কাছত্ বিছার চেইয়ে ভুল করিছু,নিজেই বড হুজুরক গলা টিপে জন্মের মতো শ্যাস করিতে পারিতাম…কেন তোমাগের কাছত্ আসিলাম। তোরা সব বদ হারামখোর, মিথ্যেবাদী….
.
বডকর্তার নির্দেশে দু’জন কনেষ্টেবল ময়েজকে এলোপাথারি মারতে মারতে থানা থেকে বের করে দেয়। বাইরে ময়েজের গগনবিদারী চিৎকার কান্নাকাটি, আহাজারিতে থানার মানুষগুলোর মনে সারা না দিলেও, থানার দরজা জানালা ইট পাথরে ঠিকই ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুললো।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

৪৩তম সাধারণ বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ

ডেস্ক নিউজ ::বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৪২তম (বিশেষ) বিসিএস এবং ৪৩তম ...