সাহানা খানম শিমু

সাহানা খানম শিমু  :: ট্রেন শ্রীমঙ্গলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা পড়ে গেলো। শেষ হেমন্তের বিকেল, হিমেল ঠান্ডা। ভাড়া গাড়িতে উঠে বসল ওরা দুজন। গাড়ি গ্রামে প্রবেশ করল। হঠাৎই আশেপাশের জায়গাটা মিতিলের খুব পরিচিত মনে হতে থাকে।  বুঝতে পারে না কেন এমন মনে হচ্ছে। মিতিলের ঢাকায় জন্ম সেখানেই বেড়ে উঠা,পড়াশুনা, তারপরই তো বিয়ে। দাদা বাড়ি জামালপুর ছাড়া ঢাকার বাইরে কোথাও কখনও যাওয়া হয় নাই। বিষয়টা ফয়সালের সাথে শেয়ার করতে যেয়ে আবার কি ভেবে চুপ করে থাকে।

পরদিন ফয়সাল অফিস যাবার পরপরই মিতিল বেরিয়ে পরে, গ্রামটা যেন ওকে ডাকছে। এলাকার পর এলাকা সবুজ ধান ক্ষেত, আল পথে হেঁটে যায় সে। খাল,বিল,হাওর নয়ন জুড়ানো দৃশ্য। কিছু দূরে চা বাগান দেখা যায়। কোন পথ কোথায় মিশেছে, কোন পথে নদী, কোন পথে গভীর জংগল সবই মিতিলের জানা।

চেনা পথে হেঁটে,বেরিয়ে কিছু জংলী ফল,ফুল নিয়ে ঘর ফেরে।

শ্রীমঙ্গলে আসার প্রথমদিন থেকেই মিতিলের আচরন ফয়সালের অন্যরকম লেগেছে। ওদের বিয়ের বয়স পাঁচ মাস,এই কয়দিনে মিতিলকে যতটুকু চিনেছিলো সেইটুকুও অচেনা লাগছে। এখন মিতিলকে স্পর্শ করলে ফয়সালের মধ্যে কোন আবেগ তৈরি হয় না, বরঞ্চ মিতিলকে ধাতব, জড় কিছু মনে হয়। কেন এমন হচ্ছে, বোঝে না ফয়সাল।

আজ মিতিল হাঁটতে হাঁটতে গভীর জংগলের কাছে চলে আসে। মনে হয় কতো শত বছর এই পথে কোন লোক চলাচল করেনি। গাছপালা গুলো গায়ে গায়ে লেগে বেড়ে উঠেছে,হাঁটার পথটাও নেই। মিতিল পথ তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছে। বন ধীরে ধীরে আরও ঘন হয়ে উঠছে,তবুও মিতিল থামছে না খুঁজেই চলেছে। নিশি পাওয়া ঘোর লাগা মানুষের মতোন। হঠাৎ দেখা পায় বিশাল আকৃতির জোড়া বট-পাকুরের, ঘন জংগলের মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে চারদিকে শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে। অসংখ্য গুড়ি নেমে কান্ডের মতোন মাটিতে গেড়ে বসেছে। গাছের নিচটায় দিনের বেলাও বেশ অন্ধকার। মিতিল গাছের নিচে বসে পড়ে, হঠাৎ কোথা থেকে যেন গমগম একটা আওয়াজ হতে থাকে। মিতিল চমকায় না, যেন তাই হবার কথা ছিল,যা হচ্ছে।

এসেছ মিতিল! অনেক কষ্ট সয়ে, কতো পথ পারি দিয়ে এসেছ। আমি জানতাম তুমি আসবে। তোমাকে ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ, আধখানা। তোমার মাঝেই আমার পূর্ণতা।

সারা মন প্রাণ দিয়ে শুনছে মিতিল,

তোমার কষ্টের কথা শুনবো বলেই সব বাঁধা পেরিয়ে তোমার কাছে এসেছি, ফুলমতি।

বিয়ের পর স্বামী ভালোই ছিল, শ্বশুর আর শ্বাশুড়ীর মন্ত্রনায় কিছুদিনের মধ্যে সেও পাল্টে গেলো। উঠতে বসতে কথা শোনাতে, মারধর করতো। বিয়ের পাঁচ মাসের মাথায় ওরা আমাকে পিটাতে পিটাতে মেরে এই বট গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে বলে আমি নাকি আত্মহত্যা করেছি।

আমি তোমার সব কথা শুনেছি গ্রামের মানুষের কাছে। তারা তাদের পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে শুনেছে।

বাবার কেসে স্বামী শ্বশুরের ফাঁসি হয়। খুশি হলেও তোমাকে পেয়ে আত্মাটা আজ শান্তিতে ভরে উঠেছে। তোমার স্বামী তোমায় অনেক ভালোবাসে এটাই আমার পরম শান্তি। তুমি আমি তো আলাদা কিছু ছিলাম না কখনও। তুমি ফিরে যাও স্বামীর সাথে সুখে সংসার কর। আমিও তৃপ্ত মনে ফিরে যাই।

একসময়য়ে অতি ধীরে উঠে দাঁড়ায় মিতিল। শরির অবস লাগছে, হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তবুও বাড়ির পথ ধরে। ফয়সাল দেখে আল পথে আলুখালু বেসে,এলোমেলো পায়ে হেঁটে আসছে মিতিল। দৌড়ে মিতিলকে কোলে করে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয়। গায়ে প্রচন্ড জ্বর,আবোল তাবোল বকছে। মাথায় পানি দিয়েও জ্বর নামছে না। ডাক্তার এলো,মিতিলকে দেখে জ্বরের ওষুধ দিয়ে বলল,

ভয়ের কিছু নেই, রোদে ঘোরাঘুরির জন্য হঠাৎ জ্বর এসেছে। দুই একটা ডোজ পড়লেই ঠিক হয়ে যাবে।

যত রাত বাড়ছে মিতিলের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডাক্তারের দেয়া ওষুধ আরেক ডোজ খাইয়ে দিল, কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি নাই। মাথায় পানি ঢালছে, গা স্পন্জ করে দিচ্ছে তবুও জ্বর কমছে না।

ফয়সাল অবাক হয়ে খেয়াল করে,ভোর রাতের দিকে মিতিলের গা স্বাভাবিকের চেয়েও ঠান্ডা,গুটিশুটি শুয়ে কাঁপছে। যতগুলো লেপ কাথা ছিল সব এনে মিতিলের গায়ে দিয়ে নিজে মিতিলকে জাপটে চেপে ধরে রাখে, ক্লান্তিতে একসময় ফয়সাল এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে।

মিতিলের ডাকে ফয়সালের ঘুম ভাঙ্গে,

গরম লাগছে, এতো লেপ কাঁথা কেন!

মিতিল খুব স্বাভাবিক গলায় কথা বলছে। সারারাত এতো জ্বরে ভোগার কোন ক্লান্তি নেই। বিছানা থেকে নেমে বারান্দার চেয়ারে বসল। ফয়সালও বারান্দায় এলো। আলো পুরোপুরি ফুটেনি, সাথে কুয়াশা,মায়াময় পরিবেশ। উপভোগ করার মতো ঠান্ডা। ফয়সাল মিতিলের কাছে বসে ওর হাত দু’টো নিজের হাতে নিল। মিতিল আরও কাছে এসে ফয়সালের বুকে মাথা রাখল। ফয়সাল দু’হাতে মিতিলকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। মিতিল ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বলতে যেয়ে পারলো না, ফয়সালের ভালোবাসায় নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলল।

হঠাৎ ফয়সাল খেয়াল করল, মিতিলকে আর ধাতব জড় লাগছে না। সেই প্রথমদিন মিতিলকে ছুঁয়ে যেভাবে রোমাঞ্চিত হয়েছিল, আজও তেমনি।

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here