ব্রেকিং নিউজ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম: অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হবে

মো: মিজানুর রহমান :: আসলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাবের জন্য দীর্ঘকালীন প্রভাব ভুলে যাই । আজ  এইসব মাধ্যমের  জয়ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, হয়তো কোন এক সময় এরা আমাদের কাছে অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হবে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। আসলে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিই হচ্ছে, আমরা হারিয়ে অনুধাবন করি, থাকতে না। এই যে ধরুন, ঐতিহ্য কে এখন আমরা লালন করছি আমাদের হৃদয়ে। অথচ যাকে এখন লালন করছি তাকেই আমরা আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিলাম আধুনিকতার নাম করে।

আমরা তথ্য প্রবাহের যুগে বাস করছি। আর এই তথ্যের প্রবাহমানতা গতিশীল করেছে প্রযুক্তি। অর্থাৎ প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা অবিরত প্রবাহমান তথ্য পাচ্ছি মুহুর্তের মধ্যে। আগে যে তথ্যগুলো আমাদের বাবা মায়েরা পেতেন সংবাদপত্র, রেডিও কিংবা টেলিভিশনের মাধ্যমে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা সেই তথ্য পাচ্ছি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহায়তায়। ম্যানুয়েল ক্যাসেলএই পরিবর্তনকে ‘ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম থেকে আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে’ রূপান্তর হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে (ভালো-খারাপ উভয়ই দিকেই) । ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনেককেই পুরনো বন্ধুদের ফিরিয়ে দিয়েছে, শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখছে, ব্যবসা বাণিজ্য নতুন মাত্রা দিয়েছে, একাকীত্বের সঙ্গী হিসেবে কাজ করছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরাধী সনাক্তের কাজে ভূমিকা পালন করছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ও আন্দোলনের  সমন্বয়সাধনে  গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করছে । সমাজ, সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন সংস্কৃতি, রাজনীতি, এমন কি অর্থনৈতিক বিনাশে এদের প্রভাবও কম নয়।

এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের দ্বৈত-সত্তার  প্রকাশ করছে। আরভিং গফম্যান  নামের এক সমাজতাত্ত্বিক বলেছেন, মানুষ সামনের পর্যায়ে (Front Stage) ও পিছনের পর্যায়ে (Back Stage) দুই  ধরনের ভূমিকা পালন করে বা আচরণ করে থাকে। গফম্যানের মতে, কেউ  যখন দেখবে যে অন্যরা তাকে দেখছেন তখন সে  “সামনের পর্যায়” আচরণে জড়িত হবে তার ‘পেছনের পর্যায়’ লুকিয়ে। পিছনের পর্যায়  সামনের পর্যায় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কোন দর্শকের উপস্থিতিই পেছনের পর্যায়ে দেখা যায় না। ইন্টারনেটের জগতে বেশিরভাগ মানুষই পিছনের পর্যায়ের ভূমিকায় আবতীর্ন হয়। অর্থাৎ যাকে আমরা সামনাসামনি ভদ্র ছেলেটি ভাবছি, ইন্টারনেটের অন্ধকার জগতে সে খারাপ কিছুতে আসক্ত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা ছেলে অনায়াসে মেয়ে হয়ে যাচ্ছে। এমন ঘটনার কমতি নেই আমাদের চারপাশে, বরং তা বাড়তির দিকেই বলা চলে। অর্থাৎ সমাজ  আমাদের একটা পরিচিতি  দিচ্ছে, আবার সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম আরেকটা পরিচিতি দিচ্ছে, তাই নয় কি?

প্রযুক্তি আমাদের বিষিয়ে তুলছে, আমাদের চর্বিযুক্ত করছে, আমাদের সময় নষ্ট করছে, গুপ্তচরবৃত্তি করছে এবং আমাদের পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত করছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের  শ্রম, সময় ও মেধাকে শোষণ ও অপচয় করছে এবং তাদের সেগুলোর প্রতি আমাদের আসক্ত করে রেখেছে। এগুলো মানুষকে এমন ভাবে আটকে ফেলেছে যে, সেখান থেকে তারা বের হতে পারছেনা। পরিসংখ্যান বলছে, মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন মানুষ সক্রিয়ভাবে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ বা ম্যাসেঞ্জার ব্যবহার করে। এর মধ্যে রয়েছে কেবল ফেসবুক ব্যবহার করা ২.৬ বিলিয়ন মানুষ এবং প্রতিদিন অন্তত একটি পরিষেবা ব্যবহার করে ২.৩ বিলিয়নেরও বেশি লোক। ১.৭৩  বিলিয়ন লোকেরা প্রতিদিন ফেসবুকে লগইন করে এবং এরা  প্রতিদিনের  সক্রিয় ব্যবহারকারী হিসাবে বিবেচিত। ২০২০ সালের  প্রথম তিন মাসে প্রতি ব্যবহারকারী হতে গড় উপার্জন ছিল  ৬.৯৫ ডলার।

তার মানে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারকারী যত বেশি, সামাজিক মাধ্যম গুলোর আয়ও তত বেশি । প্রায় সব ক্ষেত্রেই, ব্যবহারকারীদের হিসেবের খাতা শূন্য। অথচ তারা কামিয়ে নিচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। ব্যবহারকারী, যার দিনের শুরু সামাজিক মাধ্যমের অ্যাপে  ক্লিকের মধ্য দিয়ে এবং গভীর রাত পর্যন্ত লেগে থাকেন যে মাধ্যমে, সেটা তাকে খুব বেশি উপকার করছে বলে মনে হয় না। আগের দিনে যে মানুষেরা রাত জাগত পড়াশুনা করতে, তাদেরই পরবর্তি প্রজন্ম রাত জেগে বন্ধুর সাথে চ্যাট করে সময় পার করছে যাকে সে জানে না, চিনে না (সে নিজেও জানে না যার সাথে কথপোকথন চলছে বাস্তবে তার অস্তিত্ব রয়েছে কি না)। এসব যোগাযোগ মাধ্যম এক ধরনের কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করছে। কৃত্রিম বাস্তবতা বর্তমান প্রজন্মকে নিশ্চিত ভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা সমাজের জন্য মোটেও শুভকর নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আধিক্য আমাদের নানান জটিলতার মধ্যে ফেলেছে। মাধ্যম গুলো আমাদের মানসিক অস্থিরতা ও অশান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা বললেও অনুচিত হবে না এই যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক  কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাব ফেলছে। আমাদের মত দেশে যৌথ পরিবার বা পারিবারিক সম্পর্কের  ভাঙ্গন কিংবা সামাজিক স্থিতিশীলতার (বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান বা ধর্মীয় সম্প্রীতি)  নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোন ভাবে দায় এড়াতে পারে না। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গণতন্ত্রের জন্যও বড় হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমেরিকার নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব কারো অজানা নয়।

তাছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটা গুরুত্বপুর্ণ প্লাটফর্মে পরিণত হয়েছে। নেতাদের কাজের মাধ্যমে জনগণ কতটা উপকৃত হচ্ছে, সেদিকে যতটা না মনোযোগ তার চেয়ে বেশি মনোযোগ কাজের প্রচারের দিকে। অনেকে সামাজিক এসব মাধ্যমকে দলীয় পদ পাওয়ার উপলক্ষ্য হিসেবে নিচ্ছেন এবং সেই লক্ষ্যে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে রাজনৈতিক নেতা ও জনগণের মধ্যে যে পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া, সেটা থাকছে না। যা প্রকৃত নেতৃত্ব তৈরির প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে। দেশে বা সমাজে প্রচলিত কোন প্রবণতার (Trends) বাইরে বা বিপরীত কোন কিছু সামাজিক মাধ্যমে সহজেই ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে এবং তা সহজেই মানুষের দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে। এসবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অনেক তরুণ বিচ্যুতিমূলক আচরণ করছে, যা সামাজিক অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই ভাইরাল সাংস্কৃতিক প্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুমকিই বলাচলে (যদিও এর মাধ্যমে সমাজে কিছু ভালো দিক উঠে আসছে)।

এত কিছুর পরও আমারা এদের প্রসংশা করে যাচ্ছি এবং আমাদের মনে হচ্ছে এই মাধ্যম না থাকলে আমাদের কী হতো? অথচ আমরা হিসাব করি না এসব মাধ্যম আমাদের উপর কিরূপ প্রভাব ফেলছে। আসলে আমরা তাৎক্ষণিক প্রভাবের জন্য দীর্ঘকালীন প্রভাব ভুলে যাই। আজ এইসব মাধ্যমের  জয়ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। হয়তো কোন এক সময় এরা আমাদের কাছে  অভিশাপ হিসেবে পরিগণিত হবে। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। আসলে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তিই হচ্ছে, আমরা হারিয়ে অনুধাবন করি, থাকতে না। এই যে ধরুন, ঐতিহ্য কে এখন আমরা লালন করছি আমাদের হৃদয়ে। অথচ যাকে এখন লালন করছি তাকেই আমরা আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিলাম আধুনিকতার নাম করে।

 

 

 

লেখক: রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ এন্ড সাসটেইনিবিলিটি (আই.ডি.এস.এস), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ।  [email protected]

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

কাব্য বিলাসে মুক্তি পেল ‘মনে আছে জোর’ (ভিডিওসহ)

স্টাফ রিপোর্টার :: কাব্য বিলাস ইউটিউব চ্যানেলে মুক্তি পেল শিশুতোষ গান মনে ...