সামাজিক অবক্ষয়: আমাদের দায়বদ্ধতা

সামাজিক অবক্ষয়: আমাদের দায়বদ্ধতাতাহমিনা শিল্পী ::আমি যা দেখি, তাই-কি তুমি দ্যাখো? কি দ্যাখো?” এক বন্ধু এটা জিজ্ঞেস করত। তারপর বাকি বন্ধুরাও সবাই মিলে তা দেখে নিতাম। ছোটবেলায় আমরা এমন একটি খেলা খেলতাম। জানেনতো দেশ এখন ডিজিটাল! তাই এ খেলাটিরও ডিজিটাল ভার্সন হয়েছে- “আমি যা করি তাই-কি তুমি করো?

হ্যাঁ, আমি বর্তমান অস্থির সময়ের সমাজিক অবক্ষয়ের কথাই বলছি। শিশু ও নারী নির্যাতন সহ ঘটে যাওয়া অপরাধের কোন একটা ঘটনা প্রচারের পরপরই শুরু হয় দেশজুড়ে একই ঘটনার পুণঃরাবৃত্তি। বেশ কিছুদিন আগে সিলেটের শিশু সামিউল রাজনের নির্যাতন ও হত্যার ভিডিও প্রকাশের পর থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গাতে একে একে শিশু নির্যাতন ও হত্যার খবর বেড়েই চলছিল।

কাল খুলনার রাকিব আজ নোয়াখালির আমেনা….এভাবে কমপক্ষে ৮-১০টি শিশু নির্যাতনের খবর পাওয়া গিয়েছিল। এযেন শিশু নির্যাতনের স্বঘোষিত সরব প্রতিযোগিতা। তারও আগে ভারতের দামিনীকে চলন্ত বাসে রেপের খবর প্রচারের পরপরই একই কৌশলে ঢাকায় একটি গারো মেয়েকে মাইক্রোবাসে রেপের পর শুরু হল আমাদের দেশেও উপর্যুপরি গ্যাঙ রেপের ঘটনা।

এবার আবার সিলেটের খাদিজাকে কুপিয়ে নির্যাতনের ঘটনা প্রচারের পর থেকে এই অল্পকদিনের ব্যবধানে ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জসহ দেশে অন্তত চারটে ঘটনা। আরও কত ঘটনা যে অজানা থেকেই যায় সে কেবল ভুক্তোভোগীরাই জানে। জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ, চাঁদাবাজি, গুম, খুন হত্যা কোনটাই এই নিয়মের বাইরে নয়।

কিন্তু কেন ঘটছে এমন ঘটনা? এর প্রতিকার কি? কি এর সমাধান? কোথায় মানবতা? কাকে দায়ী করবো এসব অন্যায়ের জন্য? কেনই বা ছাড়া পেয়ে যায় অপরাধী? কোথায় প্রশাসন? প্রশ্ন করেই চলেছি কিন্তু কোন উত্তর পাচ্ছি না। শিশুকাল হচ্ছে মানুষের জীবনচক্রের প্রথমধাপ। মানুষ ততোদিন-ই ভালো থাকে যতদিন সে শিশু থাকে। তারপর বড় হয়ে উঠার সাথে সাথে পরিবর্তন হতে থাকে। কোন ব্যক্তির নেতিবাচক পরিবর্তনের জন্য বা কারো অমানবিক, অমানুষ হয়ে উঠার পিছনে দায় তার পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রর। ক্রোধ, হিংসা, অপ্রাপ্তি বিভিন্ন বিষয়ে মানুষ জ্ঞানশূণ্য হয়ে মানুষই অনৈতিক, অমানবিক হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু সবাই তা করে না। তার ধর্মীয় অনুভূতি, বিবেক, মনুষ্যত্ব, সমাজ ও পারিবারের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সর্বোপরি আইনের ভয় তাকে বিরত করে। কিন্তু যখন কারো হাতে অঢেল অপক্ষমতা থাকে। আর সে নিশ্চিতভাবে জানে যে তার অন্যায়ের সাথ ও আশ্রয়দাতা আছে এবং বিচার ব্যাবস্থা দলীয়করনের জন্য সে আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে পারবে। তখন সে নির্ভয়ে, নির্দ্বিধায় যে কোন অন্যায় করে। আসলে আমাদের দেশের নোংরা রাজনীতি আর বদ Rule ই বদরুলদের মত অসংখ্য অমানবিক অমানুষ জন্ম ও আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়।

আর সরকারি খতিয়ানে সাধারন জনগন সব প্যারালাইসিস প্যাসেন্টের তালিকাভুক্ত (সব সরকারের আমলেই)। নড়াচড়া নেই, নিথর দেহে মাঝেমাঝে মুখে গো গো শব্দ ছাড়া আর কিছুই করার ক্ষমতা নেই। রাজনৈতিক অহিংসা, ক্ষমতার জবরদখল এসব বন্ধ না হলে নতুন নতুন অপরাধীর জন্ম হতেই থাকবে। আর ম্যাঙ্গো পিপল মোরা উত্তাপহীনভাবে টিনের চশমা পড়ে ওদের অপকর্ম দেখেই যাবো। দরকার কেবল জনগন বান্ধব ও উন্নয়নমুখি রাজনীতি। তবেই প্রকৃতপক্ষে যোগ্য রাষ্ট্রনায়কের হাত ধরে দেশে ফিরবে স্বাভাবিক পরিবেশ।

এ হয়ত সত্যিই অসম্ভব নয়, তবে বাস্তব অবস্থার বিচারে হতাশার জালে আটকে গেছে জাতি। আর তথাকথিত মিডিয়াও বলি হারি। সংবাদ উপস্থাপনে তাদের নিরপেক্ষতার নাম তো নেই-ই উপরন্ত এমনভাবে প্রচার করে যে তাতে করে নেতিবাচক শিক্ষা নিয়ে অপরাধ প্রবনতা বাড়ে। আর কোন ঘটনার ফলোআপ রিপোর্টেররও কোন বালাই নেই। নিজেদের কাটতির জন্য কেবল রসাত্মক ভাবে সংবাদ প্রচার করে। অবশ্যই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি মিডিয়ার দায়বদ্ধতা থেকে সংবাদ সংগ্রহ, তৈরী ও উপস্থাপন করা উচিত। আর সবাগ্রে পরিবারের উচিত সন্তানকে অধিক সচেতনার সাথে সুশিক্ষা প্রদান করা।

ঘটনা ঘটে, আবার প্রতিটি ঘটনার পরিসমাপ্তিও ঘটে…। আলোচনায় ঘটনার বিস্তার ঘটে, আবার বিস্মৃতিও ঘটে স্বল্প সময়ের ব্যাবধানে…!! ফের ঘটে ঘটনার পুণঃরাবৃত্তি……এভাবেই ক্ষণকালের বিরতিতে ঘটে যায় একের পর এক ঘটনা। শুধু জানা হয় না ঘটনার আড়ালের ঘটনা…ঘটেনা ঘটনার সমাধান। ঘটনার আতংকে, ভয়াবহতায় দিন অতিবাহিত করে সাধারন জনগন। এভাবে কত আর……!!…??

সামাজিক এসব অবক্ষয়ের দায়বদ্ধতা কিন্তু আমরাও এড়িয়ে যেতে পারিনা। এই যে অপরাধগুলো আমাদের চোখের সামনে ঘটছে।  আমরা দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাচ্ছি। তার ভিডিও করে পাবলিস করছি। কিন্তু কেউ ভিকটিমকে বাঁচাতে এগিয়ে যাচ্ছি না। এটা মূল্যবোধ ও মানবিকতার অবক্ষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের মানবিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে সংঘবদ্ধ হতে হবে এবং প্রতিবাদ করতে হবে। তারজন্য স্বপ্রোনদিত হয়ে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে নৈতিক মূল্যবোধের বীজ বপন ও তার পরিচর্যা করা একান্ত প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে সরকারের আপনহীন হতক্ষেপের পাশাপাশি আমাদের একাত্মতা একটি সুন্দর, নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য জরুরী।

লেখকের ইমেইলঃ  [email protected]

 

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

রাজস্থানকে হারাল কলকাতা

অনলাইন ডেস্ক : আগে ব্যাট করে ১৭৫ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল কলকাতা। মাভি-নাগারকোটির ...