সানি সরকার

সানি সরকার :: “খুব সহজভাবে বললে কিছুই হয়নি। আরও কিছুটা নেমে যাওয়া যেত।” এক নিঃশ্বাসে কথাটি বলেই চোখ মটকে তাকাল অর্ণা।

“মানে?”

“কী বোকা তুই।”

“অত চালাক হয়ে কাজ নেই। যা বলার সোজাসুজি বল। ভনিতা আমার সহ্য হয় না জানিস ভাল করেই।”

“আর আমার ওটা খুব ভাল আসে, সেটাও খুব ভাল করে জানিস। এবং  সেটা তোকে ঘাড় কাত করেই সহ্য করতে হবে, অগত্যা…”

কথাগুলো বলতে বলতে অর্ণা কিচেনে দিকে উঠে গেল। বেশ জোরে একটু চিৎকার করেই বলল, চায়ে চিনি দেব তো? নাকি ওতেই হবে? এখনও তো মনে হচ্ছে…”

“তুই থামবি এবার?”

“থামতে দিচ্ছিস কই? ল্যাদখোরের মতো হয়ে গেলি হঠাৎ। যেন কোনও জোরই নেই শরীরে।” বলেই নিজের মনে একচোট হেসে নিল। বলল, “ওলা বুক করে দিয়েছি। চিন্তা নেই বাবুর। আবহাওয়া রিপোর্ট বলছে, রাতে আরও জোর বৃষ্টি নামবে। ঝোড়ো হাওয়াও থাকতে পারে। চাইলে চা-টা খেয়েই বেরিয়ে যেতে পারিস। নইলে আবার সেই আগের মতো সারারাত এই ওয়ান বি এইচ কে-র খুপরিতেই কাটাতে হবে। আমার অবশ্য কোনও সমস্যা নেই, তোর থাকলেও থাকতে পারে…”

মেঘের গর্জন শোনা গেল। কাছেই কোথাও বাজ পড়ল বোধধয়। বিকট শব্দ হল। যেন তছনছ হয়ে গেল সব। আমার বুকের ভেতরটা চমকে উঠল। একবার। দু-বার। ছায়ার মতন  একটি মেনি বেড়াল ওর ভেতর এখনও আঁচড় কেটে যাচ্ছে। শব্দ করছে না। কিন্তু গর্জাচ্ছে খুব। গাঢ় হয়ে নেমে যাচ্ছে কোনও এক দিকশূন্যপুরের টিলারগুলির দিকে।

উঁচু নিচু টিলা টিলার চারপাশে কিছু গাছ, কিছু ফুল ফুটে আছে। এই মুহূর্তে কিছুতেই ওদের নামগুলি মনে আসছে না। অথচ মেনি বেড়ালটি ছুটে বেড়াচ্ছে এ-প্রান্ত ও-প্রান্ত… একটা বুনোগন্ধ, অদ্ভূতভাবে গন্ধটা নাকে এসে ধাক্কা দিচ্ছে বারবার। মাতাল করা সেই গন্ধ। অবশ করে দিচ্ছে শরীরটিও। এই এক অন্য পৃথবী, অন্য জীবনের টান। পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ সেখানে হেরে যাওয়া বাঘের মতো। আর সমস্ত সুখ, সমস্ত শান্তি একসঙ্গে বেড়ে ওঠা অব্যক্ত ছবির রঙের প্রলেপ ছড়িয়ে দিয়েছে। তখন এত চেনা আর অসংখ্যবার দেখার পরেও বেড়ালটিকে মনে হচ্ছিল, একে তো আগে কখনও দেখিনি! নাকি এই এখন আরেকবার নতুন করে  ওকে আবিষ্কার করছি? সত্যিই আবিষ্কার করছি? ওঁর ভেতর থেকে ক্রমে বেরিয়ে আসছে একটি নিস্পাপ শিশু, বেণী দোলানো একজন কিশোরী, লাবণ্য চলকে ওঠা একজন অভিমানী তরুণী, আর তারপরই  পরিপূর্ণ একজন নারী…

একটা টানটান হাল্কা গোলাপি চাদরের ভেতর নিজের ভেতরের সমস্ত আড়াল ভেঙে দিচ্ছে কোনওরূপ দ্বিধা ও বাধাহীন। মনে পড়ল কবি কাহলিল জিবরান : ‘Love gives naught but itself and takes naught but from itself. / Love prossesses not nor would it be possessesd; / For Love is sufficient unto love. / When you love should not say, ‘God is in my heart, but rather, ‘I am in the heart of God.’

হঠাৎ একটা শূন্য আরেকটা শূন্যের ভেতর মিশতে মিশতে বাঁধনহীনভাবে নেমে এল, গোলাপি এক গোলকের ভেতর। হ্যাঁ, এই গোলকটা আমার হাতের তালুর মতো চেনা। এই গোলক আমাকে বেঁধে রেখেছে আগুনের মতন  তীব্র শেকল দিয়ে। কিন্তু এত বছরেও কোথাও যেন এক অদৃশ্য দূরত্বরেখা টানা ছিল। তারপর মাঝের চার বছর!  সেই দূরত্ব আরও আরও দূরে,  দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গিয়েছিল ক্রমশ।

বৃষ্টি থামার পর অর্ণার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে বজ্রের আঘাতে চূর্ণ একটা রাস্তায় নেমে আসলাম। রাস্তায় কোথাও কোথাও অনেক গাছ, লাইটপোস্ট ভেঙে পড়ে আছে এলোমেলো। এখন রাতের শহর অনেকটা স্পষ্ট। আমি এই শহরের ভেতর নাক পেতে গন্ধ নেব এবার। ঘরে ফেরার তাড়া নেই। মোবাইল নিস্ক্রিয় করে দিয়েছি অনেকক্ষণ। অর্ণা ট্রাই করবে অনেকবার। হাঁপিয়ে উঠবে।  পাবে না। চিন্তা করবে। করুক। এটা যদি নিষ্ঠুরতা হয়, হোক। এমন নিষ্ঠুরতা আমি ওঁর সঙ্গে যুগ-যুগান্তর ধরে করে যেতে পারি। সেই স্বাধীনতা ও-আমায় দিয়েছে।

এখন শহর কলকাতার আলোছায়ার ভেতর আরও একটি ছায়ার মতো আমি দৌড়ে বেড়াব, বুকের ভেতর সেই অবর্ণণীয় গন্ধটুকু পুরে নিয়ে। তারপর সকালে অফিস যাওয়ার আগে, নির্ঘুম অর্ণার জমে থাকা এস. এম. এস.গুচ্ছ একেরপর এক অভিযোগ, রাগ, ক্ষোভ নিয়ে আছড়ে পড়বে আমার মোবাইলের স্ক্রিনে। অতঃপর আমি একটি রিপ্লাই মেসেজ টাইপ করব, “বোগাস! আমি তো এমনই। ৬ বছর একসঙ্গে থেকেও এটুকু ভুলে গেলি, ননসেন্স!” কিন্তু এটি পাঠাব না। শুধু লিখব, “১১টা থেকে এম ডি-র সঙ্গে মিটিং। সন্ধে সাড়ে ছটায় মেট্রো চ্যানেলের সামনে থাকিস।”

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here