জলাবদ্ধতার কারনে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার তিনটি উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের  তিন শতাধিক গ্রামের প্রায় আট হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধান চাষের এসব জমিতে এখনও পানি জমে থাকায় আমনের পর এবার বোরো চাষ করা নিয়েও আশ -নিরাশার দোলাচলে ভুগছে  সাতক্ষীরার হাজার হাজার কৃষক। ফলে চলতি বোরো মৌসুমে ওই সব এলাকার কৃষক কৃষাণীর কর্ম ব্যস্ততা  একবারেই নেই।

টানা বর্ষন আর কপোতাক্ষ  ও বেতনা নদীর উপচে পড়া পানিতে সাতক্ষীরার তালা, সদর, দেবাহাটা এবং আশাশনি ও কলারোয়া উপজেলার  আংশিক প্লাবিত হয়ে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। ইতিমধ্যে বন্যার পানি কৃষকদের বসতভিটা থেকে নামলেও তালা উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের ১৬০ টি গ্রাম, সদর উপজেলার ৫টি ইউনয়নের ৭৭টি গ্রাম এবং দেবহাটা উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের ৬৮টি গ্রামের অধিকাংশ  এলাকার আবাদি জমিতে এখনও পানি থৈ  থৈ করছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় এসব এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। আর এই জলাবদ্ধতার কারনে এসব এলাকার কৃষকরা তাদের জমিতে আমন চাষ করতে পারেনি। ধীরগতিতে এসব এলাকার পানি নিষ্কাশন হওয়ায় জেলার এই তিনটি উপজেলার প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে এই তিনটি উপজেলায় ৫ হাজার ১৬৫  হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে না বলা  হলেও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী এর পরিমান ৮ হাজার হেক্টরের বেশী বলে কৃষকরা জানিয়েছেন। জেলার সাতটি উপজেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমিতে  বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে বলে কৃষি সমপ্রসারন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে জেলার এই তিনটি উপজেলার জলাবদ্ধ এলাকা থেকে দ্রুত পানি নিষ্কশনের দাবিতে নানা কর্মসূচী পালন করছে  ভুক্তভুগি কৃষকরা। দাবি আদায়ে গঠন করা হয়েছে পৃথক জলাবদ্ধতা নিরসন সংগ্রাম কমিটি। এই সংগ্রাম কমিটির ব্যানারে ইতিমধ্যে পানি নিষ্কাশনের দাবিতে  সদর ও দেবহাটা উপজেলার বানভাসী মানুষ ও কৃষকরা সড়ক অবরোধ কর্মসূচী পালন করেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে ফুসে উঠেছে তালার কৃষকরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের লোকজন জলাবদ্ধ এলাকা থেকে  দ্রুত পানি নিষ্কাশনের আশ্বাস দিলেও বাসত্মবে কোন কাজ হচ্ছে না। আমন মৌসুমে সব হারিয়েও কৃষকরা আশা নিয়ে বুক বেঁধে ছিল ইরি বোরো মৌসুমে ধান ঘরে তুলে ক্ষতি কিছুটা হলেও পুসিয়ে নিবে কিন্তু সে আশাতেও গুড়ি বালি। ইতিমধে  জেলার অন্যান্য এলাকায় কৃষকরা বোরো বীজতলা তৈরীর কাজ শুরু  করেছে। কিন্তু জলাবদ্ধ এসব এলাকার আবাদী জমি এখনো ৩/৪ ফুট  পানির নিচে থাকায় কৃষকরা বোরোর বীজতলা তৈরী করতে পারেনি। ফলে বন্যা পীড়িত এলাকার অধিকাংশ দরিদ্র কৃষকরা এবার তাদের ঘরে বোরো ধান ও তুলতে পারছে না।

সাতক্ষীরা পশ্চিমের জলাবদ্ধতা দুরীকরণ সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক নুরুল ইসলাম বলেন, স্মরনকালের ভয়াবহ বন্যায় ৪ মাস পানি বন্দি থাকার পর আশ্রয় কেন্দ্র  থেকে  বানভাসীরা ভিটায় ফিরে ধ্বংস স্‌ত্তপের উপর বসবাস করছে। বন্যার ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারনে সাতক্ষীরা সদর  উপজেলার পশ্চিমে ৫টি ইউনিয়নের ৬৮টি গ্রামের ১০ হাজার কৃষক আমন ফসল হারিয়েছেন। এখনও বন্যার পানি নামেনি। বিলগুলোতে এখনো পানি থৈ থৈ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন বোরো মৌসুমেও কৃষকরা জমি চাষ করতে পারবেন না। তিনি বলেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পশ্চিমে জেলার সর্ববৃহৎ বিল দাঁতভাঙ্গা, মালিনিও পদ্ম বিল সহ ১৩ টি বিল আজ ফসল শূন্য। এসমস্ত বিলও গ্রামের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র  পথ সীমান্তের ইছামতি নদীর শাখরা স্লুইস গেট। স্লুইস গেটের তলদেশ দিয়ে নদীর জোয়ারের পানি প্রতিনিয়ত  লোকালয়ে প্রবেশ করছে। ফলে যে পরিমান ঢুকছে সে পরিমান  নিষ্কাকাশন হচ্ছে না।  বন্যার সময় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য  শাখরা স্লুইস গেটের পাশের বেড়ি বাঁধ  কেটে দেয়া হয়েছিল। সংষ্কার না হওয়ায় সেই ভাঙ্গন পয়েন্ট দিয়ে এখনও জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকছে। এই পানি ঢুকা বন্ধ করতে পারলে  রোদে শুকিয়ে বিলগুলো বোরো চাষের উপযোগী হবার সম্ভাবনা ছিলো। প্রশাসনকে বার বার এ বিষয়ে বলা সত্বেও কোন গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

দেবহাটা জলাবদ্ধতা নিরসন সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, বন্যার ফলে দেবহাটা উপজেলায় ৫টি ইউনিয়নের ৭৭টি গ্রামের ১১/১২ হাজার কৃষক আমন হারিয়েছেন। । বিলগুলি বর্তমানে ৬ থেকে ৭ফুট পানিতে ভরে আছে। বিলের পানি নামাতে না পারলে  আসন্ন বোরো মৌসুমেও কৃষকরা জমি চাষ করতে পারবে না। এমনকি হাজার হাজার একর  জলকর মালিকরা নির্দিষ্ট মেয়াদে তাদের ক্ষতি, লোকসান কাটিয়ে উঠতে  না পারলে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক লোন পরিশোধ করতে জমি বিক্রয় করা ছাড়া  আর কোন উপায় থাকবে না। তিনি বলেন উপজেলার শাখরা কোমরপুর বিল, সেকেন্দ্রা বিল, পাতনার বিল ও ভাতশালার বিল, পুষ্পকাটি, ঘোড়াপোতা, সখিপুর, ঈদগাহ, হাদিপুর বিল সহ ১১টি বিল আজ কৃষি ও মৎস্য ফসল শূন্য। প্রশাসনকে এলাকার ভুক্তভোগী জমির মালিকদের পক্ষ থেকে বার বার আবেদন নিবেদন করার  পরও অদ্যবধি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তিনি দ্রুত পানি নিষ্কাশনের দাবি জানান।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/নাজমুল হক/সাতক্ষীরা

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here