মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক ::

সততা মনুষ্যত্ব্যের বিকাশ ঘটায়। সততাই মানব জীবনে সফলতা ও আনন্দ বয়ে আনে। সততাই বড় সম্পদ। সারা জীবন সৎ থাকার জন্য ওরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, সেই চেষ্টাই হলো ওদের বড় অর্জন। সত্য মানুষকে মুক্তি দেয়, মিথ্যা মানুষকে ধ্বংস করে। সৎলোক কখনও মিথ্যা কথা বলেনা, কারো সম্পদ লুট করেনা, তার দ্বারা ঘুষ গ্রহণ ও মানুষের সাথে প্রতারণা করা সম্ভব হয়না। প্রত্যেক সমাজেই সততার জয় জয়কার। সততার সামাজিক মূল্য অপরিসীম। এই সততার মাধ্যমেই সমাজে সুখ ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। সততার অভাবে সমাজ দুর্নীতিগ্রস্থ হয়। বিশ্বের দরবারে দেশ ও জাতি হয় কলংকিত। বিশ্বে আজ অশান্তির মূল কারণ হচ্ছে সৎলোকের অভাব। সৎ ও অসততার মধ্যে পার্থক্যটা হলো আকাশ-পাতাল। সৎ লোকের জীবনবোধ অসৎ লোকের জীবনবোধের চেয়ে বিপরীতধর্মী। সৎলোকের অভাবে জাতিতে জাতিতে সংঘাত-সংঘর্ষ লেগেই আছে। ফলে বিশ্বের প্রতিটি কণায় কণায় অশান্তির অগ্নিশিখা দাউদাউ করে জ্বলছে।

সৎ লোক বৈষয়িকভাবে দরিদ্র থাকতে পারে। সে স্বেচ্ছায় ওই রকম দারিদ্র্যকে বেছে নিয়েছে। সৎ লোক নিজে জীবনচারিতায় কী আনন্দ পায়, সেটা একজন অসৎ লোক বুঝবে না। অসৎ লোকদের ধারণাই হলো, সমাজে সব লোকই অসৎ। আবার অসৎ লোক নিজের অসততার পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়েও বলে, সমাজে সব লোকই অসৎ। আর সে নিজে যা করছে তা-ই স্বাভাবিক। কিছু অসৎ লোক এমনও বলে যে ওসব পদে বসে সৎ থাকা যায় না। সৎ থাকতে গেলে চাকরি হারাতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ের কিছু লোক বলে ট্যাক্স অফিসে গিয়ে সৎ হতে গেলে ট্যাক্সম্যানরা আপনার কাছ থেকে শুধু বেশি ট্যাক্সই চাইবে। অসৎ ও দুর্নীতিবাজ লোকদের আরেক কৌশল হলো কী করব, ওপরের সবাইকে খুশি করতে হয়! অসৎ লোক কাউকে নিয়ম ভেঙে কিছু সুবিধা দিতে গিয়ে বলে, ওপরের নির্দেশ আছে। অসৎ লোকেরা আবার সংঘবদ্ধ থাকে। তাদের পাশ কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত কেউ দিতে গেলে তারা তা ঠেকিয়ে দেবে। সৎ লোক কারা? সৎলোকের পরিচয় কি? সততার স্বরূপ কি? এসব প্রশ্নের জবাব নবম হিজরী তাবুকের যুদ্ধে অনেক মুনাফিক মিথ্যা ওজর পেশ করে শরীক হয় নাই।

মুনাফিকরাতো ইসলামের চরম শত্রু। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কাব ইবনে মালিক (রাঃ), মুররা ইবনে রবি (রাঃ) ও হেলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ) এই তিনজন জিহাদের প্রবল আকাংখা থাকা সত্ত্বেও বিশেষ অসুবিধার কারণে তাবুক যুদ্ধে শরীক হতে পারেন নি। অথচ এসব সাহাবী ছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রেমে আসক্ত। তাবুক যুদ্ধে শরীক না হওয়ার কারনে উক্ত তিন সাহাবীকে এক ঘরে করে রাখা হয়েছিল। উক্ত তিন সাহাবীই ছিলেন সৎ ও মহৎ। আর সৎ থাকলে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতেই হয়। বিনম্র চিত্তে তিন সাহাবী আল্লাহর দরবারে তওবা করতে থাকলেন। ৫০ দিন এইভাবে এক ঘরে থাকার পর আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করলেন। আল্লাহ পরিচয় করিয়ে দিলেন উক্ত তিন সাহাবীই সৎ। ইরশাদ হচ্ছে-‘‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সৎলোকের সঙ্গী হয়ে যাও।’’ (সূরা তওবাঃআয়াত-১১৯) তাবুক যুদ্ধের উক্ত ঘটনার দ্বারা প্রমাণ হল যে- সৎ থাকলে কষ্ট সহ্য করতে হয়।

দুর্নীতিবাজদের আরেক কৌশল হচ্ছে, সৎ লোকগুলোকেও দুর্নীতিবাজ বলা। তারা বলতে থাকে, ও, ওই লোকটা সৎ আছে কারণ সে তো দুর্নীতি করার সুযোগই পায়নি। সুযোগ পেলে দেখতেন সে হতো দুর্নীতির গডফাদার! আসলে দুর্নীতিবাজরা সৎ লোকদের এসব বলে একটু হলেও কাদা মেখে দিতে চায়। তবে যারা সৎ আছে তারা এসব নিন্দাবাদের পরোয়া করে না। তারা সৎ থাকে নিজের বিশ্বাসকে মূল্য দেওয়ার জন্য। তাদের বিশ্বাস, সততা তাদের অন্যদের থেকে শুধু আলাদাই করবে না, প্রকৃতপক্ষে তারাই সফল হবে। তাদের কাছে সফলতার মাপকাঠি হলো সততা আর পরিশ্রম। তাদের আরেক গুণ হলো তারা বিনয়ী। দুনিয়ার মিথ্যা লোভ তাদের তাড়িয়ে ফিরতে পারে না। তারা হলো এক অনন্য মানুষ। সৎ লোকের সুনাম ও সুখ্যাতি চিরদিন অব্যয় অক্ষয় থাকে।

কোরআনে বর্ণিত আসহাবে কাহাফের ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। মূর্তিপূজক বাদশা দাকিয়ানুসের আমলে ৭জন যুবক তাদের ঈমান ও সততা রক্ষার জন্য তাদের দেশ ত্যাগ করেন। একটি কুকুরও তাঁদের সঙ্গী হয়ে যায়।  তারা একটি পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেয় এবং কুকুরটি গুহার দ্বারে পাহারাদার হিসাবে কাজ করে। ঐ গুহার মধ্যে তারা ঘুমিয়ে পড়ে। এক ঘুমে ৩০৯ বছর অতিবাহিত হয়ে যায়। ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে তাদের একজন ‘আফমুস’ নামক শহরে খাদ্য দ্রব্য আনতে যায়। দোকানদারকে সে একটি দিরহাম দিলে দোকানদার বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলো তুমি কোথা থেকে এসেছ এবং এ দিরহামটি কোথায় পেয়েছ? এতে অনেক লোক একত্রিত হল। দিরহামটি তৎকালীন বাদশার কাছে নেয়া হল। তৎকালীন মুসলিম বাদশা দেখলেন দিরহামটি ৩০৯ বছর আগের। এতে প্রমাণ হল আসহাবে কাহাফের উক্ত ৭ যুবক ও কুকুরটি ৩০৯ বছর একাধারে ঘুমিয়েছিলেন। দাকিয়ানুশ-বাদশার অত্যাচার থেকে মুক্তি ও সততা রক্ষার জন্য উক্ত যুবকরা দেশ ত্যাগ করেছিলেন। তাদের সততার ঘটনাকে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তা কোরআনে উল্লেখ করেছেন। উক্ত ৭জন সৎ ও মহৎ যুবকের সঙ্গী হওয়ায় আল্লাহ সেই কুকুরটিকেও জান্নাত দান করবেন।

সৎ লোকদের কেউ তোষামোদও করে না। সৎ লোকের পরিচয় প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে যারা আল্লাহকে ভয় করে সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকেন তারাই সৎলোক। কারণ তারা অপরের এই ব্যবহার অপছন্দ করে। গৌরব-গরিমা এসব হলো তাদের সৃষ্টিকর্তার জন্য। মহান শুধুই তাদের রব তাদের সৃষ্টিকর্তা। এই লোকগুলো সমাজের কাদায় থাকলেও কাদা যেন গায়ে মাখতে না পারে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকে। চাওয়া-পাওয়ার উৎস তাদের কাছে একটিই। সেই উৎস হলো তাদের সৃষ্টিকর্তা এবং বিশ্বাস করে, তিনি চাইলে তারা ভালো থাকবে। দুনিয়ার ভালো থাকার উপকরণগুলো তারা ততটাই মূল্য দেয় যতটা না হলে ন্যুনতম জীবন ধারণ করা যাবে না। এরা অন্য লোককে সম্মান করে। এরা এ-ও জানে, প্রকৃত জ্ঞানী হওয়ার জন্য প্রকৃতির পাঠই অনেক উপকারী, যদি সেই পাঠ সঠিকভাবে গ্রহণ করা যায়। আর যারা একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে সকল অন্যায় কাজ ছেড়ে দেয় তারাই সৎলোক।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here