মালিক উজ জামান, যশোর প্রতিনিধি ::

সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন যশোরের ঝিকরগাছার পেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহীপরিচালক মেঘনা ইমদাদসহ ১১ ব্যক্তি। রোববার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল তাদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।

একজন হার না মানা মেঘনা ইমদাদ : মেঘনা খাতুন। মেঘনা ইমদাদ নামে বেশি পরিচিত। ১৪ বছর বয়সে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। তবু হাল ছাড়েননি। স্বামীর সহযোগিতায় স্বপ্নপূরণের পথে হেঁটেছেন। সেই পথচলা মসৃণ ছিল না। অনেক চড়াই-উতরায়
পেরিয়ে আজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন। চাকরি না করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেছেন। বর্তমানে পেন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক, কপোতাক্ষ ও রূপান্তর কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক, উইমেন ফর উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড চাউল্ড রাইটস অর্গানাইজেশনের সভানেত্রী, রূপান্তর হস্তশিল্প অ্যান্ড ফ্যাশন পার্কের পরিচালক, সেন্টার ফর রিচার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশনের (সিআরই) ইয়াং বাংলা, জাগ্রত নাগরিক কমিটি, জাতীয় যুব কাউন্সিল ও যশোর কম্পিউটার সমিতির সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে সম্পৃক্ত। কাজের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৭ সালে ঝিকরগাছা উপজেলার জয়িতা পুরস্কার, ২০২০ সালে জয়বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড ও ২০২১-২২ অর্থবছরে যশোরের শ্রেষ্ঠ যুব সংগঠন পুরস্কার ঝুলিতে। তার জন্ম ১৯৮৭ সালের ৯ জুন ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া ইউপি’র মাটশিয়া গ্রামে। বাবা লুৎফর রহমান ও মা জোহরা খাতুন। তিন বোনের মধ্যে ছোট মেঘনা। বাবা মায়ের স্বপ্ন ছিল তিন মেয়েকে
উচ্চশিক্ষিত গড়ে তোলা। বড় দুই মেয়েকে শিক্ষিত করা গেলেও মেঘনার জন্য ছিল ভিন্ন পরিস্থিতি। তাকে পারিপার্শ্বিক কারণে
১৪ বছর বয়সে বিয়ে দিতে হয়। বাল্যবিয়ের হলেও লেখাপড়া বন্ধ করেননি তিনি। বরং স্বামীর সহায়তায় আত্মবিশ্বাসী মেঘনা সংসার ও লেখাপড়া একসঙ্গে করেন। দিন কষ্টের হলেও হাল ছাড়েননি।

২০০৫ সালে উপজেলার মাটশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ২০০৭ সালের ঝিকরগাছা সম্মিলনী মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন (এমএম) কলেজ থেকে ২০১১ সালে ভূগোলে বিএসসি অনার্স ও ২০১২ সালে মাস্টার্স পাশ। লেখাপড়া কাজে লাগাতে স্বামী ইমদাদুল হক ইমদাদের অনুপ্রেরণায় শুরু উন্নয়নমূলক কাজ। গড়ে তোলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

এ প্রসঙ্গে মেঘনা ইমদাদ জানান, ২০১৭ সালে ঝিকরগাছা পৌর কৃষ্ণনগর মাঠপাড়ায় যখন পারিবারিক কাজে যেতাম, দেখতাম
কিছু ছেলেমেয়ে এলোমেলো খেলাধুলা করছে। অথচ তাদের তখন স্কুলে পড়াশোনা করার কথা। আমি তাদের কাছে জানতে চাইলাম কেন তারা স্কুলে না যেয়ে খেলাধুলা করছে? তারা জানাল, তাদের মা-বাবা ফেলে রেখে অন্যত্র চলে গেছেন, কারো মা নেই, কারো বাবা নেই। অনেকের অভিভাবক অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। কারও বাবা শ্রমজীবী।

এই পরিবারের শিশুরা পড়াশোনার স্বপ্ন দেখেনি। তারা একটু বড় হলে শিশুশ্রমে জড়াতে বাধ্য হয়। সিদ্ধান্ত নিলাম, এদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দিলে হয়তো ওরা স্কুলমুখী হবে। লেখাপড়া শিখে মানুষ হতে পারবে। পরিবারের অর্থনৈতিক চাকা সচল করবে। সেই চিন্তা থেকে শুরু সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘স্বপ্নলোকের পাঠশালা’। এ শিক্ষা কার্যক্রমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়ায় আগ্রহী করার পাশাপাশি তাদের অভিভাবক মা, দাদি/নানি যারা অন্যের বাড়িতে ঝি-এর কাজ বা স্থানীয় কোনো ছোট ফার্মে নিশ্চিন্তে কাজের সুযোগ পান। ঝিকরগাছায় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বপ্নলোকের পাঠশালার দুই ক্যাম্পাসে ১৭০ জন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে লেখাপড়া করছে। এ পর্যন্ত ৬১০ জন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন
সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।

এই অঞ্চলের অনগ্রসর, অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অভিভাবক ও বেকার মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থান ও আয়বর্ধক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করতে ২০১১ সালে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার সহযোগিতায় মোট ১৫৭০ জন বেকার, হতদরিদ্র, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও হতদরিদ্র যুব নারীকে দর্জি বিজ্ঞান, আম্ব্রয়ডারি, ব্লক-বাটিক ও হস্তশিল্প দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষিতদের সেলাই মেশিন, ব্লক-বাটিক উপকরণ, হস্তশিল্প তৈরির উপকরণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ৬৫০ জন মহিলাকর্মী নিজেরা হাতের কাজের থ্রি-পিস, নকশিকাঁথা, শাড়ি, বেডশিট, পাঞ্জাবিসহ নানা রকম হস্তশিল্প পণ্য তৈরি করছে। সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের লেখাপড়া ব্যয় নির্বাহে, স্বপ্নলোকের পাঠশালার হতদরিদ্র অভিভাবকদের হস্তশিল্প প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করি। তাদের তৈরি হস্তশিল্পপণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছি। বিক্রয়লব্ধ অর্থের লভ্যাংশ দিয়ে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায় ব্যয় করি। এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বপ্নলোকের পাঠশালার অভিভাবকরা স্বাবলম্বী হয়েছে।

ঝিকরগাছাসহ পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোর বেকার, অদক্ষ যুব ও যুব নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে বিশেষ করে বেকার, অসহায়, অদক্ষ ও স্বামী পরিত্যক্ত নারীদের বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অনুমোদনক্রমে ২০০৫ সাল থেকে ৬ মাস মেয়াদি অফিস অ্যাপ্লিকেশন, ডাটাবেস প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ডিজিটাল ভূমি জরিপ, ফ্রি- ল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কোর্সে সর্বমোট ৩৮৫০ জনকে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পেযেছে। যা দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে অভূতপূর্ব সাফল্য। তার স্বামী ইমদাদুল হক ইমদাদ ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদে সিএ পদে কর্মরত। তাদের দুই ছেলে সাফওয়ান ইবনে ইমদাদ ও সাদিন মোহাম্মদ আইহান।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here