এমি জান্নাত

এমি জান্নাত :: চাকুরিজীবী মেয়েদের ডিভোর্স হলে একটা কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নানাভাবে শোনা যায়। সেটা হলো মেয়ে শিক্ষিত, চাকুরিজীবী, ডিভোর্স তো হবেই! চাকরি করে বলেই জামাইকে বাদ দিয়ে যেতে পারছে, চাকরির দেমাগে মাটিতে পা পরে না, সংসার করবে কী! ইত্যাদি ইত্যাদি। হ্যাঁ, মেয়েদের শিক্ষিত হবার হার এবং কর্মক্ষেত্রে পদার্পণ বেড়েছে বলেই ডিভোর্স বেড়েছে। কারণ তারা আত্মসম্মান রক্ষা করার ক্ষমতা রাখে। এখানে শুধু তাদের কথাই বলছি যাদের পাশে থাকার মানুষটি পাশে নেই।

এখন প্রশ্ন হলো চাকরির সাথে ডিভোর্স এর কানেকশন তখনি হয় যখন ওই চাকরিজীবী মেয়েটার সংসার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সেটা হতে পারে স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির শারীরিক বা মানসিক অত্যাচার, স্বামীর সাথে বোঝাপরা না হওয়া অথবা যেকোনো মানসিক চাপ যেটা সহ্যের বাইরে চলে যায়! যখন শিক্ষার সাথে সাথে একটা মেয়ে নিজের পরিচয় এবং অর্থ উপার্জন করে নিজে বাঁচার সক্ষমতা রাখে, তখন বসে বসে এসব গলাধঃকরণ করবে, ভাবেন কী করে!

তবে চাকরি করেও অনেকে সহ্য করে না তা না। বেরিয়ে আসতে মনের জোরটাও যে চাই! এবার আসি মুখ বুঝে অথবা প্রতিবাদ করে হাজারো স্বপ্নভঙ্গের পরও সংসার করে যাওয়া গৃহিণী যাদের কেউ কেউ শিক্ষিত আবার কেউ কেউ না, তাদের গল্পে। যারা শিক্ষিত হয়েও চাকরির সুযোগ নেই এবং শিক্ষিত না তাদের পদবী শুধুই গৃহিণী। আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থায় তারা বাধ্য হয়ে ওই সকল অত্যাচার সহ্য করে নেয়, কারণ তাদের মাথার উপর সেই ছাদটা নেই যে নিজে আলাদা হয়ে বাঁচবে। না তো শ্বশুরবাড়ি, না তো বাবার বাড়ি।

কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবার বাড়িতেও শুনতে হবে মানিয়ে নে! তো এখন কী শিক্ষিত চাকুরীজীবী মেয়েরা ডিভোর্স দিবে নাকি তারা দিবে যাদের কোনো উপায় নেই! যুগ যুগ ধরে অবলা হয়ে থাকা নারীরা আসলে নিজের জীবনের সাথে স্যাক্রিফাইস নামক অনেক বড় একটা কম্প্রোমাইজ করে ফেলে!

স্যাক্রিফাইস করলে তো মন বড় হয়, কিন্তু জীবনের এই প্রহসন সহ্য করে কম্প্রোমাইজ করলে যে মন মরে যায়! এডজাস্টমেন্ট একতরফা হয়না, কম্প্রোমাইজও তাই। কিন্তু সেগুলো ছোট ছোট বিষয়ে। কিন্তু যে বিষয়গুলো জীবনকে ধাক্কা দিয়ে যায়, সেগুলোর সাথে বোধহয় কম্প্রোমাইজ করা যায় না। আর যদিও করতে হয়, ওইযে মনকে মেরে আর আত্মসম্মান নর্দমায় ফেলে!

সেই নারীরা কখন যে নিজের স্বত্তা হারিয়ে ফেলেন বুঝতেও পারেন না। ধরেই নেন এটাই জীবন। কিন্তু জীবন থেকে অনেক কিছু নেবার আছে তো! চাকরি না থাক, শিক্ষা না থাক, অন্যায়ের প্রতিবাদের এক একটা শব্দও আলাদা শক্তি। সংসার শখে কেউ ভাঙেনা, ব্যতিক্রম নাইবা টানলাম! তাই সব ক্ষেত্রে ভাংচুর করতেই হবে, এমন তো কথা নেই। প্রতিবাদ না করে যতটুকু টিকে থাকা যায়, প্রতিবাদ করে একটু হলেও বেশি টিকে থাকা যায়।

আর সেই কলিযুগ পিছনে ফেলে এসেছি আমরা অনেক আগেই। এখন নিজেকে প্রমাণ করার হাজারো পথ খোলা। সবার মধ্যেই কোনো না কোনো গুণ থাকে। আর সেটা কাজে লাগিয়ে যে কেউ নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করে নিতে পারে।

শিক্ষার সার্টিফিকেট নেই আপনার? সেলাই বা হাতের কাজ বা রান্না ভালো পারেন? হয়ে উঠুন উদ্যোক্তা। শিক্ষিত কিন্তু চাকরির সুযোগ হয়নি বা সময় চলে যাবার পর মনে হয়েছে কিছু করবেন? বিভিন্ন সংস্থা আছে আপনার জন্য। অথবা ঘরে বসে টিউশনি। বাঁধা আসবে, আওয়াজ তুলে বেরিয়ে আসুন। ঘর ছেড়ে নয়, প্রতিকূলতা ছেড়ে। আর যদি ঘর ছাড়তে বাধ্য হতেই হয়, নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেই বেরিয়ে আসুন।

সময়টা এখন আর নাগালের বাইরে নেই। শুধু কাজে লাগিয়ে নিলেই ব্যস! পাছে লোকে কিছু বলবেই! নিজের পরিচয়টাই মাথার উপরে সবচেয়ে বড় আকাশ। যেটা কেউ নিতে পারেনা! কারও মেয়ে বা বউ হয়ে না, নিজের হয়ে বাঁচার প্রশান্তিটাই জীবনকে ভালোবাসতে শেখাবে। জীবন তখনি সুন্দর যখন প্রতি মুহুর্তে নিজেকে খুঁজে পাওয়া যায়  নিজের কাজের মধ্যে। আর যাই হোক নিজের অস্তিত্বকে হারিয়ে যেতে না দেই।

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here