শিক্ষার্থীরাই শুধু চোখের বিষ!
লেখক

জুনাইদ আল হাবিব: সব চলছে, ধুমধাম, ঠিকঠাক। গুলশান থেকে সদরঘাট, কোথাও নেই একটু ফাঁক। কোথাও কিছু থেমে নেই। অথচ, বছর খানেক হয়ে যাচ্ছে রবিনদের ক্যাম্পাসটা এখনো খোলেনি। যে ক্যাম্পাসে তারা উচ্ছ্বাসে মাততো, সে ক্যাম্পাস প্রায় বছর যাবত নিস্তব্ধ, নিরিবিল। কোলাহল নেই। ক্যাম্পাসের পাখিরা যেন ক্যাম্পাসের সঙ্গে মান-অভিমানের অঙ্কে দূরে সরে আছে। কষ্ট বাড়ে শিক্ষকদেরও। আদরের ছেলে-মেয়েরা কাছে নেই। বিষাদ জমে অপেক্ষার বারান্দায়। তবুও প্রতিক্ষার শেষ হয় না। রবিনদেরও প্রতিক্ষা শেষ হয় না, ক্যাম্পাসের যেমন, মায়াটা তেমন শিক্ষকদের।

শিক্ষাকে জাতির মেরুদন্ড মনে করা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তা যেন একদমই উল্টোদিক। বৈশ্বিক করোনা মহামারিকে কারণ দেখিয়ে গত বছরের মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। ক্যাম্পাসের বারান্দা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা যখন বাড়ি ফেরে, তারা হয়তো ভাবছিল, সপ্তাহ খানেক পরেই আবার ক্যাম্পাসে আসবে তারা। কিন্তু তেমনটা হয়নি। পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে দিনকে দিন। এভাবে আরেক সপ্তাহ পার হয়, মাসের পর মাস, বছর ছুঁই ছুঁই এখন। সংবাদ সম্মেলনে কেবলই ধাপ পিছু হটে৷ পেছানো হয় তারিখ, ক্যাম্পাস খোলার একটু খবর আসলেও তা আবার কিছুদিন পর প্রত্যাহার করে নেয়া হয়৷ যা আমাদের সকলেরই জানা।

করোনার মধ্যে কয়েক মাস সব কিছু স্থবির থাকলেও ধীরে ধীরে সব কিছু খুলতে থাকে। ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শপিংমল, খেলার মাঠ, উৎসব-অনুষ্ঠান, সব আগের মতই। গ্রাম থেকে শহর, নগর থেকে মহানগর, সবখানে মানুষের কর্মব্যস্ততা কমে নেই, বরং বেড়েছে। সড়কে আগের মতই যানজট, ট্রাফিক পুলিশ আগের মতই দায়িত্ব পালনে হিমশিম খাচ্ছে। চালকরা বাসে যাত্রীদের জায়গা দিতেও একই অবস্থা। গুলশান, ফুলবাড়িয়া, ফার্মগেট থেকে শুরু করে সবখানের ভ্রাম্যমান বেচাকেনায় মানুষের সমাবেশে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।

মৎস্য ভবন থেকে সদরঘাট যেতে যেখানে এক ঘন্টা সময় লাগে, সেই শহরে কী এখনো করোনার ভয় আছে? প্রচুর জট ঠেলে একটা বাসকে সামনে এগোতে হয়। বাসের সিট খালি নেই, আগের মতই মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে ফিরছে। শপিংমলেও মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সব কিছুর কার্যক্রমও চলছে বেশ জোরেশোরে। কিন্তু আপত্তি বাঁধে শিক্ষাখাতে। রবিনদের বেলায়।

শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগ অংশই চাচ্ছে, ক্যাম্পাসটা খুলে দিক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী শিক্ষার্থীদের এসব চাওয়া-পাওয়া বা দাবি-দাওয়াকে একটু গুরুত্ব দিয়ে দেখেছে? সব সময় মনগড়া, ঢালাওভাবে সিদ্ধান্ত নিতেই দেখা যায়। সব কিছু যখন আগের মত খুলতে শুরু করেছে, তখনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া উচিত ছিল। বিগত মাস দু’য়েক ধরে শিক্ষা মন্ত্রনালয় মোটামুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেবার পক্ষে এগিয়েছে। শুনে অনেকটা আশাবাদীও হয়েছিলাম। কিন্তু আলো না জ্বলতেই আবার যেন বাতি নিভে গেছে।

করোনার মাঝপথেই থেমে যায় স্নাতক শেষ বর্ষের সমাপনী পরীক্ষা। পরীক্ষার একেবারে মাঝামাঝি সময়। আর কয়েকটা পরীক্ষা হয়ে গেলে হয়তো লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে ৫ থেকে ৬সাস দুশ্চিন্তায় ভুগতে হতো না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার সুবাদে মোটামুটি তাদের পরীক্ষাটা নেয়া হয়ে গেছে। এরই মাঝে মাস্টার্স শেষ বর্ষের সমাপনী পরীক্ষাও চলছে। পরীক্ষার মাঝ পথেই আবার সকল পরীক্ষা স্থগিত করার পক্ষে আমি কোন নির্দিষ্ট যুক্তি পাইনি। মাস্টার্সের পরীক্ষার্থীদের আর মাত্র ২টা বিষয় বাকি ছিল। পরীক্ষাটা নিয়ে নিতেন, তারপর নতুন সিদ্ধান্তে যেতেন! এরই মাঝে স্নাতক শেষ বর্ষের সমাপনী ভাইভাটাও নিয়ে নিতেন। তারপর মোটামুটি নতুন কিছু ভাবা যেত। কিন্তু দুইটা বর্ষের পরীক্ষার্থীদের আটকে রেখে এমন সিদ্ধান্ততো নিতে পারেন না। আমি এখানে শিক্ষামন্ত্রীর একার দোষ দেব না। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, তাদের যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্য উপস্থাপনে ঘাটতি আছে৷

অনার্স শেষ বর্ষের ভাইভাটা এবং মাস্টার্সের দুইটা পরীক্ষা হয়ে গেলে কী হতো? যে ছেলেটা ২০১৮সালে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী, ২০১৯সালে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী, ২০২০সালেও একই বর্ষের, ২০২১সালেও! এ দেশে মাস্টার্স শেষ হতে কত বছর লাগে? একটা ছেলে পরিবারের লাখ লাখ টাকা নষ্ট করে পড়াশোনা করেছে। দিনশেষে চাকরির বাজারে ঢুকতে পারবে না, পরিবারের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে পারবে না। এটা তার জন্য কেবল হতাশই নয়, চরম লজ্জারও বটে। আমি এটাকে তার লজ্জা নয়, রাষ্ট্রের লজ্জা হিসেবে দেখবো।

কী সুন্দর, কিছুদিন আগে অনার্স প্রথম বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা হয়ে গেছে বা অনার্স শেষ বর্ষের পরীক্ষাটা হয়ে গেছে। আচ্ছা, কোথাও কী কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে? বা গণমাধ্যমগুলোর সূত্র দেখিয়ে কেউ বলতে পারবেন? স্বাস্থ্যবিধি মেনেই যেহেতু পরীক্ষাগুলো হচ্ছে, তাহলে কেন মাস্টার্সের শেষ বর্ষের আর মাত্র দুইটা পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে? জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে পড়েছেন। এ থেকে নিশ্চয় বোঝা যায়, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে কেউ বসে থাকে না। বয়সের সাথে, দক্ষতার সাথে পড়াশোনা পিছিয়ে যাচ্ছে।

একটা জাতিকে মেধা শূন্য করা হচ্ছে। কোন একটা জাতিকে ধ্বংস করার জন্য শিক্ষাখাতকে ধ্বংস করাই যথেষ্ট। আমরাতো এখন সে পথেই এগুচ্ছি৷ সব কিছু চলতে পারলে, শিক্ষা-কার্যক্রম কেন চলতে পারে না। বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ভ্যাকসিন দিয়ে তাদের ক্যাম্পাস খুলে দেয়া হবে। তাহলে সেটা এত দেরিতে কেন? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভ্যাকসিন দিয়ে দিন, ক্যাম্পাস খুলে দিন। শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে যাবে, ভ্যাকসিন নিবে। আর তরুণ বয়সী ছেলে-মেয়েদের জন্য করোনা কোন ভয়ের নয়৷ করোনাকে অজুহাত দেখিয়ে দেখিয়ে টালবাহানা বন্ধ করতে হবে। শিক্ষা-কার্যক্রমে গতি আনতে হবে। নইলে একটা প্রজন্ম অচিরেই মেধা শূন্য হয়ে যাবে৷ একটা বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকলে আর কী শেখা হয়? আশাকরি, কর্তৃপক্ষের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here