রোকেয়া রুমি

রোকেয়া রুমি ::  শিক্ষা দেন যিনি তাঁকে শিক্ষা গুরু বলা হয়। আমরা যখন অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে আমাদের হাতেঘড়ি শুরু হয় প্রথমে যখন স্কুলে গিয়েছি দাদার সাথে হাত ধরে ৫ বছর বয়সে ছোট ওয়ান বলত সেখানে আমাদের ভর্তি করা হয়। আমার বাবার হাত না ধরে দাদার হাত ধরে শিক্ষা শুরু হয়েছিল।

ভর্তির আগের দিন কত প্রস্তুতি। আমার আব্বা সরকারী জেলা স্কুলে চাকুরীর সুবাধে মেহেরপুর জেলায় সরকারী স্কুলে ইংরেজী বিষয়ে পাঠদান করাতেন। দাদা আমার জন্মের পরেও শিক্ষকতা করেছেন। বাড়ীতে যেন একটি শিক্ষার পরিবেশ ছিল। ভালুকা চাঁদপুর সাতক্ষীরা জেলায় একটি গ্রামের নাম সেখানে আমার হাতে ঘড়ি। পুনরায় আমার মায়ের পি,টি,আই ট্রেনিং চলছিল তাই সাতক্ষীরা জি,এন প্রাথমিক বিদ্যালয় ভর্তি হই।

এক বছর পড়াশোনা কালীন সেই সময়ের শিক্ষকদের নাম এখনো মনে আছে। ভালুকা চাঁদপুর সাতক্ষীরা জেলার হেড মাস্টার ছিলেন আমাদের হান্নান স্যার, খুবই আদর করতেন আমাকে রকি বলে ডাকতেন। এক বছর পর যখন জি,এন স্কুলে আম্মার পি,টি,আই ট্রেনিং শেষ হয় তখন আমি সাতক্ষীরা জেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে আবার ভর্তি হই। ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত ভালুকা চাঁদপুর গ্রামে পড়াশুনা করলাম।

শিক্ষক ক্লাসে যান বেত হাতে। ক্লাস শেষে ঘন্টা ডাক পড়ানো প্রতিদিন সমাবেশ ও জাতীয় সংগীত হেড স্যারের বাঁশী বাজানো এখনো কানে ভাসে। তার পর আবার সাতক্ষীরা শহরের বাড়ী চলে এসে ভর্তি হলাম সাতক্ষীরা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। তখন আমার আব্বা সাতক্ষীরা সরকারী (বালক) বিদ্যালয়ে ইংরেজী সহকারী শিক্ষক। কি নিয়ম নীতি প্রতিদিন আব্বা আমার আর আমার ভাই যিনি এখন শিক্ষা ক্যাডারে চাকুরীরত, দুই জনকে নিয়ে মটর সাইকেলে স্কুল যান। আমাকে নামিয়ে তার পরে আব্বা স্কুলে যান ভাইকে নিয়ে আবার ছুটি হলে যখন পর্যন্ত আব্বা না আসবে গেটে দাঁড়িয়ে থাকতে হত।

মেয়েরা দেখতাম কেহ হেঁটে, কেহ সরকারী গাড়ীতে বাড়ি ফিরছে। আব্বা যখন আসত তখন মটর সাইকেলে বসে পড়তাম যেন কোন দিন দুই ভাই বোনকে নিয়ে ভালুকা চাঁদপুর চলে গেছেন। আমার আব্বা রাগী ছিলেন। তবে আমাদের মারতেন না। উনার শাস্তি ছিল অন্য রকম, না পড়লে স্কুলে নিবে না, বই চুলায় পুরিয়ে ফেলতে যাবে।

সকাল ১০টা স্কুল থাকলে গরম ভাত এবং টিফিন বক্সে ভাত নিয়ে যেতে হত। যদিও এড়াঃ রয়েস ও গার্লস দুই স্কুলেই দুপুরে প্রতি ক্লাসে নাস্তা আসত। নাস্তার নিয়ম ছিল নানি অথবা আয়ারা প্রতিদিন উপস্থিতি নিয়ে যেতেই শিক্ষক শিক্ষিকার নিকট থেকে। টিচাররা বেশ শক্ত ছিলেন তবে নিয়মনীতি বেশ পালন করতেন। এখন যেমন বড় বড় নামের স্কুল কিন্তু এটা শুধু ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য। আগের টিচাররা শিক্ষাকে একটি ব্রত হিসাবে নিতেন।

শিক্ষকদের কিভাবে মানুষ সম্মান করবে তাঁদের পেটে কত ক্ষুধা। বেশী চাহিদা, অন্যে পেশায় যাঁরা আছেন তাঁরা যদি একটু চিন্তা করে দেশ প্রেমিক হয় তবে আশা করি শিক্ষকদের চাহিদা কিছুটা কমবে। নিজেদেরকে লেখাপড়া করতে হবে। সব সময় পড়া শুনার প্রতি নজর দিয়ে শিক্ষককে এক জন দক্ষ কারিগর হিসাবে গড়ে তুলতে হবে, তাহলে একটি ভাল জাতি আমরা আশা করতে পারি।

শুধু ভাল স্কুল কি হিসাবে গ্রেড করা হয় জানিনা। সারদিন বাচ্চা গুলো প্রাইভেট আর প্রাইভেট এই করোনা কালে ও জুমের মাধ্যমেও ক্লাস করছেন প্রাইভেটে ক্লাসে না হচ্ছে পড়া শুনা। অন্য সব দিবস গুলি জাগজমক ভাবে পালন করা হয়। কিন্তু শিক্ষা দিবসে শিক্ষকদের নিয়ে কোন রকম কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন নাই। এটি সত্যিই বেদনাদায়ক।

শিক্ষককে হতে হবে একজন গুরু। সমাজে তাঁর গ্রহনযোগ্যতা থাকতে হবে। শিক্ষক শুধু শিক্ষকতায় নাম লিখালে হবে না, তাঁকে একজন প্রকৃত শিক্ষক হতে হবে। ছাত্র/ছাত্রীদের নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়া একজন উত্তম গুনাবলী শিক্ষক। যদি দান করতে পারেন তবে শিক্ষা আরো বাড়ে। তবে ছাত্র/ছাত্রীরা দেশের ভবিষ্যৎ হবে এটি আশা রাখি।

 

 

 

লেখক: অধ্যক্ষ, ঢাকা ইডেনবার্গ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here