শামসুদ্দিন হীরা

শামসুদ্দিন হীরা :: অফিস টাইমে বাস ধরা বিরাট ঝক্কি! অথচ,রাজন আজ যাত্রী ছাউনিতে দাঁড়াতেই বাস পেয়ে গেলো।বাসের গেটে একটি পা রাখতেই বাসটি হঠাৎ গতি বাড়িয়ে দিলো।কিছু বুঝে উঠার আগেই রাস্তায় ছিঁটকে পড়লো রাজন।অফিসের ব্যাগ, টিফিন ক্যারিয়ার, মোবাইল ফোন এলোমেলো ছড়িয়ে পড়লো।বাঁচার আকুতিতে একবার চিৎকার করে উঠলো।তারপর নিশ্চুপ…..

কিছু লোক ঝুঁকে আছে রাজনকে ঘিরে।কেউ বললো বাসটাকে আটকান।কেউ বললো,পুলিশ ডাকুন।কেউ বললো, আরে ভাই,আগে দেখুন পালস্ আছে কিনা?

ভীড় ঠেলে একজন ট্রাফিক পুলিশ এগিয়ে এসে রাজনের শিরা চেক করলো।তারপর কাকে যেন ফোন করলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ভ্যান আসলো।পুলিশ উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে বললো,এখনও প্রাণ আছে।হ্যারি আপ্…..

পাশেই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল।কয়েকজন তরুণ রাজনকে পুলিশ ভ্যানে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেল।

যখন জ্ঞান ফিরলো তখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে রাজন বুঝতে পারে ডান পা’টা আর তার সাথে নেই।বাঁধভাঙা চোখের জলে সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠে।তবু পা হারানো কষ্টের মাঝেও বেঁচে থাকার আনন্দ তাকে অনেকটাই আত্নপ্রত্যয়ী করে।

একটা পা নেই। কি করে কাটবে তার সারাটা জীবন!গ্রামে বাবা-মা,ছোট ভাই-বোন তার আয়ের উপর নির্ভরশীল।সান্তনা দেয় নিজেকে, এখন ভেঙে পড়া চলবে না। তবু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে তার বুক কেঁপে উঠে।

অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।বাড়িতেও খবরটা দিতে হবে।মোবাইলটা হারিয়েছে এক্সিডেন্টে।বাড়ির ও অফিসের এমডি স্যারের মোবাইল নম্বর মনে করার চেস্টা করে।মনে করতে পারলো না।আবার চেষ্টা করলো।মাথাটা টনটন করে উঠলো ব্যথায়।চোখ বন্ধ করে দুহাতে মাথা চেপে ধরে।কেবল সুমাইয়ার মোবাইলের শেষ তিনটা ডিজিট তার মনে পড়ল। ৪২০,বেশ মজার সংখ্যা।

সুমাইয়ার সাথে রাজনের আকদ হয়েছে দু’মাস আগে।সুমাইয়া কি তার পঙ্গুত্ব মেনে নেবে? বাবা- মা কি করে সহ্য করবে এই শোক? চাকরিটা কি থাকবে? কি হবে তার ভবিষ্যৎ? এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লো।

কর্তব্যরত নার্সের ডাকে তন্দ্রালু চোখে পাশ ফিরে তাকালো রাজন।বেডের কাছে বাবা-মা, ছোটভাইকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।রাজনের পকেটের মানিব্যাগ থেকে বাড়ীর একটি মোবাইল নম্বর পাওয়া গিয়েছিল।সেখান থেকেই নম্বর নিয়ে পুলিশ ফোন করে ওর বাড়িতে খবর দিয়েছিল।

পরদিন ছোটভাই গিয়ে রাজনের অফিসে খবর দিয়ে এলো।অফিস থেকে বস ও সহকর্মীরা এসে সমবেদনা জানালো।প্রচুর ফল,এনার্জি ড্রিঙ্ক নিয়ে এলো।আর সাথে কিছু নগদ টাকাও দিলো।অবশ্য সুকৌশলে বস জানিয়ে দিলো একজন মার্কেটিং এক্সিকিউটিভের একটা পা না থাকলে চলে না।

সতেরদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে গ্রামের বাড়ি ফিরে যায় রাজন।পুরোপুরি সুস্থ হতে প্রায় ছয় মাস লেগে যায় রাজনের।এখন তার বেশিরভাগ সময় কাটে বিছানায় শুয়ে বসে।কোন কোনদিন বিকেল হলে ক্রাচে ভর করে উঠোনে নেমে একটু পায়চারি করে।আজই প্রথম একটু এগিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়ে বসে।মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাটন টিপে।তারপর ওপাশে রিং হবার আগেই কি মনে করে লাইনটা কেটে দেয়।

প্রথম প্রথম ফোন করে খোঁজ-খবর রাখলেও অনেকদিন হলো সুমাইয়া রাজনকে ফোন করেনি।রাজন বুঝে গেছে তার ভবিষ্যৎ।সুমাইয়া ভালো থাকুক।সেও আর বাকী জীবন অন্যের গলগ্রহ হয়ে বাঁচতে চায় না।তার পৃথিবীকে এগিয়ে নিতে হবে অন্যভাবে।এই কাঠের ক্রাচটি হবে তার একমাত্র সঙ্গী এবং শক্তি….

 

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here