ব্রেকিং নিউজ

শর্তসাপেক্ষে বেকার ভাতা দেওয়া হোক

হোসেন জামাল

হোসেইন জামাল :: দেশে ১৫-২৯ বছর বয়সী যুবক-যুবতীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি। যা মোট শ্রমগোষ্ঠীর ৩০ শতাংশ। এটা একটা জাতির জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ শত বছরের ব্যবধানে এমন ভাগ্যের দেখা মেলে। একই সঙ্গে এটা মন্দ ভাগ্য যদি আমরা তাদের কর্ম দিতে না পারি।

তবে দুঃখের বিষয় হল সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) এর তথ্য মতে, ওই দুই কোটির মধ্যে ৭৪ লাখ কোনো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত নেই। এদের মধ্যে আবার ৭০ শতাংশ প্রান্তিক যুবসমাজ। তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। আর দেশের ভবিষ্যতের জন্য এ অবস্থা অত্যন্ত ভীতিকর বলে অনুমান করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশে বেকারত্বের ভয়াবহতা জানতে কোনো জরিপের প্রয়োজন হয় না। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিস কিংবা অন্য কোনো খাতে একটি শূন্য পদে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা দেখলেই সেটি অনুমান করা যায়। উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে বেকারত্ব ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, কর্মসংস্থানের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে বিনিয়োগ। এর মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্প-কারখানা ও অন্যান্য ক্ষেত্র গড়ে তোলা হয়। বিনিয়োগের এ ক্ষেত্রটি বিগত কয়েক বছর ধরে ঋণাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। সরকার মুখে মুখে বিনিয়োগের প্রাচুর্যের কথা বললেও বাস্তবতা হচ্ছে, নতুন শিল্প-কারখান গড়ে উঠা দূরে থাক, বিদ্যমান অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

এদিকে করোনা কারণে ফ্রেশ বেকারের সংখ্যার সাথে কর্মচ্যুত বেকার যুক্ত হয়ে, বেকারত্বের মিছিলটিকে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ করে তুলবে। এই বেকারদের অনেকে হতাশ হয়ে আত্মহত্যা থেকে শুরু করে মাদকাসক্তি ও সন্ত্রাসের পথ বেছে নিতে পারে। পাশাপাশি সৃষ্টি হবে পরিবারিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা।

এমন পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য আমাদের এখনই ভাবতে হবে। সরকার যে ঋণ নির্ভর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তা মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এটা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। কারণ ঋণ নেওয়ার বিষয়টি যত সহজে বলা যায়, পাওয়াটা তত সহজ নয়। বেশকিছু হিসেব নিকেশ আছে।

ব্যাংকগুলো তাদের নির্ধারিত হিসেব মেলানো ছাড়া বেকারদের ঋণ দিবে না। ততদিনে এক বেকারের সঙ্গে আরো তিন বেকার যোগ হয়ে বেকারত্বের মহামারী দেখা দিবে। এদিকে আগামী কয়েক বছর নতুন নিয়োগের সম্ভাবনাও কম। ফলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটা একটা ভীতিকর আভাস দেয়।

এমন পরিস্থিতিতে বেকারদের রক্ষায় সরকারকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিতে হবে। এক্ষেত্রে বেকারদের দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। স্বল্প শিক্ষিত বেকার, উচ্চ শিক্ষিত বেকার। এদেরকে শর্তসাপেক্ষে বেকার ভাতা দিতে হবে।

দুই ধরনের বেকারের শর্ত দুই রকম। যারা স্বল্প শিক্ষিত, তাদের কৃষিসহ উৎপাদনমুখী কাজে লাগাতে হবে। যেমন, সরকারের পরিত্যক্ত খাস জমিতে, বেড়িবাঁধে সবজি চাষ, খালে ও পুকুরে মাছ চাষের কাজে লাগাতে হবে।

সরকার তাদের জন্য কাজের যাবতীয় উপকরণ সরবরাহ করবে। ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে তারা কাজ করবেন। এসব কাজের বিনিময়ে তাদের জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক থাকবে। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলেরও একটি অংশ তারা পাবে। বাকি অংশ বিক্রি করে ইউনিয়ন পরিষদের কোষাগারে জমা দিবে।

যারা উচ্চ শিক্ষিত তাদের জন্য শিক্ষা অনুযায়ী আপদকালীন কর্ম নির্ধারণ করবে সরকার। এর মধ্যে যিনি যে বিষয়ে পারদর্শী, তাকে ওই বিষয়ের কাজ দেওয়া যেতে পারে। যেমন, যারা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদেরকে দেশের সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খন্ডকালীন শিক্ষকের চাকরি দেওয়া যেতে পারে।

এক্ষেত্রে পরবর্তী নিয়োগের সময় এদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আবার যারা কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের জন্য ইউনিয়নকেন্দ্রীক ওই সব কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। যেমন, কম্পিউটার সেন্টার, ফটোকপির মেশিন। সরকারি অর্থায়নে স্থাপিত কেন্দ্রগুলো স্থাপন করতে হবে।

একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের অতিরিক্ত উপার্জনের পুরো অংশ বেকারকে প্রদান করতে হবে। এটা কর্মের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। এখানে দুর্নীতি কিংবা উন্নতির বিতর্ক করে লাভ নেই। আমাদের বিশাল বেকারদের নামমাত্র কাজ দিয়ে আপদকালীন সময়ে টিকিয়ে রাখতে হবে।

কারণ শ্রমশক্তির এই বিশাল অংশ যদি অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়ে, তবে সেটার ভয়াবহতা কি তা নব্বইয়ের দশকে আমরা টের পেয়েছি। দেশের প্রতিটি জেলা ফেনী কিংবা লক্ষ্মীপুরের মতো সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে গড়ে উঠুক, এটা কারো কাম্য নয়।

 

 

লেখকঃ ব্যাংকার এবং মুক্ত গণমাধ্যমকর্মী

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তুলোশী চক্রবর্তী’র কবিতা ‘বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীগণ’

বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীগণ -তুলোশী চক্রবর্তী . হে আমার ভারত মায়ের সমস্ত বীর ...