লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একশ বছর পূর্তি উদযাপন প্রস্তুতিমূলক সভা

লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একশ বছর পূর্তি উৎযাপন প্রস্তুতিমূলক সভা

জুঁই জেসমিন :: ঠাকুরগাঁও এর বালিয়াডাঙ্গীর লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত -১৯২০। এই বিদ্যালয়ের একশ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে ঈদের আনন্দধারায় প্রস্তুতিমূলক আলোচনা সভা আজ শনিবার (৮ জুন) অনুষ্ঠিত হয়।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়ন সরকারি শহীদ আকবর আলী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও নব নির্বাচিত তরুণ নক্ষত্র উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আসলাম জুয়েল, সেই সাথে সন্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন আলহাজ্ব শফিকুল ইসলাম সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সহ জেলা সংসদ কমিটির সদস্য মইনুল ইসলাম।

সভাপতিত্বে ছিলেন আলাল আকতার এবং শিক্ষক বৃন্দ। প্রধান শিক্ষক জিল্লুর রহমান ও সোহেল রানা সাহেব বিদ্যালয়টির একশ বছর পূর্তি ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বিগত দুই বছর ধরেই, তাঁরা ভাবেন ঈদে সব চাকুরীজীবী বাড়ি আসেন আর এতে সবাইকে পাওয়া যাবে।

আজকের প্রস্তুতি সভায় আনন্দ উদ্যানে একঝাঁক সফল আলোকিত মানুষ যাঁরা ছিলো এই স্কুলের শিক্ষার্থী, একশো বছর পূর্তি উৎযাপন কিভাবে সফল ও সুন্দর করা সম্ভব এ নিয়ে নানা জনের নানা মতামত প্রকাশ করেন।

যে স্কুল থেকে শিক্ষা লাভ করে দেশে বিদেশে হাজার রত্ন ছড়িয়ে আছে, সেই রত্নের যেন এক মহামিলন মেলা। কেউ কমিশনার, কেউ জর্জ, এমপি, ডাক্তার, পুলিশ সুপার, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী ,ব্যাংকার, গায়ক, চিত্রশিল্পী, লেখক, বিজ্ঞানী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, প্রভাষক, দেশে বিদেশে বেশ ছড়িয়ে যা বড় গর্ব বড় অহংকার।

এই স্কুলের শিক্ষার্থী যিনি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এমপি পদে জয়যুক্ত আছেন ঠাকুরগাঁও জেলার আলোকিত সাত নক্ষত্র আলহাজ্ব দবিরুল ইসলাম, তিনি সব সময় সব সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের উন্নয়নে সদা সজাগ। অসুস্থতার কারণে তিনি প্রধান অতিথির আসনে আজকের রত্ন সভায় আসতে পারেননি। তবে মুঠোফোনে জানান, “লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় আমার প্রাণের বিদ্যালয়- আমি আছি আমি থাকবো একশো বছর পূর্তির সফলতায়।”

লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একশ বছর পূর্তি উৎযাপন প্রস্তুতিমূলক সভা

প্রস্তুতিমূলক সভায় বক্তব্য রাখছেন, লেখক জুঁই জেসমিন

শুধু দেশ নয় বিশ্বের ইতিহাসে স্বাক্ষর করার মতো এই স্কুলের সুনাম ও ফলাফল। দেশে বিদেশে এই স্কুলের শিক্ষার্থী প্রথম শ্রেণী পদে নিযুক্ত। লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়টি আমরা নিঃসন্দেহে রত্নাগার বলতে পারি, তবে একটু পূর্ব ইতিহাস জানা অবশ্যই দরকার। সেকালের এক সু চিন্তাশীল উদার মনের মানুষ শ্যামা প্রসাদ রায় ওরফে বাচ্চা বাবু উদ্দীপনার ঝুড়ি নিয়ে বেশ কিছু মানুষের সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি দেখেন পুরো উপজেলা জুড়ে কোনো স্কুল নেই, শহরে গিয়ে পড়াশোনা করার মতো কারো ক্ষমতা নেই। বড় সমস্যা যোগাযোগের অভাব। যানবাহন নেই বললেই চলে। গরু গাড়ি, ঘোড়াগাড়ি পালকি এসব সে যুগের যানবাহন ছিলো মাত্র। তবে এসব জমিদারদের বাড়িতেই বেশি ছিলো। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে জমিদার শ্যামা প্রসাদ নিজে ৮৪ শতক জমির উপর স্কুলের নির্মান কাজ শুরু করেন। বাঁশের বাতা দিয়ে বেড়া ও টিনের ছাউনি দিয়ে তিনটি রুম তৈরি করেন। দুটি রুম ছেলে মেয়েদের ক্লাসের জন্য ও একটি শিক্ষক দের অফিস রুম। ১৯২০ সালের এই বিদ্যালয়টি এম,ই স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

সেকালের সিংহ ভাগ মানুষ পড়ালেখা কি মাধ্যমিক স্কুলে পড়াশোনা করা দরকার তা জানতো না। শ্যাম প্রসাদ নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিতা মাতা দের বুঝিয়ে বুঝিয়ে বাচ্চাদের পড়ালেখা করার জন্য, স্কুলে আসার জন্য রাজি করাতেন। দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে গড়ে তুলেছেন এই পাঠশালা। কোথায় শিক্ষিত মানুষ আছে তিনি তা ছুটে গেছেন, স্কুল নির্মাণ করলেই তো হবেনা, এতে ভাল শিক্ষকের প্রয়োজন। ছেলেমেয়ের শিক্ষাদানের জন্য, শিক্ষিত আদর্শ শিক্ষক ঠিক করেন।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বিদ্যালয়টি পরিবর্তন সাধন হয় ক্রমশ ১৯৬০ সালে বিদ্যালয়টি নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৬১ সাল হতে প্রথম এস,এস,এসি পরীক্ষা শুরু হয়। জমিদার রাম প্রসাদ একাই বিদ্যালয় গড়ার যোদ্ধা ছিলেন না, তাঁর উৎসাহ উদ্যোগে এগিয়ে আসেন, ওসমান গণি, ডাঃ ইদ্রিস আলী, বাবু ভবানি চরন, বাবু ভবেশ চন্দ্র, ডাঃ দেরেম আলী, তমিজ উদ্দিন আহমেদ ও নাজমুক হক সাহেবের সহযোগিতায় মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে সফল হোন। এই স্কুলে অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী বহু দুর থেকে এসে শিক্ষালাভ করে, এই কারণে স্কুলটির নামকরণ করা হয় লাহিড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়।

স্কুলের বর্ত্তমান অবস্থা:

স্কুলটি বর্তমানে দ্বিতল ভবন বিশিষ্ট -প্রধান শিক্ষক ও লাইব্রেরি কক্ষ সহ ২৫ টি কক্ষ পরিপূর্ণ পাকা, এ ছাড়া দূর দূরান্তের শিক্ষার্থীদের থাকার সুবিধার্থে ৫ টি কক্ষ ছাত্রবাস হিসেবে নির্মান করা হয়। মোট ছাত্র ছাত্রী ষষ্ঠ হতে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ১৩০০। প্রতি বছর অষ্টম শ্রেণী থেকে ৫/৭ জন শিক্ষার্থী গোল্ডেন প্লাস পেয়ে থাকে। এস এস সি ফলাফল এতো টাই ভাল বরাবরের মতো ঠাকুরগাঁও জেলার সব স্কুলের মধ্যে বেশ ভাল। গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে অসংখ্য রত্ন বের হয় এই স্কুল থেকে। আলোকিত হোক প্রাণের এ স্কুল- এটাই সবার কামনা, সফল হোক বিদ্যালয়ের একশ বছর পূর্তি আয়োজন।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

জেসমিন দীপা’র কবিতা ‘একেলা কথন’

একেলা কথন – জেসমিন দীপা   তোমাদের ওদিকটায় কি এমন সুন্দর ভোর ...