লাখো মায়ের আরতী

স্বপ্ন প্যাকেজ

হাসানুল কাদির :: স্বপ্ন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বপ্ন। জাতির পিতা- তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন। বাংলাদেশের অগণিত দরিদ্র মায়ের স্বপ্ন। এই চার স্বপ্নকে সোস্যাল এসিসট্যান্স প্রোগ্রাম ফর নন এসেটার্স-‘স্বপ্ন’ প্যাকেজ কর্মসূচিতে একাকার করে দিয়েছেন মাতৃবন্ধু এএইচএম নোমান। বেসরকারি সমাজউন্নয়ন সংস্থা ডরপ ২০০৫ সালের ‘বিশ্ব মা দিবস’ উপলক্ষে প্রথমবারের মতো দেশে পাইলট আকারে দরিদ্র মাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতার যে কর্মসূচি শুরু করেছিল নিজেদের উদ্যোগে, সেই কর্মসূচিটি বর্তমানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সারাদেশে বাস্তবায়ন হচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এজন্য কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাতে কার্পণ্য করলে ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না। ধন্যবাদ অবশ্যই পাবেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি এমপিও। কারণ, এ কাজে তাদের আন্তরিকতাপূর্ণ সহযোগিতা দৃশ্যমান বাস্তবতা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ আরও অনেকে শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ভাতা ও স্বপ্ন প্যাকেজ উদ্যোগে সার্বিক সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানও মাতৃত্বকালীন ভাতার ভূয়সী প্রশংসা করে স্বপ্ন প্যাকেজ বাস্তবায়নে তাঁর আগ্রহ ও আন্তরিকতার কথা ব্যক্ত করেছেন। এতকিছুর পরও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, গত দুই বছর আগেই স্বপ্ন প্যাকেজ পাইলট আকারে সফল বাস্তবায়ন এবং এর ব্যাপক সুফল পাওয়ার পর আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রণয়ন হচ্ছে, তাতেও স্বপ্ন প্যাকেজ বাস্তবায়নে কোনো বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ার খবর মিলে নি। এ নিয়ে বেশ দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্বপ্ন প্যাকেজ সম্পদ সুবিধা পাওয়া দরিদ্র মায়েরা।

১ মে ২০১৯ মৌলভিবাজারের শ্রীমঙ্গলের স্বপ্ন প্যাকেজ সম্পদ পাওয়া বেশ কজন মায়ের বাড়িতে গিয়ে কথা হলো তাদের সঙ্গে। ছুটির দিনে অনেকটা পারিবারিক আলাপচারিতায় সন্ধ্যা রানি দাশসহ (৩২) আরও অনেকেই আনন্দে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। সরেজমিনে তাদেরমত অন্যদের যে করুণ ও কষ্টকর দৃশ্য দেখতে হলো, তাতে স্বপ্ন প্যাকেজ সুবিধাটি ওইসব দরিদ্র এলাকায় গরিব মায়েদের জন্য অনেকটাই স্বর্গীয় উপহার। সন্ধ্যা রানি তো বলেই ফেললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই আমাদের অবস্থা জানেন না। তিনি জানলে আমাদেরমত অন্য সকল মাদের অবশ্যই স্বপ্ন প্যাকেজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতেন। এই লেখার সময় মজিবনগর থেকে স্বপ্ন প্রাপ্ত মা সালমা বেগম জানালেন, ‘আমাদের আর কত ধৈর্য ধরতে হবে?’

দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় দারিদ্র্য বিমোচন, দরিদ্রদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, মর্যাদা বৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য গঠন, শিক্ষা, বাসস্থান নিশ্চিতকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, মা ও শিশু মৃত্যুহার হ্রাস করণে মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত সরকারিভাবে চিহ্নিত দরিদ্র মায়েদের নিয়ে ‘দারিদ্র্য বিমোচনে মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মাদের জন্য ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কর্মসূচি দেশের ১০টি উপজেলায় ইতিমধ্যে পাইলট আকারে বাস্তবায়ন হয়েছে।

সোস্যাল এসিসট্যান্স প্রোগ্রাম ফর নন এসেটার্স-‘স্বপ্ন’ প্যাকেজ কর্মসূচিটি নারীর ক্ষমতায়নে সরকারের গৃহীত কর্মসূচিসহ বিশেষ দারিদ্র্য বিমোচন উদ্যোগ। এটি মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত মা-বাবা-শিশু কেন্দ্রিক পাঁচ ভিত্তি সম্বলিত একটি সমন্বিত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যক্রম। মাতৃত্বকালীন ভাতাপ্রাপ্ত প্রতিটি পরিবারের জন্য ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ এর ৫টি ভিত্তি হলো : ১. স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্ড। ২. শিক্ষা ও বিনোদন কার্ড। ৩. স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিনসহ একটি গৃহ। ৪. জীবিকায়ন সরঞ্জাম। ৫. কর্মসংস্থান সঞ্চয়, গাছ লাগানসহ প্রয়োজনে উন্নয়ন ঋণ প্রদান করা।

বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় বসবাসরত অধিকাংশ মানুষই দারিদ্র্য পীড়িত। এদের মধ্যে মহিলাদের অবস্থা আরও শোচনীয়, বিশেষ করে দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের। বর্তমানে মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্যের ধারণা শুধু মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মাতৃস্বাস্থ্য যত্নের  বিষয়টি মানবাধিকার ও নৈতিকতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কীয় বলে এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গ্রাম অঞ্চলের দরিদ্র গর্ভবতী মায়েদের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার উদ্দেশ্যে সুস্থ সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রত্যাশায় সরকার ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে দেশে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ প্রদান কর্মসূচির সূচনা করে।

দরিদ্র মায়েদের মাতৃত্বকালীন অধিকার সংরক্ষণে স্বাস্থ্য শিক্ষাসহ গর্ভকালীন সেবা, প্রসবোত্তর সেবাসহ নিজ ও সন্তানের পুষ্টি খাদ্য খরচ বাবদ একজন মা ৩৬ মাস ভাতা পাচ্ছেন। প্রথম দিকে প্রতি মাসে তিন শ টাকা দিয়ে শুরু করলেও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার এ ভাতার পরিমাণ ৮০০/- টাকায় উন্নীত করেছে। মেয়াদকাল ২ বছর থেকে বাড়িয়ে তা ৩ বছর করেছেন। সন্দেহ নেই, এই ভাতা-দরিদ্র মা ও শিশু মৃত্যু হ্রাস, মাতৃদুগ্ধ পানের হার বৃদ্ধি, গর্ভাবস্থায় উন্নত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ বৃদ্ধি, প্রসব ও প্রসবোত্তর সেবা বৃদ্ধি, ইপিআই ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের হার বৃদ্ধি, যৌতুক তালাক ও বাল্যবিবাহ প্রবণতা রোধ সর্বোপরি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অবদান রাখছে।

মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কার্যক্রম মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারা দেশে বাস্তবায়ন করছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ‘মাতৃত্বকালীন ভাতা’ ভোগীর সংখ্যা ছিল ৬ লাখ।

উল্লেখ্য, ২০০৮-০৯ সালে র্ডপ দেশের উপকূলীয় চর এলাকা লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি, কমলনগর ও সদর, নোয়াখালী জেলার চাটখিল, গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ৯৯২ জন মা ও তার পরিবারকে স্বপ্ন প্যাকেজ প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারিভাবে সারা দেশে এই স্বপ্ন প্যাকেজ উন্নয়ন মডেলটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর দেশের সাতটি বিভাগের ১০টি উপজেলায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাস্তবায়ন করে।

ডরপ এ কাজের সমন্বয় ও সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করে। স্বপ্ন প্যাকেজ বাস্তবায়ন হয়েছে ঢাকা বিভাগের টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ) ও কালিগঞ্জ (গাজীপুর), চট্টগ্রামের চাটখিল (নোয়াখালী) ও রামগতি (লক্ষ্মীপুর), রাজশাহীর সিংড়া (নাটোর) ও বদলগাছি (নওগাঁ), সিলেটের শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), খুলনার মুজিবনগর (মেহেরপুর), বরিশালের দৌলতখান (ভোলা) এবং রংপুরের উলিপুর (কুড়িগ্রাম)।

স্বপ্ন প্যাকেজের উদ্ভাবক ও ডর এর প্রধান এএইচএম নোমান বলেন, ‘স্বপ্ন প্যাকেজ’ কর্মসূচিটি দেশের ধারাবাহিকতা ও পরিচালিত সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে অন্ত:ত ১০০টি উপজেলায় বাস্তবায়ন হলে ভালো হয়। আশা করি, এ বাজেটেই তা অন্তর্ভুক্ত হবে।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

লক্ষ্মীপুর-রায়পুর-চাঁদপুর ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কে

সড়ক নয় যেন ক্ষেত!

জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: লক্ষ্মীপুর-রায়পুর-চাঁদপুর ব্যস্ততম আঞ্চলিক মহাসড়কের সংস্কার কাজটি ...