দখলকৃত জমিতে তৈরি ঘর

বিশেষ প্রতিনিধি:: লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলাধীন ১৮ নং কুশাখালী ইউনিয়নের ফরাশগঞ্জ গ্রামে অভিনব কায়দায় জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের বিরুদ্ধে। ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি করিমের নেতৃত্বে ১৭ তারিখ গভীর রাতে দখলকৃত জমিতে ঘর তুলে যুবলীগের জেলা নেতার ছবি সংবলিত ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছে। জমির মালিকের বিরুদ্ধে ভাড়াটে লোক দিয়ে মিছিল করানোসহ ভূঁইপোড় অনলাইনে টাকা দিয়ে নিউজ করারও অভিযোগ করেছেন জমির প্রকৃত মালিক দাবিদার স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লাল। এ ঘটনায় চন্দ্রগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন জিল্লালের ভাই ইউসুফ। অভিযোগ নং এসডিআর-৪২০। নিজের নিরাপত্তা ও জমি দখলমুক্ত করার জন্য প্রশাসনের কাছে সহযোগীতা চেয়েছেন তিনি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে জমির প্রকৃত মালিক দাবিদার স্থানীয় বাসিন্দা জিল্লাল অভিযোগ করে বলেন, রাতের অন্ধকারে ফরাশগঞ্জ বাজারে আমার মালিকানাধীন জমিতে ঘর তুলেছে সফি মেম্বারের ভাতিজা ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা করিম ও তার সহযোগীরা। তাদের মনে যখন যা চায় তারা দলবল নিয়ে সেটি করে পুরো এলাকাকে জিম্মি করে রেখেছে। এদের হাত থেকে এলাকাবাসীকে মুক্ত করার জন্য প্রশাসনের কোন উদ্যোগ নেই।

আমি ও আমার ভাইয়েরা একদশক আগে ফরাশগঞ্জ বাজার সংলগ্ন ১৪ শতাংশ জমি চরজাঙ্গালীয়ার বাসিন্দা মমিনুর রহমানের কাছ থেকে কিনেছি। ডিয়ারা দাগ নং ১৩৫ ও ৪৮৬। তারপর চাষাবাদ করতে ইজারা দিয়েছি বাজারের চা দোকানদার ইব্রাহীমকে। আমার ভাইয়েরা বিদেশ থেকে কষ্ট করে টাকা পয়সা রোজগার করে। কষ্টের টাকায় জমি কিনেছি আর তারা রাতের আধারে আমার দুইশতক জমি দখল করে ঘর তুলেছে।

জিল্লালের ভাই ইউসুফ বলেন, যুবলীগ নেতা করিম তার ভাই শহীদ, সুমন ও সহযোগী ইব্রাহীম, জহির, কালামিয়া কালা, জাহাঙ্গীর ইউসুফসহ আরো অনেককে নিয়ে হঠাৎ করে জমি দখল করেছে। এ সময় তাদের হাতে লাঠিসোটা ও বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল বলে পরদিন শুনেছি। অন্য জায়গায় আগে ঘর বানিয়ে রেখে সেটি এনে আমার জমিতে বসিয়ে দখল করেছে রাতের অন্ধকারে। পরদিন সকালে খবর পেয়ে এসে দেখি ঘরের ভেতরে যুবলীগের জেলা নেতা সালাউদ্দিন টিপুর ছবি দিয়ে ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়েছে। আমি জানি না যুবলীগের নেতা টিপু কি অন্যে জমি দখল করে ঘর তোলার জন্য তাদের হুকুম দিয়েছেন? আমিতো জানি টিপু এমন আন্যায়কারীদের কখনো প্রশ্রয় দেন না। এরা তার নাম বিক্রি করে এইসব অন্যায় করে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, জমিতে ঘর কেন তুলেছে জিজ্ঞেস করতে গেলে তারা আমার ভাইয়ের গায়ের দিকে তেড়ে আসেন মারতে। তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে এবং বিভিন্ন হুমকি ধমকি দেয়। পরে চন্দ্রগঞ্জ থানায় গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি আমরা। পুলিশ ঘটনাস্থালে আসে এবং স্থানীয় মেম্বার সফি উল্লাকে ঘটনার সমাধান করতে বললে তিনি বলেন তারা জিল্লালের জমিতে ঘর তুলেছে আমাকে না জানিয়ে এবং তারা আমার কথা শুনে না।

স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে তাদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে নারাজ। যাকেই জিজ্ঞেস করি সবাই বলে আগে বলেন আমাদের নাম কোথাও প্রকাশ করবেন কিনা? নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি বলেন, আপনারাতো এসেছেন, যা দেখেছেন সবই সত্য। কথা বললে জীবন থাকবো না ভাই। এদের সাথে কেউ পারে না। আজকে এর জমি দখল করে, কাল আরেকজনের জমি দখল করে। পরশু টাকার দরকার হলে আরেকজনের জমির মাটি বিক্রি করে দেয় গায়ের জোরে। কথা বললে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বলেন, এলাকাতে কি এদের জন্য কোন বিচার আচার আছে? তারাই দখলদার তারাই আবার বিচারক। সামনে ঈদ এসেছে তারা এখন যার কাছ থেকে যেভাবে পারে চাঁদা তোলার পায়তারা করতেছে। না হয় হঠাৎ করে জিল্লালের জমিতে ঘর তোলার কোন মানে হয়। চাদা দিলে রাতের অন্ধকারে যেভাবে ঘর তুলেছে, সেভাবে আবার সরিয়ে নিবে।

ফরাশগঞ্জ বাজারের সাধারণ সম্পাদক এই ঘটনা সম্পর্কে কিছু বলতে চাননি। তবে বাজারে জমি দখল করে ঘর তোলা নিয়ে বিষ্মিত হয়েছেন ফরাশগঞ্জ বাজারের দোকানদারেরা। একাধিক দোকানদাররা বলেন, সকালে বাজারে এসে দেখি নতুন ঘর। সাংবাদিককে উল্টো প্রশ্ন করে দোকানদাররা বলেন, প্রকৃত জমির মালিকরাতো দিনে ঘর তোলে রাতে না। তারা যদি জমির মালিক হতো তাহলে রাতের আধারে কি ঘর তুলতো?

ঘটনার বিস্তারিত জানতে অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা করিমের সাথে বার বার যোগাযোগ করেও কোন বক্তব্য নেয়া সম্বব হয়নি। তবে অভিযুক্ত করিমের বড় ভাই কলেজ শিক্ষক আবদুস শহীদ বলেন, যে জমিতে ঘরটি তোলা হয়েছে, সেটি খাস জমি, ব্যক্তি মালিকানাধীন কোন জমি নয়। এখানে যুবলীগের অফিস করা হলো। ঘর তোলার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। কেউ বাধা দিতে আসেনি।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা মাইন উদ্দিন মানু বলেন, জিল্লাল এই জমির মালিক নয়, সে জোর করে এই জমি নিজের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। তাহলে জমিটির প্রকৃত মালিক কে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন সেটিতো জানি না। তবে সে অনেকের জমি নিজের নামে রেকর্ড করে নেন মাঝে মধ্যে। এভাবে অনেক জমির মালিক হয়েছেন।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা, নুরুল হুদা বলেন, সে এলাকাতে জমি দখলের মাধ্যমে অশান্তির সৃষ্টি করে। সে আমার জমিতেও বেজাল লাগিয়ে দিয়েছে।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মৃত আমিন উল্লার স্ত্রী হাসিনা বেগম বলেন, মিথ্যা মামলা করে জিল্লাল আমার জমি নিজের নামে নিয়ে গেছে। একই অভিযোগ করেছেন, মারজাহান, আম্বিয়া আক্তারসহ আরো অনেকে। তবে উদ্ধুত সমস্যা নিয়ে ঘটনাস্থলে তারা কেন এসেছেন সেটি জানতে চাইলে প্রত্যেকেই বলেন তাদের যুবলীগ নেতা করিম নিয়ে এসেছে সরকারি টাকা দিবে বলে, কিন্তু এসে দেখেন অনেক মানুষ।

অভিযোগের বিষয়ে জিল্লাল বলেন, দেশে আইন আদালত আছে, এটাকি মগের মুল্লুক যে চাইলেই একজনের জমি আরেকজনে নিয়ে যেতে পারে। যার অভিযোগ সে আইনের দ্বারস্থ হোক।

দখলকৃত জায়গার পাশের দোকানদার ইব্রাহীম মাঝি যিনি দখলকৃত জমিটি এতদিন বর্গা করছিলেন।  তিনি বলেন, ২০ বছর ধরে আমি এখানে দোকানদারি করি, কিন্তু এখন শুনি আমার দোকানের পাশে জিল্লালের জমি আরো আছে।  তিনি কি নিজের ভিটায় দোকান করেন, নাকি ভাড়া জায়গায় দোকান করেন, এমন প্রশ্নে তিনি হেসে দিয়ে বলেন, এইসব জানতে চান কেন। আমি যা বলি তা লেখবেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে বিগত ২০ বছর ধরে প্রভাবশালী এই চক্রের সহযোগীতায় বাজারের সরকারি মাছহাঁট পুরোটাই একা দখল করে দোকানদারি করছেন ইব্রাহীম মাঝি। একসময় সেখানে মাছের বড় বড় দোকান বসলেও তাদের সরিয়ে দিয়ে সেই জায়গা অবৈধভাবে একাই দখল করে রেখেছেন তিনি। পুরো বাজারটাই দখল করে রেখেছেন ইবরাহিম মাঝিদের মতো কয়েকজন।

জিল্লালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া স্থানীয় বাসিন্দা মাইন উদ্দিন মানু একজন চিহ্নিত অপরাধী এবং খারাপ প্রকৃতির লোক বলে জানিয়েছেন তার শ^াশুড়ি ও ছেলেমেয়েরা। তার শ^াশুড়ি বলেন, আমাকে বেশ কয়েকবার পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে আমার জামাই। কথায় কথায় আমার আমার মেয়ের নাতি-নাতনিদের গায়ে হাত তোলে। কারো কোন কথা শুনে না। কারো কাছে বিচার পাইনি। আমার কোন ছেলে না থাকায় আমি তার কাছে জিম্মি। কিছু দিন আগে প্রতিবেশির সাথে মারামারির মামলায় জেল খেটে এসেছে। তারে টাকা দিলে সে যে কারো বিরুদ্ধে মিথ্যে কথা বলতে পারে।

এ বিষয়ে কুশাখালী ইউপি চেয়ারম্যানকে ফোন দিলে তিনি বলেন কেউ অভিযোগ করেনি আমার কাছে। অভিযোগ দিলে বিষয়টি খতিয়ে দেখবো।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যাওয়া পুলিশ সদস্য মফিজ উল্যাহ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি জোর করে আরেকজনের জায়গায় ঘর তোলা হচ্ছে। আমি কাজ বন্ধ করে দেই এবং স্থানীয় মেম্বারকে সমাধানের করতে বলে এসেছি। তারপর কি হয়েছে আমাকে আর জানানো হয়নি।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here