রোহিঙ্গা সমস্যা ডোরিয়ানের চেয়েও ভয়ংকর

জুঁই জেসমিন :: দু’হাতের স্পর্শে যদি করতালি না হয় তবে দু’দেশের সুনীতি একমত ছাড়া সমস্যা সমাধান বা জয় অসম্ভব। যে দেশে এতো অন্ধ, এতো পঙ্গু, এতো অসহায় নিপীড়িত মানুষ – নিত্য দিনের পাঠশালা যাদের স্টেশন। কবি সুকান্তের কবিতার মতো ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যাদের কাছে ঝলসানো এক রুটি-পেটের তাগিদে হাজারো মানুষ যেখানে করে সংগ্রাম স্বাধীনতার মৃত্তিকায়, সে দেশে সাড়ে এগারো লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়। তাও আবার দেশের ভারসাম্য নষ্ট তথা পাহাড় কেটে প্রকৃতির অরূপ সৌন্দর্য নষ্ট করে তাদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া । বাংলাদেশ লাখো লাখো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্বের মাঝে ঝরেছে বিপুল প্রশংসার ঝড়।
রোহিঙ্গারা এ দেশে আসার দু’বছর হয়ে গেল। বিশ্ব প্রশংসিত ইস্যু রেখায় আজ জাতীয় সমস্যা বিরাজমান। মিডিয়া গুলো ব্যস্ত-তর্ক বিতর্ক যুক্তি উক্তি, টক শো, গোল টেবিল, লাইভ, টক টেবিল, তৃতীয় মাত্রার আলোচনা সমালোচনার ঝড়োমেঘে। সমাধান কোথায়, কবে, কিভাবে?
মানবিকতার সুযোগ পেয়ে চলছে কূটকৌশল। কক্সবাজারবাসী বড় হতাশ বড় অতিষ্ঠ রোহিঙ্গাদের উদ্ভট আচরণ ও হিংস্রতার ছোবলে। যুবলীগ নেতা ওমর ফারুখের প্রাণ গেল রোহিঙ্গাদের হাতে। এলাকার যুবসম্প্রদায় নষ্ট, ধ্বংস হচ্ছে রোহিঙ্গাদের সঙ্গলাভে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে পাওয়া গেছে পাঁচ লাখ সিম কার্ড ও অসংখ্য দেশীয় অস্ত্র। কারা এসব দিচ্ছে তাদের হাতে তুলে? কিশোর তরুণ জড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা ব্যবসায়। অনেক রোহিঙ্গা নারী হোটেল মোটেল বিভিন্ন আবাসিকে দেহ ব্যবসায় লিপ্ত। ছড়িয়ে পড়ছে- এইচ, আইভি এইডস। চলছে ইয়াবার তুমুল ব্যবসা, যা প্রথম ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকেই। রোহিঙ্গা যুবকেরা এ ইয়াবা ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তারা নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেরাই হয় খুনাখুনি।
একটু ভেবে দেখুনতো মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের কেন ফিরিয়ে নিতে নারাজ, যেখানে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মহা কষ্ট কাঠিন্যতায় ভুগে সেখানে বাংলাদেশ একটি ছোট্টদেশ জনবহুল দেশ, এতো সংখ্যক রোহিঙ্গার দায়িত্ব ভার কী করে নেবে? এতো ক্ষতির পর আর কতটুকু মানবিকতা দেখানো যায় ? মানবিকতা আজ আশীর্বাদ নয় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের মাঝে না আছে সভ্যতা না আছে মানবিকতা। যেখানে নিজের স্থায়িত্ব নাগরিকত্ব নেই শরণার্থী শিরোনামে চলছে জীবন সেখানে রোহিঙ্গা নারী ৭০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা। আর দু বছরে প্রায় ৯১ হাজার শিশু করেছে জন্মগ্রহণ। তাদের চিন্তাভাবনা বলতে কি কিছু আছে? আছে মাত্র বিনোদন। যেখানে নিজের জীবনের ভিত্তি নেই সেখানে করছে সন্তানচাষ। খুন ধর্ষণ ও অবৈধ ব্যবসা করা এই রোহিঙ্গাদের ধর্ম। তা না হলে যে দেশে আশ্রয় আজ সে দেশের মানুষকে খুন করে বসতো না, করতো না মারামারি, হাটে, মাঠেঘাটে জবরদখল বাহাদুরি। ইয়াবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেশায় আসক্ত করতো না এলাকার স্বর্ণময় কিশোর তরুণদের।
এরা দিন দিন ফুঁসে উঠছে, বনভূমি নষ্ট করছে গাছ কেটে, পাহাড় কেটে ভারসাম্যহীন করে তুলছে দেশ। গড়ে উঠছে গ্যাং কালচার, করছে সমাবেশ, করছে বিক্ষোভ। যেখানে সাড়ে এগারো লাখের অধিক রোহিঙ্গা সেখানে ফেরত নিতে চায় প্রথমত সাড়ে তিন হাজার, বাইশ তারিখ পেড়িয়ে গেল। একাধিক কারণ, নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব না পেলে নিজ দেশে ফিরতে নারাজ রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গারা দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে, দ্রুত এর সমাধান না হলে দেশের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, চরম দুর্যোগ বয়ে আসতে পারে তা বুঝার অপেক্ষা রাখেনা। মানবিকতার চিবুকে বিশ্ব প্রশংসা আজ মহামারি ডেঙ্গুর চেয়েও প্রাণ নাশক হয়ে জন্ম নিচ্ছে এই রোহিঙ্গা।
বাংলাদেশ অঙ্গীকারাবদ্ধ, জোর করে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো হবে না। এটাই মিয়ানমার ও চীনের স্বস্তির বড় ঢেকুর। আর রোহিঙ্গারাও কোমরে গামছা বেঁধে স্থায়িত্বের খুঁটি গাড়তে সদা প্রস্তুত যেন। চীন এ খেলার মূল দাবাড়ু কারণ চীনের সাথে মিয়ানমারের শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক না দহরম-মহরম বন্ধুত্বও বটে। এক দেশ আর এক দেশের সাথে ভাল বন্ধুত্ব থাকাটা মন্দ নয়, বেশ ভাল।
রাশিয়া, জাপান, ভারত, চীন মায়ানমার বাংলাদেশ যে দেশেই হোকনা কেন, বাণিজ্যিক লেনদেন সম্পর্কের সাথেও একে ওপরের সমস্যা সমাধানে- ভাই ভাই হিসেবে এগিয়ে আসতে হবে- এমন প্রকট সংকটে কোনো দেশই শান্তিশৃঙ্খল নিন্দামুক্ত ভাবে চলতে পারেনা। সমাধানের চাবিকাঠি মিয়ানমারের কাছে, মিয়ানমার যদি চান তবেই সব সম্ভব। দল মত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, দেশ আমাদের, দেশকে সুন্দর স্বপ্নিল করার দায়িত্ব সকলের।
এ রোহিঙ্গা সমস্যা আমাদের সকলের সমস্যা -একটু দেশের বাস্তব চিত্র দেখুন ভাবুন, দেশের মানুষ কে কোন অবস্থায় আছে -? বলুনতো কোন এলাকায় অসহায় প্রতিবন্ধী বা অসহায় পাগল নেই? যা হাটে বাজারে ছেঁড়া কাপড় পরে জোটলা বাঁধা চুলে, পড়ে থাকে না? শহরে গ্রামে গঞ্জে এমন অসংখ্যক অসহায় মানুষ আছে- রেল লাইন, অভার ব্রীজ, আন্ডারগ্রাউন্ড, মাজার, রাস্তারধার, খোলামাঠ যাদের আশ্রয়স্থল, নেই কোনো বসতবাড়ি?
এক হাতে লাঠি এক হাতে থালা নিয়ে রোজ ওই এক ছড়া গান ” দুটো ট্যাকা দাও মা বোন বাবারা, দু’ টো ট্যাকা দাও! ” গাড়িতে বা ট্রেনে অগণিত ভিক্ষুক, সাহায্যকারী, -চিকিৎসা অপারেশন বা ক্ষুধা নিবারণের জন্য হাত পাতে টাকার জন্য যাত্রীদের কাছে। যা কারো অজানা বা অদেখা নয়। রংপুর মেডিকেল চত্তরে এক ছোট্ট ছেলে হাতে থালা ধরে মাটিতে শুয়ে রোদে ছটপট করে! যার দয়া হয় দু চার টাকা দিয়ে যায়! রংপুর কাচারি বাজারে প্রায়ই এক বয়স্ক মহিলাকে দেখি -হাত পা বোধ হয় জন্মগত ছোটো! হাত ও নিতম্বে ভর দিয়ে চলে,আর সাহায্য চায়, সত্যিই অসহনীয় কষ্ট!
ঢাকা টাউন হলে এক লম্বা পাগল প্রায়ই রাস্তার ধারে দাঁড়াই থাকে- সারা শরীরে এক টুকরো কাপড় নেই, একেবারে উলঙ্গ! চোখ দুটো বেশ শান্ত, যেন কোনো কষ্ট নেই চাওয়াপাওয়া নেই! অদ্ভুত মায়ায় শহরের মানুষজনকে দেখে! ক্ষুধা পেলে হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বিশিষ্ট সমাজ সেবকদের চোখে পড়ে কি না জানিনা! প্রযুক্তির ডানায় ভর করে যে যার মতো উড়ছি ব্যক্তি স্বার্থের দৌড়ে। কাউকে দেখার সময় নেই কারো! ব্যাঙেরছাতার মতো আজ দেশে সাংবাদিক, এদের বেশির ভাগ কান খাড়া করে বসে থাকে কোথায় খুন হচ্ছে, কোথায় ধর্ষণ হচ্ছে গরম তাজা শিরোনাম করার জন্য।
সরকার মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসা সব কিছুর সুযোগ করে দিয়েছেন, সুবিধা বঞ্চিত মানুষদের জন্য। তারপরও অনেকে এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আজ যাদের বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কথা, ফ্রি চিকিৎসা পাওয়ার কথা, এমন প্রত্যেকে কি পাচ্ছে? পাচ্ছেনা। প্রিন্ট মিডিয়া ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা এই অসহায় মানুষদের করুণ চিত্র ইচ্ছে করলে সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারেন তাঁদের পেশার মাধ্যমে। রোহিঙ্গা দেশের প্রকট সমস্যা, বিভিন্ন দেশি বিদেশী সহ ১৩৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার কর্মীরা দয়ার ঝুলি খুলে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণ করছে। বিভিন্ন রকম সাহায্য সহযোগিতা পাওয়ার প্রলোভনে রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চাচ্ছেনা আজ।
রোহিঙ্গাদের ঘর নেই, জমি সেনা ও চীনের দখলে। নেই নাগরিকত্ব। এই অবস্থায় রোহিঙ্গারা কি করে রাখাইনে ফিরে যাবে? এনজিও সংস্থা গুলো সবাই একজোট হয়ে এভাবে বার বার তাদের খাদ্যবস্ত্র বিতরণ না করে মিয়ানমার সরকারের সাথে বসে সে দেশে তাদের থাকার ব্যবস্থা, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করুন হাতে হাত মিলিয়ে। রোহিঙ্গা সমস্যা নির্মূল হোক তারা ফিরে যাক নিজ দেশে, তারা পাক নাগরিকত্ব এ ব্যবস্থার জন্য একমত পোষণ করুন দেশি বিদেশী প্রত্যেকে। আমাদের বড় স্বভাব পরনির্ভরশীলতা ও অসচেতনতা, এতে তৈরি হচ্ছে নানান সমস্যা। একে অপরের প্রতি সন্দেহ যেন জাতীয় রোগ। নিজ দেশের এক দল আর এক দলের মধ্যে বিরোধ থাকলে, সন্দেহ প্রবণতা থাকলে, উসকানি মূলক কথা বললে, বাহিরের মানুষ সুযোগ নিয়ে বসবে এটাই স্বাভাবিক।
শুধু মাত্র মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া যদি সরকারের চরম অপরাধ হয়ে থাকে নিজ দেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করার পরও, তাহলে মানবতা, মূল্যবোধ, মনুষ্যত্ব, বিবেক এ শব্দগুলি বাংলা অভিধানে থাকার প্রশ্নই আসেনা। একাত্তরের যুদ্ধে ততকালীন ভারত সরকার আমাদের কত শত মা বোন ভাইকে আশ্রয় দিয়েছিলেন! সেদিনের ভয়াবহতা, নির্মমতা, ইতিহাস স্বাক্ষরিত।
ক্ষুধার্ত মানুষ যেমন বুঝে ক্ষুধার জ্বালা, ঠিক আশ্রয়হীন, নিরাপত্তাহীন ব্যক্তি বুঝে যুদ্ধের ময়দানে লাখো মানুষের অসহায়ত্বের কথা। মিয়ানমার এক শক্তিশালী সম্পদশালী দেশ, যার রাজনৈতিক ক্ষমতা চলে সেনাবাহিনীর গুটি ছক্কায়– রোহিঙ্গাদের বিশাল সমাবেশের পিছনে আছে বড় রহস্য। নেপথ্যে শক্তি সাহস উৎসাহ ছাড়া এ সমাবেশ করা অসম্ভব। তাদের সমাবেশের পিছনে জোরদার অপশক্তি কঠিন ভাবে ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, কূটনীতি কূটকৌশলে দেশ ও জাতিকে বিভ্রান্তে বিপদে ফেলাতে মড়িয়া যেন।
যাহোক সমস্যা না তৈরি করে সমাধানে আসুন শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হিসেবে, মানবতাবাদী হয়ে- রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায়, রাখাইনে ফিরে যাওয়ার মতো না। তাই আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের আদি নিবাসে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা জরুরী ভাবে দ্রুত নিতে হবে। যাতে একসাথে একদিনে সকল রোহিঙ্গা ফিরে যেতে পারে নিজ দেশে। সদা মঙ্গল প্রদীপ জ্বলুক সব দেশে সবার অন্তর প্রান্তরে।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী।
Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

নীলিমা শামীম’র কবিতা ‘ভোরের শিশির’

ভোরের শিশির – নীলিমা শামীম   শিশির ভেজা দূর্বাঘাসে মন ময়ুরি হাঁসে, ...