রেহানা বীথি

রেহানা বীথি :: ঝিরিঝিরি বাতাস। ছোট ছোট ঢেউ উঠছে হাওড়ের জলে। দুলছে ছোট্ট ডিঙি। ডিঙির ওপর দেহটাকে একেবারে ছেড়ে দিয়ে দু’হাত ছড়িয়ে শুয়ে আছে কঙ্কা। ওর নীল শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উড়ে লুটিয়ে পড়ছে জলে। ভিজে যাচ্ছে। ভিজুক। এই মুহূর্তে ওর মতো সুখী কেউ নেই। ও চেয়ে আছে এই হাওড় আর জলে ভেসে থাকা ডিঙিতে ওর দেহের ওপর মেলে থাকা বিশাল আকাশের দিকে। ও ভাবছে, হাত বাড়ালেই স্পর্শ করতে পারবে ওই আকাশ। মেঘগুলো নেমে এসে ঢেকে দেবে ওকে। ওর সমস্ত কষ্টগুলোর অবসান হবে।

এই যে এভাবে হুট করে এক অজানা অচেনা হাওড়ে আমন্ত্রণ জানালো কিংশুক, কঙ্কা রাজিও হয়ে গেল, ওর একবারও ভয় করেনি। একবারও মনে হয়নি, যদি কোনও অঘটন ঘটে! এর নামই বোধহয় নির্ভরতা। কিংশুকের ওপর ভীষণভাবে নির্ভর করে ও। মাত্র ছয়মাস আগে বন্ধুত্ব গাঢ় হয় ওদের। তবে এই ছয় মাসেই একটু একটু করে তৈরি হয়েছে এই নির্ভরতা। ভেঙ্গে পড়া কঙ্কাকে একটু একটু করে গড়ে তুলেছে কিংশুক। সাহস দিয়েছে, একেবারে অতলে তলিয়ে যাওয়া কঙ্কাকে টেনে তুলেছে। তুলে এনে বসিয়েছে আলোর মুখোমুখি। যে আলো একটা সময় ভীষণ ভয় পেতো কঙ্কা। ভয় পেয়ে নিজেকে বন্দি করেছিল বদ্ধ ঘরের এককোণে।

কোথা থেকে যেন একদিন কিংশুক এল। বন্দি কঙ্কার বদ্ধ ঘরে এসে ওর বিছানায় বসে বলল,

“বন্ধু, আবারও বন্ধু হবে, খুব ভালো বন্ধু? আমার কোনও ভালো বন্ধু নেই।”

চোখের কোণে কালি আর বিস্ময় নিয়ে কঙ্কা কিছু বলেনি। শুধু তাকিয়েছিল। কী সুন্দর নির্মল ওর হাসি, আর কত সরল ওর চাহনি! কোনও পুরুষের চাহনি এত সরল হয়? এত নির্মল হাসি ছড়িয়ে দিতে পারে কোনও পুরুষ? কঙ্কার চোখে প্রবল অবিশ্বাসও ছিল। ওই চাহনি আর হাসির বিপরীত ছবিগুলো একে একে ভেসে উঠছিল ওর চোখের সামনে। ও চোখ বুঁজে ফেলেছিল। তারপর যখন চোখ বেয়ে নেমে এসেছিল তপ্ত নোনাজল, কঙ্কা অনুভব করেছিল, একটা হাত পরম মমতায় মুছিয়ে দিচ্ছে তা। খুব ধীরে ধীরে, আলতো করে ওই হাতের ওপর হাত রেখেছিল ও।

“দেখো দেখো, একদল বুনো হাঁস!”

কিংশুকের কথায় আকাশ থেকে চোখ ফেরালো কঙ্কা। দেখলো, সত্যিই তো, কী সুন্দর!

এই অচেনা হাওড়ে এসে কত সুন্দরের যে দেখা পেল ও! শহরের ইট কাঠের মধ্যে বেড়ে ওঠা কঙ্কা জানতোই না এসবের কথা। দু’পাশে এমনভাবে ঘন হয়ে ঝুঁকে আছে গাছপালা, যেন হাওড়ের জলকে আলিঙ্গন করতে চাইছে। মাঝে মাঝে দু’চারটে শাপলা ফুটে আছে। ডিঙি থেকে হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায় ওগুলো। ছুঁয়ে দেখছে কঙ্কা। ওকে ছুঁয়ে দেখতে দেখে কিংশুক বলল,

“নেবে? তুলে দিই?”

“নাহ্ থাক। জলেই সুন্দর ওগুলো।”

“হুম… যেমন তুমি…!”

কিংশুক আনমনে এ-কথা বলে শুয়ে পড়লো কঙ্কার পাশে। এতক্ষণ বসেই ছিল। হঠাৎ ওর শুয়ে পড়ায় অবাক হল কঙ্কা। অবাক হলেও কেন যেন ওর ভালো লাগছে ভীষণ। কিন্তু কেন ভালো লাগছে? কিংশুকের শরীরের স্পর্শ পেয়েই কী? ভেবে পেল না কঙ্কা। আগে যে একে অপরকে স্পর্শ করেনি তা তো নয়! কতবার হাতে হাত রেখেছে, বিষণ্ন কঙ্কা কখনও বা মাথাটাকে এলিয়ে দিয়েছে কিংশুকের কাঁধে। কতবার তো রিক্সায় পাশাপাশি বসে ঘুরতে বেরিয়েছে বিকেলে। তবে আজ কেন আলাদা লাগছে?

একহাতে মাথাটা ভর দিয়ে কঙ্কার দিকে ফিরে কিংশুক বলল,

“তোমার পাশে শুয়ে পড়লাম বলে রাগ করলে?”

একইরকমভাবে শরীরটাকে কিংশুকের দিকে ফিরিয়ে কঙ্কা বলল, “না তো!”

“তাহলে অমন আড়ষ্ট হয়ে আছো কেন?”

“কেন, কি করবো?”

“আমাকে জড়িয়ে ধরবে। ইচ্ছে করছে না তোমার?”

কোনও কথা না বলে প্রবল আবেগে কঙ্কা মুখ ডুবিয়ে দিলো কিংশুকের বুকে। তারপর… ওই বুকের বুনো গন্ধে হারিয়ে ফেললো নিজেকে।

 

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here