রূপগঞ্জে অপহরণ আতংকে ব্যবসায়ীরা ৬ দিনে ৫জন অপহরণের শিকার

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ব্যবসায়ীরা অপহরণ আতঙ্কে ভুগছে। ৬ দিনে অপহরণ চক্রের হাতে বন্দি হয়ে লাখ লাখ টাকা খুইয়েছে ৫ জন ব্যবসায়ী। আত্মসম্মানের ভয়ে অপহরণ চক্রের হাতে বন্দি হওয়ার পরও থানা পুলিশের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছেন তারা। আইন শৃংখলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ৫ ব্যবসায়ীকে গাড়িতে তোলার পর চোখ, মুখ, হাত-পা বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় অজ্ঞাত স্থানে।

গত ১ সপ্তাহে রূপগঞ্জের রূপসী, মৈকুলী, ভুলতা ও গোলাকান্দাইল এলাকা থেকে একটি চক্র ৫ ব্যবসায়ীকে অপহরণ করেছে। অপহৃত ব্যক্তিরা জানান, প্রথমে আইন শৃংখলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তাদেরকে সাদা রঙের মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অপহরণকারীদের আসত্মানায় নিয়ে,পেশাদার পতিতাদের সঙে উলঙ্গ ছবি ও ভিডিও চিত্র ধারণ করা হয়। নেওয়া হয় দেড়শ টাকার সাদা স্ট্যাম্পে স্বাড়্গর।

অপহরণের শিকার সোহেল মিয়া জানান আরো মুখরোচক ঘটনা। রূপসী এলাকার প্রিমা পস্নাজার গ্রামীন ফোন সার্ভিস সেন্টারের মালিক সোহেল মিয়াকে গত ২০ ডিসেম্বর বিকেলে রূপসী বাসষ্ট্যান্ড থেকে সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাসে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়া হয়। কিছু বোঝার আগেই তার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে চোখ, হাত-মুখ বেধে ফেলে। প্রায় এক ঘন্টা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় অপহরণকারীদের আসত্মানায়। পরে তার সাথে থাকা মোবাইল, মানিব্যাগ, টাকা, হাতঘড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার পর হাত-পা বেধে একটি অন্ধকার রম্নমে আটকিয়ে রাখে। আনুমানিক রাত ১০টার দিকে ৩ জন সুন্দরী মেয়ে এনে তার সামনে উলঙ্গ করা হয়। মেয়েদের সাথে ছবি তুলতে বললে সোহেল আপত্তি জানায়। এরপর শুরম্ন হয় অত্যাচার। বেদম পিটুনির পর বাধ্য হয়ে অপহরণকারীদের কথা মতো পতিতাদের সাথে ভিডিও চিত্র ধারণ ও ছবি তোলা হয়। ছবি কম্পিউটারে লোড করে দেখানো হয় তাকে। বলা হয় এইসব ছবি তোর এলাকা ও পরিবারের লোকজনদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। তাদের কথা মতো কাজ করলে কিছুই জানানো হবে না।

সোহেল আরো জানান, তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে তার স্ত্রী ও ভাইবোনকে ফোন করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আসতে বলে। প্রশাসনকে জানালে সোহেলকে হত্যার পর লাশ গুম করার হুমকি দেয়। ভয়ে ৩ দিন আটক থাকার পর তাদের কথা মতো ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করে মুক্তি পায়। অপহরণকারীরা তাকে হাত, মুখ, চোখ বেধে অপহরণকারীদের আসত্মানা থেকে রূপসীস্থ পৌর ভবনের সামনে নামিয়ে দেওয়া হয়। একই কায়দায় দুইদিন পর ২২ ডিসেম্বর গোলাকান্দাইল এলাকায় একটি ঔষধ কোম্পানীর মার্কেটিং ম্যানেজার জাহাঙ্গীর কবিরকে এশিয়ান হাইওয়ের গোলাকান্দাইল এলাকা থেকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে মাইক্রোবাসে তুলে একই কায়দায় হাত, পা, মুখ বেধে নিয়ে যায় আসত্মানায়। সেখানে জাহাঙ্গীর কবিরকে হাত-পা বেধে বেদম প্রহার করে। হুমকি দেওয়া হয় হত্যার। সাথে থাকা ৪০হাজার টাকা, মোবাইল, ঘড়ি ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পরে পতিতাদের দিয়ে বাধ্য করা হয় একই কায়দায় যৌন মিলনে। এই দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে দেখানো হয় তাকে। তারপর তোলা হয় একাধিক ছবি।

ঔষধ কোম্পানীর মার্কেটিং ম্যানেজার জানান, এসব ঘটনা ঘটার পর বলা হয় যদি আত্মসম্মান নিয়ে থাকতে চাস তাহলে ৫ লাখ টাকা দে। অন্যথায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে ভিডিও চিত্র। মেয়েকে দিয়ে করা হবে ধর্ষণের মামলা। ভয়ে আরো ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে সে তাদের কাছ থেকে ছাড়া পায়। বাকি টাকা ১ সপ্তাহের মধ্যে দেওয়া হবে এই শর্তে সে তার পরিবারের কাছে চলে আসে। অপহরণকারী চক্রের ভয়ে ওই দিনই ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে পরিবার নিয়ে অজ্ঞাত স্থানে চলে যায়। একই কায়দায় গত ২৩ ডিসেম্বর মৈকুলি এলাকা থেকে এক গার্মেন্টস ম্যানেজার মিজানুর রহমানকে অপহরণ করে নিয়ে যায় চক্রটি। তাকে জিম্মি করে পতিতা দিয়ে একই কায়দায় ঘটনা ঘটিয়ে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় দেড় লাখ টাকা। আবারো ফোন দিয়ে তাকে বাকি আরো ১ লাখ টাকা দাবি করছে অপহরণকারীরা। ভয়ে মিজানুর রহমান মোবাইল ফোন বন্ধ করে ভয়ে চলে গেছে নিজ এলাকা বরিশালের ভোলায়। গত ২৪ ডিসেম্বর একসাথে বিলস্নাল ও নবী নামক ২ পরিবহন ব্যবসায়ীকে করা হয় অপহরণ। রাতেই অপহরণকারীদের দাবীকৃত টাকা দিয়ে তারা এলাকায় এসে মানসিক বিপর্যসত্ম অবস্থায় দিন যাপন করছেন। অপহরণকৃত ৫ ব্যক্তি ভয়ে থানা পুলিশের কাছেও যাচ্ছেনা।

এদিকে একই চক্রের হাতে নাজেহাল হওয়া এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রূপগঞ্জ থানায় জিডি করেছেন। তার কাছ থেকে দেড়শ টাকার খালী স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেকে স্বাড়্গর নেওয়া হয়। সাথে থাকা ঘড়ি, ন্যাশনাল আইডি কার্ডসহ সব কিছু রেখে বাড়ি থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা নিয়ে পুলিশকে না জানানোর শর্তে দেওয়া হয় মুক্তি। ওইসব ব্যক্তিরা জানায়, প্রথমে প্রশাসনের কথা ও পরে তাদের আসত্মানায় নিয়ে পতিতাদের দিয়ে ছবি তুলে বস্নাকমেইল করা হয়। তাদের ধারণা যাত্রাবাড়ীর জুরাইন অথবা শনিআখরার কোন এক স্থানে একটি বাড়িতে তাদের আটক রেখে এই মহলটি এসব কুকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

তারা আরো জানায়, তাদের সাথে বিভিন্ন স্থান থেকে আরো একাধিক ব্যক্তিকে একই কায়দায় মুক্তিপন আদায় করছে। প্রতিটি ব্যক্তিই আত্মসম্মান ও সামাজিকতার ভয়ে প্রশাসনকে জানাতে ভয় পাচ্ছেন। এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ থানার ওসি মজিবর রহমান জানান, অভিযোগ পেলে আমরা অবশ্যই এ চক্রকে ধরার অভিযান চালানো হবে। ইতিমধ্যে একাধিক পুলিশ টিম লোকমুখে শুনে ছদ্মবেশে বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরম্ন করেছে।

ইউনাইটেড নিউজ ২৪ ডট কম/মাকসুদুর রহমান কামাল/নারায়ণগঞ্জ

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

মহাখালীর সাততলা বস্তিতে আগুন

ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীর মহাখালীতে সাততলা বস্তীতে আগুন লেগেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ...