রুগ্ণ বিমা খাতে স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে এখন ভাবনার সময়

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : জীবনে রোগ-শোক বা আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এর ফলে ভুক্তভোগীর চিকিৎসায় যে ব্যয় হয়, তা অনেক সময় বহন করা কষ্টকর হয়ে ওঠে। উন্নত বিশ্বে মানুষ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে স্বাস্থ্যবিমার ওপর নির্ভর করে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের মানুষের চিকিৎসার খরচ জোগাতে জীবনটাই শেষ হয়ে আসে।

চলমান করোনা বিপর্যয়ে স্বাস্থ্যবিমা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এর জন্য রুগ্ণ বিমা খাতের প্রতি সরকারের নজর দিতে হবে। আর বিমাতে সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে কাজ করতে হবে বিমাসংশ্লিষ্টদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা শেখ সারাক্ষণকে বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্যবিমার বিষয়ে খুবই পজিটিভ। মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে অন্যতম বিষয় স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা অনেক দিন ধরে অবহেলা করছিলাম। আমাদের দেশের মানুষের আয়ও অনেক কম, সে কারণে বিষয়টাকে অতটা সিরিয়াসলি নিতে পারে না।’

অধ্যাপক হাসিনা শেখ বলেন, উন্নত সব দেশেই স্বাস্থ্যবিমা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। ওই সব দেশে কারো স্বাস্থ্যবিমা নেই, এমনটা কল্পনা করা যায় না। তবে করোনা মহামারি এসে আমাদের বুঝিয়ে দিল স্বাস্থ্যবিমার গুরুত্ব কতটুকু।

‘মানুষ ব্যাংককে বিশ্বাস করে, কিন্তু ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে বিশ্বাস করে না। প্রথমে বিমার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে হবে। কোম্পানিগুলোকে বিশ্বস্ত হতে হবে’, বলেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ৭৯টি বিমা কোম্পানি সেবা দিচ্ছে। যার মধ্যে ৩৩টি জীবনবিমাকারী কোম্পানি এবং ৪৬টি জীবনবিমাবহির্ভূত কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জীবনবিমাকারী একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি ও নন-লাইফ বিমাকারী কোম্পানির একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি রয়েছে। আর বাকি ৭৭ বিমাকারী প্রতিষ্ঠান বেসরকারি মালিকানাধীন। এখানে খারাপ খবর হচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি কোনো বিমা কোম্পানিতেই ব্যক্তির স্বাস্থ্যবিমা চালু করার সুযোগ নেই। তবে কোনো কোনো কোম্পানি চুক্তিভিত্তিক কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা করিয়ে থাকে।

প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জালালুল আজিম সারাক্ষণকে বলেন, ‘হেলথ ইন্স্যুরেন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। করোনাকালে এর গুরুত্ব আরো বেড়েছে। কারণ, উন্নত দেশে ইন্স্যুরেন্স না থাকলে, প্রাইভেটে চিকিৎসাসেবা নেয়াই যায় না। আমাদের দেশে এককভাবে হেলথ ইন্স্যুরেন্স করার সুযোগ নেই। আমরা গ্রুপ বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের হেলথ ইন্স্যুরেন্স করে থাকি। এই মুহূর্তে কেউ চাইলে ব্যক্তিগতভাবে হেলথ ইন্স্যুরেন্স করার সুযোগ নেই। আমরা জানুয়ারিতে হেলথ ইন্স্যুরেন্স নতুন প্যাকেজ আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, স্বাস্থ্যবিমা হচ্ছে ব্যক্তির চিকিৎসা খরচ মেটানোর জন্য করা বিমা । স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ব্যয়ের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, একজন বিমাকারী বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবিমা গ্রহণ করতে পারেন, যেমন মাসিক প্রিমিয়াম অথবা পে রোল ট্যাক্স, যা বিমার চুক্তি অনুযায়ী তার স্বাস্থ্যসেবার জন্য জরুরি অবস্থায় চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় খরচ জোগাবে।

বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা না থাকায় দেশের মানুষের চিকিৎসা ব্যয় নিজেদের বহন করতে হয়। ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষ চিকিৎসা ব্যয়ের শতকরা ৬৭ ভাগ নিজেই বহন করে, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ। এতে ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তার পরিবার অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

স্বাস্থ্যবিমা সম্পর্কে সচেতনতা কঠিন সময়ে মানুষকে উপকৃত করে, পাশাপাশি আর্থিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। কিন্তু এটা সত্য, বাংলাদেশের জিডিপিতে জীবনবিমা খাতের অবদান মাত্র ০.৫ শতাংশ। সংখ্যার বিচারে যা খুবই নগণ্য। বেশ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে বিমা সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া মানুষের সংখ্যা কম। এর প্রধান কারণ, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, পুনর্বিমা, দাবি নিষ্পত্তিসহ কিছু বিষয়ে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হন। এসব কারণে বিমা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। এ ছাড়া সচেতনতার অভাব থাকায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি উপযোগী উপায় হিসেবে বিমাকে বিবেচনা করা হয় না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ সারাক্ষণকে বলেন, ‘বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষের হেলথ ইন্স্যুরেন্স সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। তবে করপোরেট হাউস ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কেউ কেউ কর্মীদের হেলথ ইন্স্যুরেন্সের আওতায় এনেছে। দেশের সব মানুষের হেলথ ইন্স্যুরেন্স দরকার। হেলথ ইন্স্যুরেন্স থাকলে অসুস্থ হলেও ইন্স্যুরেন্সের কারণে অর্থনৈতিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারি।’

সৈয়দ আবদুল হামিদ আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিমা ভালো অবস্থায় নেই। দুই দিকের সমস্যা আছে। কোম্পানিগুলো যে প্যাকেজ অফার করে, তা আকর্ষণীয় নয়। বিমার মেয়াদ শেষে টাকা পেতে গ্রাহককে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়, হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব কারণে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। চরম অনাস্থার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মানুষ মনে করে ইন্স্যুরেন্স মানেই ভাঁওতাবাজি। বিমা নিয়ে মানুষের যে অনাস্থা, এই জায়গা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শুধু ঢাকঢোল পেটালে হবে না, জনগণকে ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনতে হবে, সঠিক সময়ে সহজতর উপায়ে সুবিধা বুঝিয়ে দিতে হবে যে, ইন্স্যুরেন্স সিস্টেম কাজ করে।’

সৈয়দ আবদুল হামিদ জানান, ‘স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটসহ কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের হেলথ ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ হাজার শিক্ষার্থীকে হেলথ ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনার বিষয়ে পরিকল্পনা চলছে। তারা যদি সঠিক নিয়মে সুফল পায়, তাহলে এর ইম্প্যাক্ট সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়বে। মানুষের ভুল ধারণা ভেঙে যাবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে সৎ আচরণ করতে হবে।’

এ বিষয়ে ড. বিজন কুমার শীল সারাক্ষণকে বলেন, ‘অন্য দেশে সবার হেলথ ইন্স্যুরেন্স করা থাকে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। করোনা আমাদের যেভাবে শিক্ষা দিল, বাংলাদেশেও হেলথ ইন্স্যুরেন্স নিয়ে ভাবা উচিত।’

বিজন কুমার শীল বলেন, বাংলাদেশে হেলথ ইন্স্যুরেন্স নিয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। সরকারকে এটার নিশ্চয়তা দিতে হবে, দুঃসময়ে যাতে অসুস্থ মানুষ তার ইন্স্যুরেন্সের টাকাটা পায়।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সারাক্ষণকে বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিমা খুবই ভালো পদক্ষেপ, কিন্তু এটা নিয়ে আমাদের দেশে কোনো কাজ হয়নি। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে মেটাতে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অনেকে চাকরি করতেন, করোনায় চাকরি হারিয়েছেন, এখন চিকিৎসা ব্যয় করবেন কীভাবে, বিমা থাকলে সেটা বিমা কাভার করত। এটা নিয়ে অনেক জায়গায় আলোচনা হয় কিন্তু পদক্ষেপ তো নেয়া হয় না।’

এ বিষয়ে স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এজিএম আলমগীর হোসেন বলেন, ‘উন্নত বিশ্ব হেলথ ইন্স্যুরেন্সকে যেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে, আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বে এখনো হেলথ ইন্স্যুরেন্স তেমন গুরুত্ব পায়নি। কোনো কোনো বিমা কোম্পানিতে লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অংশ হিসেবে হেলথ ইন্স্যুরেন্স পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে।’

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কোম্পানির নানা সংকটের কারণে অনেক সময় গ্রাহকদের বিমা দাবির চেক পেতে বিলম্ব হয়। সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকার যদি বিমা সেক্টরের জন্য বিশেষ নজর দেয়, তাহলে আমরা দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।’

স্বাস্থ্যবিমা সম্পর্কে জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পরিচালক (উপসচিব) নাজিয়া শিরিন সারাক্ষণকে বলেন, ‘আমরা মুজিববর্ষে স্বাস্থ্যবিমাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাজারে আনার চেষ্টা করছি।’

Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

করোনা মোকাবিলায় প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান: শিল্প প্রতিমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার::করোনা মোকাবিলায় জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচার-প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন শিল্প ...