রিলে গল্প ‘সংক্রমণ’ (দ্বিতীয় পর্ব)

 

বৈশ্বিক করোনা সংকটকালে সবার মতই কবি সাহিত্যিকদের মনেও সঞ্চিত হয়েছে হাজারও কথা।তারা নিয়মিত লিখে রাখছিল যার যার অবস্থান থেকে।কিন্তু সবার সব কথাগুলোকে একটি সুঁতোয় গেঁথে দুই বাংলাকে এক করার চেষ্টায় লেখা হয়েছে রিলে গল্প।গল্পটি একজন শুরু করে ছেড়ে দিয়েছে অন্যজনের হাতে।সে দশটি বাক্যে পূর্বের ধারাবাহিকতায় নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ করে পৌঁছে দিয়েছে আরেকজনের হাতে।এভাবেই রোজ একজন করে মোট ঊণত্রিশ জন গল্পকারের ভাবনা জড়ো হয়েছে একটি গল্পে।
রিলে গল্পের পরিকল্পনায়- তৃষ্ণা বসাক এবং রূপায়ণে ভজন দত্ত। এই নতুনত্বে পাঠকদের শরীক করতে তিন পর্বে প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছে ইউনাইটেড নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম।গতকাল প্রথম পর্বের পরর আজ প্রকাশ হচ্ছে এর দ্বিতীয় পর্ব।আগামীকাল প্রকাশ হবে তৃতীয় পর্ব।প্রিয় পাঠক আমাদের সাথেই থাকুন। 

শ্যামলী আচার্য

শ্যামলী আচার্য

রিমঝিম কোথায়?
কী করে সারাদিন? আজ কি বেরিয়েছিল একবারও?
দুপুরে আর রাতে একবার খাবার টেবিলে দেখা হয় আজকাল। অন্যসময় তার ঘরের দরজা বন্ধ; প্রাইভেসি মেনে তার পড়াশোনা চলে। এই লকডাউন শুরু হতেই চারপাশের সব রুটিন অগোছালো। এমনিতেই রঞ্জনা-সুবীরের এই একমাত্র দ্বাদশী কন্যাটি বরাবর ঘরকুনো। এখন যেন আরও গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। অনলাইন ক্লাস চলে … কী জানি সর্বক্ষণ কি অনলাইনে ক্লাসই চলে? আজকাল এই প্রজন্মকে সরাসরি কিছু জিগ্যেস করাও মুশকিল। অল্পেতেই প্রতিক্রিয়াশীল। তার ওপর বয়ঃসন্ধি! সামান্য এদিক থেকে ওদিকে নড়লেই মনস্তত্ববিদেরা নাকের ওপর চশমা এঁটে ডিপ্রেশন-এর তত্ত্ব আওড়ান। হুঁঃ… যত্তসব। রঞ্জনার যেন মন নেই, মনখারাপও নেই… আরে বাবা সে’ও তো দ্বিতীয় বয়ঃসন্ধির দিকে এগোচ্ছে না কি! তার মুড অফ হতে পারে না? যত মুড সুইং সবই কি এই জেনারেশনের?
রিমঝিমের বন্ধ ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে যায়।
বিছানার ওপর গুটিসুটি মেরে কুঁকড়ে শুয়ে আছে রিমঝিম।
পাশেই ল্যাপটপ খোলা… একজন গম্ভীর চেহারার ভদ্রলোকের মুখ। পুরো দেখা যায় না। নাক থেকেই মাস্কে ঢাকা…।
রঞ্জনা দৌড়ে গিয়ে কপালে হাত রাখে রিমঝিমের…।

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

নাহ।জ্বর নেই।রঞ্জনা একটু নিশ্চিন্ত হয়।কিন্তু সেই নিশ্চিন্তভাব দীর্ঘস্থায়ী হয় না।তার মনোযোগ চলে যায় ল্যাপটপের ওই ছবিটার দিকে।ভদ্রলোকের মুখটা চেনাচেনা।রিমঝিম এই ছবি পেল কী করে।বুকে অজানা ভয় দানা বাঁধতে থাকে।আজকাল কোনও কিছুই অসম্ভব নয়।সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক প্রোফাইল খুলে তার দ্বাদশী কন্যাকে কেড়ে নেয় যদি কোনও পাচারকারী…..
-কে রে এটা?
রিমঝিম উত্তর দেয় না।তার মুখচোখে বড়দের মুখের নিস্তব্ধ অবসন্নতা।করোনা কি এভাবেই ওদের শৈশবটাকেও কেড়ে নেবে?
-কী রে?উত্তর দিচ্ছিস না কেন?
রঞ্জনার চেঁচামেচিতে সুবীরও চলে আসে ঘরে।তার মুখচোখেও অস্থির নিঃশব্দতা।তারা কেউ লক্ষ করে না,রিমঝিমের দুই চোখের কোণে যে আলোটা মুক্তদানার মতো চিকচিক করছে,সেটা আসলে তার মন নিঙরে বেরিয়ে আশা এক মুঠো কষ্ট।
-ইনি রুমেলার বাবা।রুমেলা আমার ক্লাসেই অন্য সেকশনে
পড়ে।আগে দেখা হতো না।এখন হয় রোজ।অনলাইন ক্লাসে।ও খুব ভালো গান করে।আমাকে শোনায় মাঝেমাঝে।আমার মনখারাপ থাকলে।
-ওহ।উনি ডাক্তার?নিশ্চয়ই খুব চাপে আছেন।সুবীর বলে।
-ছিলেন।আজ সকালে মারা গেছেন।ডিউটি করতে করতে।জ্বর এসেছিল।খেয়াল করেননি।শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল।সেটাও পাত্তা দেননি।
এবার নদীবাঁধ ভেঙে কুলকুল নদীজল প্লাবিত করে দেয় চারদিক।রিমঝিম বাপি আর মামকে ধরে কাঁদতে থাকে।তার মন জুড়ে একটা ভয়।রুমেলা যদি আর কক্ষনো গান না শোনায় তাকে?তার মনখারাপের দিনগুলোয়!!!

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়

সুবীর জানলা দিয়ে আকাশ দেখে, ঈশানকোনে একটুকরো কালো মেঘ থমকে আছে।ও গলাটা ঝেড়ে নিয়ে মুখে ম্লান হাসি টেনে বলে, “রঞ্জনা, আজ তোমার সেই স্পেশাল পাতলা মাছের ঝোল করো,আর ছোট বড়িভাজা, মৌরলামাছ ভাজা, ডাল, টমাটোর চাটনি,….কি ভালো হবেনা?”
“মেনু পরে বলো, মেয়েটা ঘাবড়ে আছে দেখছ না?”
সুবীর অন্যদিকে তাকিয়ে বলে“একটু আগেই, বাজার থেকে ফেরার সময়, অসীম ফোন করেছিল, সোমেন্দুবাবু মারা গেছেন।শনিবার অবধি অফিসের বাসে ওনার পাশেই বসে আমি যাতায়াত করেছি, ওনার প্যাকেট থেকে বিস্কুট খেয়েছি।শুনলাম চিকিৎসার সময় পাননি।শনিবার রাতেই ভর্তি,আজ মঙ্গলবার তো, মাঝের সোমবারে উনি আসেননি।ওরা মনে হয় আমার রোজ পাশে বসে বাসে ট্রাভেল করার খবরটা এতক্ষণে পেয়ে গিয়েছে। রঞ্জনা, এই মুহূর্তে আমার টেস্ট করাটা খুবই জরুরী।”
রঞ্জনার একটু আগে দেখা বাথরুমের সিন মনে পড়ে। তাই কি সুবীর রিমঝিমের হাত ছাড়িয়ে বাইরের ঘরে চলে গিয়েছিল, ওর হাতও ধরতে চায়নি?

কেকা ব্যানার্জী

কেকা ব্যানার্জী

রঞ্জনা র বুক ধড়াস করে ওঠে। রান্নাঘরে গিয়ে কোন
কাজে মন দিতে পারে না।হাত ও যেন চলছে না, সাদা জিরে, কালো জিরে,মুসুর, মুগ সব একাকার হয়ে যাচ্ছে । ভাতের হাঁড়ি র ঢাকনা খুলতেই বাষ্প উঠে এলো ,চশমা ঝাপসা .. হঠাৎ মনে পড়ল দার্জিলিং, ঘুম স্টেশন ,ছোট রেল আর ওরা তিনজন ..বুকের ভিতর টা হু হু করে উঠল আর কোনদিন কোথাও কি বেড়াতে যাওয়া হবে? সবাই একসাথে সুস্থ থাকতে তো!
সুবীর জোরে ডাক দেয় — রঞ্জনা রঞ্জনা অক্সিমিটার কই ?
আসছি — দৌড়ে এলো রঞ্জনা । সুবীর নিজে ই অক্সিজেনের মাত্রা মেপে এক চিলতে হেসে রঞ্জনা র দিকে তাকিয়ে বলে — এখনো ভালো আছি।
রঞ্জনা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সুবীরের হাতে আদা চা দিয়ে বলে — আজ কিন্তু সেদ্ধ ভাত। আমি এখন রান্না ঘরে যাবো না রিমঝিমের কাছে থাকবো। মেয়ে টা বড় কষ্ট পাচ্ছে গো।
রিমঝিম মা কে জড়িয়ে ধরে আছে।ওর বুকের ধকধক টের পাচ্ছে রঞ্জনা।
হঠাৎ রিমঝিম বলে ওঠে – ঠাম্মি সকাল থেকে ফোন ধরছে না কেন মা?
রঞ্জনা আবার কেঁপে ওঠে। সুবীর কে এক্ষুনি জানানো দরকার। ঝাড়গ্রামে ওদের আদি বাড়িতে শাশুড়ি মা একা ই থাকেন। রিটায়ার্ড হেড মিস্ট্রেস, সাহসী, আত্মনির্ভরশীল, ঋজু মনে র মানুষ। দোতলা বাড়ি, নিজের হাতে তৈরি বাগান ছেড়ে এই ফ্ল্যাট বাড়ির জেলখানায় উনি থাকতে রাজি নন।বৈধব্য নিয়ে তাঁর মনে কোনো গ্লানি ছিল না কখনো। রঞ্জনা আরো জানে, শাশুড়ি মা র দাদার এক বন্ধু ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা তাঁর স্মৃতি এখনো তিনি সযত্নে লালন করেন।
কাঁপা কাঁপা গলায় রঞ্জনা বলল — কেন রে রিমি সোনা তোর সঙ্গে ঠাম্মির তো রোজ ভিডিও কল হয়। ফোন করেন নি ?
–না তো। কাল সকালে ঠাম্মি বলল – ঠাম্মি কিছু দুঃস্থ মহিলার দায়িত্ব নিয়েছে ,কম্যুনিটি কিচেনের কাজ ও শুরু করেছে।আজ সকাল থেকে ফোন স্যুইচ অফ।ওমা আমার ঠাম্মির জন্য মন খারাপ লাগছে,আমাকে ঠাম্মির কাছে নিয়ে চল। এই বাড়িতে আমার দম বন্ধ লাগছে।….

বিপুল অধিকারী

বিপুল অধিকারী

টেলিফোনের এক টানা কর্কশ চিৎকার খাড়া দুপুরের এই অখণ্ড নিস্তব্ধতাকে চিঁরে বেরিয়ে যাচ্ছিলো বারবার। তবুও যেন কেউ তা টের পাচ্ছিলো না। মাথার ওপর কলকাতার আকাশ কালো মেঘে ঢাকা। ভারি। যে কোন সময় হুড়মুড় করে যেন ভেঙে পড়বে।
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অক্সিমিটারে অক্সিজেনের নিরাপদ মাত্রা করোটিতে রেখে নির্ভার আর মোটামুটি নিশ্চিন্ত সুবীর ঘুমিয়ে পড়েছিল। রিমঝিমের রুমে সিঙ্গেল খাটের বিছানার একপাশে একটু জায়গা করে নিয়ে কাত হয়ে মেয়ে রিমঝিমকে বুকে আঁকড়ে শুয়ে থাকা রঞ্জনার ঘুম তেমন গাঢ় হয়নি তখনও। ঘুমে বাপ ও বেটি দুজনেই কাদা।
রঞ্জনা ভাতঘুম ভেঙে পড়িমড়ি করে ছুটে এসে লাইন কেটে যাবার আগেই কলটা ধরে কোনমতে হ্যালো বলতে পারে।
ওপাশে সাড়া নেই।
ঘুম জড়ানো গলায় আবারও হ্যালো বলবার প্রস্তুতি নিতেই
একটা কান্নার আওয়াজ এসে আছড়ে পড়ে তার বাম কানে।
রঞ্জনা কান খাড়া করে। তারপর আরও খানিক নীরবতা।
মিনিটখানেক এভাবেই কেটে যায়।
এপাশেও কোন আওয়াজ নাই। সাড়া নাই। শব্দ নেই।
কেবল কালো মেঘে আচ্ছন্ন আকাশে দেয়ার এক ডাক চরাচর কাঁপিয়ে দিয়ে কাছে কোথাও এইমাত্র যেন আছড়ে পড়লো।
আইএসডি কলটা দ্রুতই কেটে যায়। বাংলাদেশ থেকে।
রঞ্জনা রিসিভার ক্রেডলে রেখে ধপাস করে পাশের সফায় বসে পড়ে। ভাবলেশহীন। কেবল একটা চাপা কান্না কুণ্ডুলি পাকিয়ে গলার কাছে এসে স্তব্ধ হয়ে থাকে, গোপনে।
সুবীর যে কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, রঞ্জনা একটুও টের পায়নি।

কুশল ভৌমিক

কুশল ভৌমিক

রঞ্জনার মনের ভেতর ছায়াছবির মতো ভেসে উঠছে মেঘনার তীর ঘেষা একটি গ্রাম। গ্রামের নাম কুসুমপুর। সাতচল্লিশে দ্বিজাতি তত্ত্বের মরণ ছোবলে
যখন ভাগ হয়ে যায় গঙ্গা-পদ্মা, ইছামতী-তিস্তা,এমনকি ভাগ বাটোয়ারার সর্বনাশা ছোবলে যখন বাদ যায় না রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল। যখন শত বছরের শেকড় গজানো স্মৃতির আঙিনায় দাঁড়িয়ে নিজাম মোল্লা একদিন হুঙ্কার দেয় –
— এই দ্যাশ আর তুমাগো নাই মিয়ারা
রাতের আঁধারে গোলাঘর জ্বলতে থাকে দাউ দাউ করে।কারো অজানা নয় কে লাগিয়েছে আগুন তবুও টু শব্দটি নেই কারো নেই মুখে।
জীবন বড়ো নাকি দেশ বড়ো…
এই দ্বৈরথের কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে একদিন রাতের আঁধারে রঞ্জনার বাবা ঠাকুরদার হাত ধরে দেশ ছাড়ে। ভিটা আঁকড়ে তবু থেকে যায় ছোট দাদু – জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। ললাটে জোটে বীর বিক্রম উপাধি।
সর্বনাশা কোভিড কাউকেই কি ছাড়বে না?
এর শেষ কোথায় বলতে পারিস রিমঝিম?

মাশরুরা লাকী

মাশরুরা লাকী

গহীনের দেয়াল ছুঁয়ে থাকা দেশমাতৃকার অনুভূতি অন্তহীন। অতল সমুদ্র সমান মায়া মমতা, ছায়া মমতা ও শ্রদ্ধাবোধ ধারণ করার ক্ষমতা আমাদের জন্মগত অধিকার। আমাদের বক্ষদেশ জুড়েই দেশপ্রেমের গভীর বুনন। আমার দাদু একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা, বীর বিক্রম। দাদুকে নিয়ে আমার গর্বের কোন সীমা নেই। দাদুর বয়স হয়েছে।তাই ইদানীং সে মহামারী কোভিড নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন। তাঁর বয়সী বটবৃক্ষরা একেক করে খুব নিরবে নিভৃতে অস্তগামী সূর্যের পানে ধাবমান হচ্ছে। এইজন্য ভেতরে ভেতরে তিনি সর্বদা মৃত্যু ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে আছেন। আর বিড়বিড় করে বলে চলেছেন-সব চলে যাচ্ছে।

রিমঝিম, দাদুকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত। আসলেই তো এই কোভিড মহামারীর শেষ কোথায়? এবং সেই প্রাচীন বিগ ব্যাং’ নিয়ে ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়লো।
কাঁচা ঘুমের মধ্যে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমশ বেড়েই চলেছে এবং বুকের মধ্যে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। এরপর সে দেখতে পেল-দুটো স্বাস্থ্যবান মহিষ ওকে তাড়া করছে। রিমঝিম প্রাণপণে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে একটি হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে এসে হাজির হলো। প্রধান ফটক খোলায়ই ছিল, তাই সে খুব সহজেই হাসপাতালের ভেতর প্রবেশ করতে পারলো।
এরপর ষন্ডামার্কা একজন সিকিউরিটি গার্ডকে সে দেখতে পেল।গার্ড ওকে যথারীতি প্রশ্ন করতে থাকে কিন্তু সে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় দিগ্বিদিকভাবে আবার দৌঁড়াতে থাকে। দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সে আই.সি.ইউ এর একটি কক্ষে ঢুকে একটি খালি বেড দেখতে পেল। সেখানে সে সটান হয়ে শুয়ে পড়লো।
কিছুক্ষণ পর পাশের বেডে শুয়ে থাকা ৬-৭ বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে ঘুমের মধ্যে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছে- মা,প্লিজ আমাকে একটা স্লিপিং কিসি দাও, না ! আমি ঘুমোতে যাব। ঘূণপোকারা আমার শরীরে কুটকুট করে কামড় দেয়। তুমি একবার আমার কাছে আসো, আবার আসো না। আমাদের মাতৃত্বমহান সম্পর্কের শেষ কোথায়? নিশ্চয়ই, খানিকটা চোখের জলে, আর যিনি নিমন্ত্রণ জানান ঈশ্বরের অস্তিত্বের কাছে যেতে।
মধ্যরাতে ঘণ্টাধ্বনির আর্তনাদ চিৎকারে রিমঝিমের ঘুম ভেঙে গেল….

তাহমিনা শিল্পী

তাহমিনা শিল্পী

ধড়মড় করে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাড়াল রিমঝিম।পুরোহিত মশাই পাড়ার মন্দিরের ঘন্টাটা সজোরে বাজিয়ে চলেছেন আর উচ্চস্বরে মন্ত্র পড়ছেন।অমঙ্গল, ঘোর অমঙ্গল, রক্ষে করো ঠাকুর,রক্ষে করো…..
মন্দিরের মুল ফটকের সামনেই একদল লোক শোরগোল করছে।কয়েকজন মিলে তাদের ঠিক মধ্যিখানে কাকে যেন লোহার রড দিয়ে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে পেটাচ্ছে।বাকিরা বলছে, মারুন, মারুন দাদা, পিটিয়ে ওর হাড়-মাংস এক করে দিন।ব্যাটার সাহস বটে,মন্দিরের দান বাক্সে হাত দিয়েছে।
রিমঝিম বারান্দা থেকে আরও একটু ঝুঁকে
রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা লোকটিকে চিনতে পেরে অবাক হল।লকডাউনের আগেও মন্দিরের পাশে ছোট্ট চৌকি পেতে পূজোর ফুল বিক্রি করতো।আজ সে মন্দিরের দানবাক্স থেকে টাকা চুরি করছে!

তৌফিক জহুর

তৌফিক জহুর

রিমঝিম অবাক হয়ে যায়, মানুষ এতো নির্মম নিষ্ঠুর পাষাণ হয় কি করে? উপাসনালয়ে মানুষ কেনো আসে, ঈশ্বরের প্রেম লাভের আশায়। প্রেম তো আমাদেরকে ভিতর থেকে বাহিরে নিয়ে যায়, নিজের হৃদয় হতে অন্যের দিকে নিয়ে যায়,এক হতে অন্যের ভিতর অগ্রসর করে দেয়। রিমঝিম ভাবতে থাকে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এজন্যই প্রেমকে বলেছেন ” পথের আলো”, একটিকে ভালোবাসলে আর একটিকে ভালোবাসতে হয়। পথ দেখতে ঈশ্বরের ঘরে মানুষ সমবেত হয়, যাপিত জীবনের সকল বিষয় আশয়ে ন্যায় ধারণা পেতে। তাহলে করোনা মহামারীকালে যে মানুষটি পূজার ফুল বেঁচে জীবন নির্বাহ করতো, আজ তাঁর পরিবার বাঁচানোর জন্য কোনো উপায় না পেয়ে দান বাক্সে যদি হাত দিয়েই থাকে, সেজন্য কি তাকে বেদম প্রহার করতে হবে। রিমঝিম এসব ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানায়, হে ঈশ্বর, পৃথিবী থেকে ভয়ন্কর এই ভাইরাসকে নিয়ে যাও, মানুষ প্রেমের মধ্যে দিয়ে, ধ্যানে তোমাকে স্মরণ করে,তাই তাঁকে ন্যায় পথে জীবিকা নির্বাহ করে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দেয়ার সুযোগ করে দাও ।ঈশ্বর আমার প্রার্থনা কবুল করো। হৃদয়ের এমন আকুলতাময় প্রার্থনায় রিমঝিমের চোখ বেয়ে ঝর্ণাধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো গাল বেয়ে মেঝেতে….

সৌমিত্র চক্রবর্তী

সৌমিত্র চক্রবর্তী

আচমকা অনেক দূরের একটা আশ্চর্য সুর কানের লতি বেয়ে মাথার ভেতরের কোষে গিয়ে ধাক্কা মারতেই চমকে চেতনায় ফিরল রিমঝিম। বহুদূরে কেউ গত শতকের ঠুংরী শুনছে, ‘তুঝ বিনা চেন ন আয়ে/ইয়াদ সাঁতায়ে রাত দিন…’। অন্য সময় হলে এসব গান রিমঝিম শুনতই না। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে এই মধ্যরাত পেরিয়ে যাওয়া আবছা অন্ধকারে প্রিয় মুখগুলো যেন ভেসে আসছে ওই অপার্থিব সুর বেয়ে। কতক্ষণ অচেতনে নানান ভাবনায় কাটিয়েছে সে, তা এখন মনে পড়ল না। গলার কাছে একটা যন্ত্রণা ডেলা পাকিয়ে উঠতেই রিমঝিম টের পেল তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস নিতে ভীষণ ভীষণ কষ্ট হচ্ছে…গভীর অথচ ছোট্ট ব্যাসের এক পাতকুয়োর জলে ডুবে যাচ্ছে রিমঝিম…’মা…মা’…! চোখ দুটো দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরিয়ে আসছে, আর সারা শরীর জুড়ে ব্যাথা। ঠুংরীর সুর তাকে পেঁচিয়ে ধরছে রূপকথার যাদুকরী মায়ায়। চিৎকার করে মা কে ডাকার চেষ্টা করল সে, কিন্তু একটা অদ্ভুত ঘড়ঘড় আওয়াজ ছাড়া তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোলো না, চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে নামলো এক ফোঁটা নিঃশব্দ জলের কণা।
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

তানভীর টিপু’র কবিতা ‘ভালো লাগে না’

ভালো লাগে না . -তানভীর টিপু . ভালো লাগে না কবিতার খাতা ...