ব্রেকিং নিউজ

রিলে গল্প ‘সংক্রমণ’ (তৃতীয় পর্ব)

বৈশ্বিক করোনা সংকটকালে সবার মতই কবি সাহিত্যিকদের মনেও সঞ্চিত হয়েছে হাজারও কথা।তারা নিয়মিত লিখে রাখছিল যার যার অবস্থান থেকে।কিন্তু সবার সব কথাগুলোকে একটি সুঁতোয় গেঁথে দুই বাংলাকে এক করার চেষ্টায় লেখা হয়েছে রিলে গল্প।গল্পটি একজন শুরু করে ছেড়ে দিয়েছে অন্যজনের হাতে।সে দশটি বাক্যে পূর্বের ধারাবাহিকতায় নিজস্ব ভাবনা প্রকাশ করে পৌঁছে দিয়েছে আরেকজনের হাতে।এভাবেই রোজ একজন করে মোট ঊণত্রিশ জন গল্পকারের ভাবনা জড়ো হয়েছে একটি গল্পে।
রিলে গল্পের পরিকল্পনায়- তৃষ্ণা বসাক এবং রূপায়ণে ভজন দত্ত। এই নতুনত্বে পাঠকদের শরীক করতে তিন পর্বে প্রকাশের দায়িত্ব নিয়েছে ইউনাইটেড নিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম।গতদুদিনে প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের পর আজ প্রকাশ হচ্ছে এর সর্বশেষ পর্ব।প্রিয় পাঠক অসংখ ধন্যবাদ আপনাদেরকে। 

মৌসুমী ঘোষ

মৌসুমী ঘোষ

ঝিমলি জড়িয়ে ধরতেই ঘুমটা ভেঙে গেল রিমঝিমের। ঝিমলি তখনও ভয়ার্ত গলায় ‘মা মা…’ ডেকে চলেছে কি পাশের ফ্ল্যাটে!
রান্নাঘরে কিছু পরার শব্দে রঞ্জনা ছুটে গিয়ে দেখে, বিস্কুটের কৌটোর ঢাকনা খুলে চারিদিকে বিস্কুটের ছড়াছড়ি। রঞ্জনা বকতে গিয়েও, বকুনিটা গিলে নিয়ে বলল, ‘তোর খিদে পেয়েছে নারে!’ রিমঝিম মাথা নেড়ে বলল, ‘ না, ঝিমলিকে নতুন কুকিসটা দিতে যাচ্ছিলাম। সকালে ও মেসেজে লিখেছে, কাল হালকা জ্বর এসেছিল, ওষুধ খেয়ে এখন ও কে। কিন্তু জিভে স্বাদ পাচ্ছে না।’
রঞ্জনা রিমঝিমকে বুকে টেনে বলল, ‘ঝিমলি তো পাস্তা খুব ভালোবাসে, নারে! টিফিন কেরিয়ারে করে ওদের দরজার সামনে দিয়ে আসবো। তুই মেসেজ করে জানিয়ে দে।’
হাউসকোর্টটা জড়িয়ে টিফিন ক্যারিয়ারটা নিয়ে পিছন ঘুরতেই রিমঝিম মাস্কটা এগিয়ে দিল। সুবীর রিমঝিমের মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘করোনা আমাদের অনেক শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু। রিমঝিম এই কটা মাস স্কুলে গেলেও এত ম্যাচিওরড হতে পারতো না।’
রিমঝিমের ফোনটা বেজে উঠলো। ঠাম্মার নম্বর ফুটে উঠল। – হ্যালো…

অমিত মুখোপাধ্যায়

অমিত মুখোপাধ্যায়

ফোন ধরতেই তড়িঘড়ি ঠাম্মি বলে, আগে শুনে নে, নিজের হাজার কাজ, বাগান দেখা সেরে এখন ওই কম্যুনিটি কিচেনের দেখভালের মাঝে আর সারা দিনের উৎসাহের চোটে ফোনে চার্জ দিতে ভুলে গেছি সোনা! তবে শোন, তোদের চিন্তাশক্তি আছে, মতলববাজ মিডিয়ার তালে পুতুলনাচে পা না-মিলিয়ে, আতঙ্কে মন দুর্বল না-করে, সংকটের এমন সময়ে অন্যদের সাহায্য করে নিজেদের পরিচয় দিবি! তা ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তো সরকারি ভাবে কাল বলল যে উপসর্গহীন রোগী সংক্রামক নয় আর দীর্ঘ পরীক্ষা করে চলা ড. ডেভিড সামাদি তা সমর্থন করল!
রিমঝিম নিশ্চিন্দির হাসিতে বলে, ঠাম্মি, বাকি সবাইকে দেখে বাপি-মাম দু’জনেই ভয়ে আধমরা, যেন আমার চেয়েও এত ছোট হয়ে গেছে যে বোঝা মুশকিল বাপি ছাত্র-আন্দোলন করে জেল-খাটা মানুষ আর মাম আর্মি ফ্যামিলির মেয়ে! হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, নিয়ম মেনে সতর্ক হয়ে চললেই হলো, কারণ বেশির ভাগ মৃত্যুই কো-মর্বিডিটির জন্য হচ্ছে, আর তার সাথে রক্তের গ্রুপ, পরিবেশ, অন্যান্য বিষয় কী কী আছে তা নিয়ে রোজ গবেষণার কাজ কেমন চলছে সেটা নেটে দেখায় তো! আরে, প্রথম দিকে আমিও ঘাবড়ে গিয়ে, সে কী শরীর খারাপ লাগছিল আমার, যখন ওই সুরঞ্জনকাকু, রুমেলার বাবা, ঝিমলি আর বাপির সহকর্মী সোমেন্দুকাকুর খবর একের পর এক জেনেছি! ওদের প্রত্যেকের অন্য বড় অসুখ ছিল, আর শোনো ঠাম্মি, ঝিমলি এইমাত্র জানাল, শেষ টেস্টে ওর নেগেটিভ এসেছে!
ওদিকে ওই অসুস্থ মেয়েটাকে পথে বার করে দেবার পর থেকে মঙ্গলা কাজে আসছে না! অতিমারির অনিশ্চয়তা, মেয়ের অবস্থা আর দ্বিতীয় বয়ঃসন্ধির ঝামেলায় রঞ্জনার মনও বিগড়ে থাকে। চোদ্দ দিনের কত আগেই ঘরের রসদ প্রায় শেষ, রামদীনকে তাই শেষে ফোন করতেই হলো।

সোনালি

সোনালি

সব প্রজন্ম নিজেদের মত করে রাস্তা খোঁজে।
রঞ্জনা ইস্কুল কলেজের বন্ধুগ্রুপে হোয়াটসএপ ফেসবুকে কেবল করোনার খবর দ্যাখে। তার মধ্যেই পুরোনো কিছু বন্ধু ফোন করে খোঁচায়, এই গান ত গাইতি ভালই। স্টারমেকার ডাউনলোড কর ফোনে। দেখ না গানের কথা মিউজিক সব দিয়ে দিচ্ছে। কত গান। আমরা সব রেকর্ড করছি আর ফেসবুকে দিচ্ছি। একেবারে সিনেমার মত। কি মজা। এইবারে স্টার হয়ে যাবি। সত্যি।
বিরক্ত লাগছিলো রঞ্জনার। কিন্তু ছোট বেলার বেস্টফ্রেন্ড সবরমতী নাছোড়বান্দা।
শেষমেশ স্টারমেকার নামিয়েই ফেলতে হল।
আর সে খুলে ত রঞ্জনা থ।
এত আলাদীনের আশ্চর্য জাদুকরী কান্ড!
ও বাবা, রাজ্যের গানের কথা মিউজিক সব বেজে চলেছে। সঙ্গে গাইলে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে তার নিজের গলা। ঠিক মনে হচ্ছে আশা ভোঁসলে আরতি মুখুজ্যে, উফফ!!!
যত প্রিয় সিনেমার গান, পুজোর হিট, অনুরোধের আসর সঅব খুঁজে পাওয়া গেল যে।
উত্তেজিত রঞ্জনা সারা দুপুর দরজা বন্ধ করে গান রেকর্ড করে।
রিমঝিম দরজা বন্ধ দেখে ডাকতে এসে খ্যাঁচানি খেয়ে হতভম্ব হয়ে যায়।
দরজা বন্ধ রাখাটা ত তারই একচেটিয়া অধিকার সে জানত। মামের হল কি?
তেতো মুখে বেরিয়ে আসে রঞ্জনা।
কি চাই? কি দরকার হ্যাঁ?
— না, একটু খিদে পাচ্ছিল।
— ত ফ্রিজে সুজি করা আছে, বাটি চামচ নিয়ে বের করে নাও। সবার ফাইফরমাশ খাটাটাই আমার জীবনের একমাত্র কাজ নয়।
খাবার চাইলে এমন বকুনি খাওয়া রিমঝিম ভাবতেই পারে না, কিন্তু মুখ ভার করতেও ভুলে গেল।
অবাক হয়ে দেখল, মাম ঘর থেকে বেরিয়েছে বিয়েবাড়ি যাবার মত সাজে।
সিল্কের শাড়ী পিন করে পরা, ম্যাচিং ব্লাউজ। কানে লম্বা ঝোলা দুল। কি গাঢ় লিপস্টিক ঠোঁটে। আইলাইনারের টান অনেক পুরোনো সিনেমার হিরোইনদের মত। আবার চোখের ওপরে কি চিক চিক করছে।
আইশ্যাডো লাগিয়েছে? মাম ?
মাকে কেমন অচেনা লাগছিল রিমঝিমের।
মা আইশ্যাডো কাকে বলে তাই জানে বলে রিমিঝিমের ধারণা ছিল না।
সারাক্ষণ ধেবড়ানো সিঁদুর আর সোয়েডের ক্লান্ত টিপ, এই ত মাম।

সৌম্যজিৎ আচার্য

সৌম্যজিৎ আচার্য

এত অবধি টাইপ করার পর রঞ্জনা থামল। ল্যাপটপ থেকে আলতো করে চোখ নামিয়ে ভাবল, সত্যি কী বোকা ছিলাম না! আজ দুহাজার তেত্রিশ সালে এসে দুহাজার কুড়ির সেই বোকা রঞ্জনাকে নিজেরই বড় অচেনা লাগছে তার।কিন্তু বোকা মানুষের গল্পই তো পৃথিবী আজও বেশী খায়।তাই দুহাজার কুড়ির সেই ভয়ঙ্কর সংক্রমণের গল্প লিখে রাখছে সে।যদিও দুহাজার কুড়ির থেকেও দুহাজার তেইশ সালটাই রঞ্জনার জীবনে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুহাজার তেইশে কোভিড-টুতে মারা গেছিল সুবীর।
দুহাজার তেত্রিশ- দ্য ইয়ার অফ কোভিড-থ্রি – রঞ্জনা আজকাল একটা আন্ডারগ্রাউন্ড ঘরে থাকে। কিন্তু আজ এইসময়ে হটাৎ নকিং এলার্ম বাজছে কেন?রঞ্জনা তাকিয়ে দেখল,দেয়ালের জায়েন্ট স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে একটা লেখা- ইজ এনিবডি লিভিং হেয়ার!

জয়া চৌধুরী

জয়া চৌধুরী

সুবীর মরে না গেলে রঞ্জনার জানা হত না মৃত্যু একটা ভেগ টার্ম সেকথা সত্যি করে বুঝতে। দেয়ালের স্ক্রিনে ফুটে ওঠা লেখাটা দেখতে দেখতে ভাবল লিভিং এর কতরকম রূপ হয়, মৃত্যুও কী এক অর্থে লিভিং নয়! শুধু সুবীরকে প্রত্যাখ্যান করেছে সে স্মৃতি থেকে, তবুও নাছোড় ফিরে আসে যখন তখন। হয়ত পূর্ণাও চায় রঞ্জনা তার রক্তাক্ত অতীত মুছে দিক। আদর করতে করতে অধীর হয়ে বলে ওসব কষ্টের কথা না ভাবলেই কী ন য় রঞ্জনা! কোভিড থ্রি বলে যেটাকে ভয় পাওয়াচ্ছে মিডিয়া সেটা কী আদৌ আলোচ্য বিষয় বলে মনে করিস? কোভিড টু-তে না মরে সুবীর গাড়ি চাপা পড়েও মারা যেতে পারত। পূর্ণা নেই আর, তার লিভিংও নেই কিংবা ডেথই তাদের যৌথ লিভিং হবে একরকম। ইউথ্যানশিয়া বেছে নিচ্ছে সে, সব আয়োজন সমাপ্ত। হঠাত কলিংবেলের আওয়াজে দরজা খুলে দেখে মেক্সিকো থেকে প্রিয় ইসাবেল বুড়ির চিঠি মানে দানপত্র, তার সব সম্পত্তি দান করে গেছে রঞ্জনাকে……….

মানস সরকার

মানস সরকার

দানপত্রটা  আসলে  পাওয়ার কথা ছিল রিমঝিমের। এডিনবরা ইউনিভার্সিটিতে ভাইরোলজি ডিপার্টমেন্টে
পি এইচ ডি করতে গেছে রিমঝিম। প্রথম বছরেই তার ‘ জেনেটিক এন্ডেমিক ভাইরাস অ্যাস অ্যা ওয়েপন  ‘  প্রবন্ধ একটি প্রথম শ্রেণির বিজ্ঞান পত্রিকায় ছাপা হতেই রিমিঝিম এখন আলোচিত নাম।  ‘ গার্ডেনর’ আর বি বি সি’ র নিউজ  ওয়েব সাইটে কভার করা হয়েছে সে খবর। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তার রিসার্চ। ভবিষ্যতে কোভিডে মৃত সুবীরের নামেই রিসার্চ ফাউন্ডেশন খোলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল রিমঝিম। পৃথিবীর অনেক মানুষই জানার পর এগিয়ে আসছে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে। ইসাবেলের পুরো পরিবার মারা যায়, মেক্সিকো কোভিড টু তে ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠার পর। সে রিমঝিমের সঙ্গে নিজেই যোগাযোগ করে। তারপর থেকে সম্পর্কটা তো পারিবারিক।
ভাইরোলজির গভীরে যাবার ইচ্ছে রিমঝিমের চাগার দেয় সুবীরের  মৃত্যুর পরেই। সে সময়, দিনটা আবার মনে পড়ল রঞ্জনার। কোভিড টু ‘ র আতঙ্ক  সে সময় কোভিড থ্রি’ র থেকেও বেশি ছিল। সংক্রমণ নয়,যেন অসম যুদ্ধে হেরে যাওয়া। তাই সুবীরও শহীদ। পরিবার,নিজের মেয়ের জন্য লড়া সৈনিক। নিঃশব্দে ল্যাপটপটা আবার খুলল রঞ্জনা….

চন্দ্রাণী বসু

চন্দ্রাণী বসু

দু হাজার কুড়ির শেষে বাজারে ভ্যাকসিন আসায় ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হতে শুরু করল। রিমঝিমের স্কুলও খুলে গেল। ট্রেন, মেট্রো, অফিস  সব আগের মতোন স্বস্তির। কিন্তু দুহাজার তেইশ ! রিমঝিমের ক্লাস টুয়েলভ তখন। অক্টোবর নাগাদ আগের ভ্যাকসিন ইমিউন সিস্টেম ধরে রাখতে ব্যর্থ হল আর ভাইরাসের প্রকৃতি বদলে শুরু হল মারাত্মক আক্রমণ। অ্যাসিম্পটিক অথচ হঠাৎ চূড়ান্ত শ্বাসকষ্ট এবং সাথে সাথে মৃত্যু। সুবীরও পারল না তার সাথে লড়তে। অথচ রঞ্জনার শাশুড়ির সারাজীবন আয়ুর্বেদে ভরসা করা শরীর রুখে দিয়েছিল কোভিড থ্রি। সুবীর চলে যাওয়ায় কোভিডের সঙ্গে এল তার জীবনে অর্থনৈতিক সংগ্রাম। অথৈ জলে তখন তার সংসারের ডিঙি …

শুভশ্রী সাহা

শুভশ্রী সাহা

কোভিড  টুয়েন্টি থ্রি  যে এতো তাড়াতাড়ি ফিরবে ভাবাই যায় নি, কুড়ির পর থেকে সারা বিশ্ব যখন নিজেকে সবে গোছাতে শুরু করেছে ঠিক তখনই আবার ভয়াবহ ফেরা। আর আশ্চর্য এইবার সাউথ ইস্ট এশিয়ার কান্ট্রিগুলো থেকে শুরু,  সায়েন্টিস্টরা  লিখলেন আননোন কজ, আপার রেস্পিরেটরি রেসপন্স করছিল, অক্সিজেন স্যাচুরেশন সব ঠিকঠাক,অথচ প্যানক্রিয়াস কাজ করছে না ডাইজেস্টিভ সিস্টেম টোট্যাল ফেলওর। এক রাতের মধ্যেই রক্তবমি করেই সুবীর শেষ হয়ে গেছিল। সেই দিনটার কথা– ডা: পূর্ণা গুহ না থাকলে সে এতোদিনে– রঞ্জনা ল্যাপটপ বন্ধ করল।
এডিনবরা ইউনিভার্সিটির ল্যাবে একটা স্লাইডে নিমগ্ন ছিল রিমি। কোভিড টুয়েনন্টি থ্রি থেকেই সে কাজ শুরু করেছে আর তার স্লাইটে বার বার যে ভাইরাস নক করছে তার নাম রোটা ভাইরাস।  রোটা ভাইরাস খুব সাধারণ এক ডায়েরিহাল ভাইরাস, আপাত নিরীহ এই ভাইরাস কি করে নিজের চেহারা এত ভয়ংকর করলো! একটা ভাইরাস নিজেকে ভয়ংকর শক্তিশালী করতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ চরিত্র, বসবাসের জায়গা এইভাবে কি করে বদল করতে পারে! ওই জন্যেই তার বাবার প্যানক্রিয়াস কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল রক্ত বমিতেই শেষ প্রায় একরাতে। অথচ একদম প্রথমে কোভিড নাইন্টিনে আপার রেস্পিরেটরি ট্র‍্যাকেই ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছিল, কোভিড টুয়েন্টি থ্রিতে কেউ ভাবেনিও রোটা ভাইরাসের কথা বা রোটাটেক ভ্যাকসিনের কথাও! ভাববেও বা কি করে রোটা ভাইরাস  কে ওয়াটার বর্ণ ভাবা হয়।
তাহলে কি কেউ বাইরে থেকে ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণ করছে! কিন্তু কারা এরা? কি উদেশ্য! বায়ো উইপন্স? আর  যারা করছে তারা এটাও জানে তুলনামূলক থার্ড ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির হাইজিন কন্ট্রোলিং সিস্টেম তুলনামূলক কম। তাহলে কোভিড থার্টি থি কি নির্দেশ করছে? রিমি একমনে ভাইরাসের চেহারাটা মনে করতেই  সে প্রায় চিৎকার করে উঠল– কোভিড থার্টি থ্রির সংক্রমণের  জায়গাটা হিসেব মতো নার্ভাস সিস্টেম হওয়া উচিত এবং সে নিশ্চিত এই ভাইরাসগুলো  নার্ভ সেলস গুলো নষ্ট করছে, সময় খুব কম তবুও বাঁচতে পারে পৃথিবী, রিমি ফ্যাক্স মেশিনে দ্রুত বার্তা পাঠাতে লাগল  এডিনবার্গ হসপিটালের নিউরো মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা: আলেক্স ফার্গুসন কে।

রাজীব কুমার ঘোষ

রাজীব কুমার ঘোষ

“মা তুমি একবারও ভাবলে না, দানপত্রটা তোমার কাছে কলকাতায় আসবে কেন, ওরা আসলে একটা মেসেজ দিয়েছে – আমরা তোমার সবকিছু জানি।”
ঢোকার পরেই মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে রঞ্জনার আন্ডারগ্রাউন্ড ঘরটা পুরো তছনছ করে ফেলল রিমঝিম – প্রতিটি যোগাযোগের মাধ্যম সে নষ্ট করে দিয়েছে, নষ্ট করে দিয়েছে সেই সব গ্যাজেটস্ যারা কোনো না কোনো সনাক্তকরণ তরঙ্গ পাঠিয়ে চলে অনবরত।
মাকে দ্রুত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে সাহায্য করতে করতে মনেমনে ডাঃ আলেক্স ফার্গুসনকে ধন্যবাদ দিয়ে চলেছিল রিমঝিম – তার পরামর্শেই আমেরিকা থেকে রাতারাতি সে উবে গিয়ে হাজির হয়েছে কলকাতায়, মাকে বাঁচাতে।
রঞ্জনা দ্রুত তার স্মৃতিকথার প্রিন্ট আউটগুলো ব্যাগে পুরে নিল সঙ্গে কিছু কলম, প্রায় অবসোলিট একটা উপকরণ  – রিমঝিম বুঝিয়ে দিয়েছে কম্পিউটার বা আধুনিক শ্রুতিলিপি যন্ত্র ব্যবহার করলেই তারা ধরা পড়ে যাবে।
রঞ্জনা বুঝতে পেরেছে কুসুমপুর থেকে যেভাবে বাবা, ঠাকুর্দার হাত ধরে একদিন উদবাস্তু হয়ে গিয়েছিল, যেভাবে ছাত্রজীবনে আন্দোলনের সময় সুবীর গা ঢাকা দিয়েছিল, সেইভাবেই আজ সে মেয়ের হাত ধরে একাধারে উদবাস্তু আর ফেরারি হতে চলেছে, দরজাটা শুধু পেরোনোর অপেক্ষা তারপর এই পৃথিবীতেই তারা উদবাস্তু।
রিমঝিম এডিনবরাতে নিজের সব কমিউনিকেশন ডিভাইস নষ্ট করে কলকাতায় এসেই ঝিমলি আর রুমেলার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল – ঝিমলি ব্যবস্থা করেছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ের আর রুমেলা নিয়েছে একটা বড় দায়িত্ব, তারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবার পর ডাঃ ফার্গুসনকে কৌশলে সবুজ সঙ্কেত দেবার কাজ।
ডাঃ ফার্গুসন সঙ্কেত পেলেই পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকারের কাছে আর খ্যাতনামা ভাইরোলজিস্টদের কাছে একযোগে পাঠিয়ে দেবেন রিমঝিমের গবেষণার বিশদ তথ্য আর তার থেকে উঠে আসা সুস্পষ্ট ইঙ্গিত – যার পরিণতি হয়ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
কোভিড আক্রান্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা মিলে তাদের স্কুল-কলেজ লাইফে কলকাতায় গড়ে তোলা বন্ধুবৃত্তের সংগঠনটা এত কাজে আসবে ভাবতেও পারেনি রিমঝিম আর সংকটের সময় কোথা থেকে যে সমাজে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে তা আজও অজানা – নতুন আশ্রয়ে বসে সামনে বাবার প্রিয় সেই পুরনো রেডিওটা, যে আদি যন্ত্র থেকে কোনো ব্যক্তিসনাক্তকরণ তরঙ্গ তৈরি হয় না, সেটা চালিয়ে এইসব ভাবছিল সে।
রঞ্জনা, আস্বস্ত হয়েছেন জেনে যে রিমঝিমের নতুন গবেষণাপত্রের সাহায্য নিয়ে ভাইরোলজিস্টরা তৈরি করতে পারবেন প্রতিষেধক, যদি বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হতে পারে – প্রতিটি দেশে গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবি।
রঞ্জনা সহসা স্তব্ধ হয়ে গেলেন রেডিও থেকে শর্ট ওয়েভ চ্যানেলে ভেসে আসা একটি অনুরোধ শুনে – রুমেলা গানের আসরে অনুরোধ জানাচ্ছে একদা প্রথম কোভিড যুগে রঞ্জনার গাওয়া এবং জনপ্রিয় হওয়া একটি রিমেক গান, এটাই কি তবে রিমঝিমের সবুজ সংকেত ডাঃ ফার্গুসনের প্রতি!!
কাউন্ট-ডাউন শুরু হয়েছে, তরঙ্গে ভেসে চলেছে রঞ্জনার কন্ঠে এক চিরকালের বার্তা –
“সন্ত্রাসের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান।
সংকটের কল্পনাতে হোয়োনা ম্রিয়মাণ।
মুক্ত করো ভয়,
আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।”
সমাপ্ত
Print Friendly, PDF & Email
0Shares

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুতে ঢাবি শিক্ষার্থীর আবেগঘন চিঠি

আরিফ চৌধুরী শুভ :: হারিয়েছি না হেরে গেছি আমরা? আ্যাম্বুলেন্স চলছে সারেইন ...