জহিরুল ইসলাম শিবলু, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি :: পঞ্চন ধাপে অনুষ্ঠিত রায়পুর পৌরসভার নির্বাচনে উৎসব মুখর পরিবেশে ভোট গ্রহণ শুরু হলেও ভোট গ্রহণের কিছুক্ষণের মধ্যে ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে তৈরী হয় শঙ্কা ও উত্তেজনা। তবে সকল শঙ্কা ও উত্তেজনাকে পাশ কাটিয়ে রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া শান্তি পূর্ণ পরিবেশে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা তৎপরতায় নির্বাচনের পরিবেশ শান্ত থাকলেও নৌকায় ভোট ছিল উন্মুক্ত।

এর আগে আওয়ামী লীগ নেতারা কাউন্সিলর প্রার্থীদের উন্মুক্ত ভোট নেয়ার ব্যাপারে অঙ্গীকার করালেও সাধারণ ভোটারা তা মানতে পারেননি। কেন্দ্রে এসে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট না দিতে পেরে অনেক ভোটার কেন্দ্রের মধ্যে নৌকায় উন্মুক্ত ভোট নেওয়ার প্রতিবাদ জানান। সকাল থেকে কেন্দ্র গুলোতে নারী ও পুরুষ ভোটারের উপস্থিতি বেশ লক্ষ্যনীয় ছিল।

ভোটগ্রহণ শুরু থেকেই ভোট কেন্দ্রের বুথে ঢুকে ইভিএমের বোতাম টিপে নৌকায় ভোট দিতে ভোটারদের বাধ্য করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করায় কয়েকটি কেন্দ্রে নৌকার সমর্থক ও ভোটারদের মাঝে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রায়পুর মার্চ্চেন্ট একাডেমি, রায়পুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ প্রায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে এ সব ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকজন সাধারণ ভোটারকে কেন্দ্রে মারধর করা হয়। এ ছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে প্রার্থী, সাংবাদিক ও ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাঁধা ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বুথের সামনেই ভোটারদের সাথে নৌকার সমর্থকদের হট্টগোল হচ্ছে। মারধর করা হচ্ছে কয়েকজন সাধারন ভোটারকে। পুলিশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। সাধারণ কয়েকজন ভোটার জানায়, প্রিজাইডিং অফিসার ভোটারের ভোট দেওয়া নিশ্চিত করার পর পরই আওয়ামী লীগের কর্মীরা বুথে ঢুকে নৌকায় বোতাম টিপে দিচ্ছেন। রায়পুর মার্চ্চেন্ট একাডেমি কেন্দ্রের ৪টি বুথেই নৌকায় বোতাম টিপে দিচ্ছে নৌকার সমর্থকরা। মেয়র পদে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার সুযোগ দিচ্ছেন না তারা। ২ নং বুথে জোর পূর্বক নৌকার বোতম টিপে দেয় রকি নামে এক নৌকার সমর্থক। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় ভোটারের সাথে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে ছাত্রলীগ নেতা রকি । পরে মুহুর্তেই নৌকার অন্য সমর্থকরা জড়ো হয়ে ভোটারদের ওপর হামরা চালায়। এ সময় কয়েকজন ভোটারকে মারধর করা হয় বলে জানান তারা।

এদিকে রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কেরোয়া সিরাজিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাঁধা দিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম। নির্বাচন কমিশনের দেয়া পর্যবেক্ষক কার্ড থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয়নি। শহিদুল ইসলাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার। ঘটনার সময় ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের জন্য সাংবাদিকরা ওই কেন্দ্রে যান। এ সময় ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া প্রিসাইডিং অফিসার ও পুলিশ কেন্দ্রে সাংবাদিকদের ঢুকতে দিচ্ছিল না।

পরে সাংবাদিকরা ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে অনুমতি নিতে যান। তিনি সাংবাদিকদের পর্যবেক্ষন কার্ড যাচাই করেন। অনুমতি চাইলে ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম বলেন, আপনাদের পর্যবেক্ষক কার্ড থাকলেও কেন্দ্রে ঢুকতে পারবেন না। তবে পর্যেবেক্ষক কার্ডে সাংবাদিকদের শুধুমাত্র প্রিসাইডিং অফিসারের নির্দেশনা মেনে চলার নির্দেশনা রয়েছে। ভোট কেন্দ্রের গোপন কক্ষে প্রবেশ নিষেধ ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনার ব্যাপারে কোনো বিধি উল্লেখ ছিল না। ওই কেন্দ্রের কয়েকজন ভোটারের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের এজেন্টরা ভোটারদেরকে নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করছেন।

অন্যদিকে শায়েস্তানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার হাবিবুর রহমান ও মোবারক হোসেনও সাংবাদিকদের কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দিয়েছেন। তাদের দাবি, ‘সাংবাদিকদের কেন্দ্রে ঢোকা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিষেধ রয়েছে।’ বিএনপি প্রার্থী এবিএম জিলানী বলেন, প্রশাসনের সহযোগিতায় ভোট দিচ্ছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকরা। সকালেই কেন্দ্র থেকে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপির ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।

স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক মনির আহম্মেদ বলেন, ভোটে অনিয়ম, কর্মীদের পিটিয়ে বের করে দেয়া ও প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে নির্বাচন সুষ্ট হয়নি। এ সময় তিনি নির্বাচন কমিশনারের কাছে পুনঃনির্বাচন দাবি করেন। জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ বলেন, কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি প্রমাণ করে কোন বাঁধা বিঘ্ন ছাড়াই ভোটারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন।

লক্ষ্মীপুর পুলিশ সুপার ড. এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, কোথাও কোন অভিযোগ নেই। ভোটাররা স্বর্তঃস্পূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। সকল কেন্দ্রকে গুরুত্ব দিয়ে জেলা পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। রায়পুর পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৬ জন প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে লড়ছেন ৫৭ জন।

Print Friendly, PDF & Email

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here